ঢামেকে অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘটে জিম্মি রোগী ও স্বজনদের লাশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

Advertisement

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নতুন ভবনের মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে আসা ৬৫ বছর বয়সী হালিমা বেগম। মৃত্যুর পর দীর্ঘ তিন ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় তার লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্সও জোগাড় করতে পারেননি তার নাতি মোহাম্মদ শাহীন। শাহীন আক্ষেপ করে বলেন, সরকারি হাসপাতালে এসে এমন বিপদে পড়ব তা কোনোদিনও ভাবিনি। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের কোনো দেখা নেই, আর বেসরকারিগুলোও বন্ধ। স্বজন হারানোর শোক ভুলে এখন লাশের পাশে বসে অপেক্ষা করছি। এই কষ্ট কাকে বোঝাব ভাই বলতে পারেন?
একইভাবে মুগদা হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢামেকে আনা ভাগনের মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে লাশের পাশে পাথরের মতো বসে ছিলেন মামা মোহাম্মদ হোসেন। হাসপাতাল থেকে কর্মচারীরা তাকে ভ্যানে করে লাশ নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এত বড় সরকারি হাসপাতালে লাশ নেয়ার একটা গাড়ি পাবো না, এটা কল্পনাও করিনি। আমরা এখন সম্পূর্ণ অসহায়। বিকেল থেকে অসহায় হয়ে বসে আছি, কিভাবে ভাগনেকে বাড়ি নিয়ে যাবো?
পার্কিংয়ের জায়গা বরাদ্দের দাবিতে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের আকস্মিক ও টানা দ্বিতীয় দিনের ধর্মঘটের কারণে অচল হয়ে পড়ে হাসপাতালের জরুরি পরিবহন সেবা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মিলেনি কোনো অ্যাম্বুলেন্স, যার ফলে বাধ্য হয়ে অনেককে সিএনজি, অটোরিকশা কিংবা খোলা রিকশা ভ্যানে করে প্রিয়জনের লাশ নিয়ে গন্তব্যে ফিরতে হয়। 
এই ধর্মঘটের নিষ্ঠুর শিকার হচ্ছেন ঢামেকে চিকিৎসা নিতে আসা গুরুতর অসুস্থ রোগীরাও। যশোর থেকে শাশুড়িকে নিয়ে আসা আবদুল্লাহ জানান, চিকিৎসকরা তার শাশুড়িকে জরুরি ভিত্তিতে কিডনি হাসপাতালে রেফার করলেও কোনো অ্যাম্বুলেন্স পাননি। সময়মতো অন্য হাসপাতালে নিতে না পারলে রোগীর জীবন আশঙ্কাজনক হয়ে উঠতে পারে জানিয়ে তিনি আকুতি প্রকাশ করেন।
অন্য দিকে টানা ১৯ দিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকার পর এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনা তুলে ধরে এক ভুক্তভোগী জানান, সকাল ১০টায় মৃত্যুর পর ৯৯৯-এ ফোন করেও কোনো অ্যাম্বুলেন্সের সহযোগিতা মেলেনি। পরে সাড়ে ১১টার দিকে একটি অ্যাম্বুলেন্সের সন্ধান মিললেও শুরু হয় চরম নাটকীয়তা ও অর্থশোষণ। সাধারণ সময়ে যেখানে ভাড়া আট হাজার টাকা, সেখানে স্বজনদের বাধ্যবাধকতার সুযোগ নিয়ে ডাবল বা ১২ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পদে পদে চরম হয়রানি ও দরদাম হাঁকানোর এই চিত্র এখন ঢামেক প্রাঙ্গণের নিত্যদিনের দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ধর্মঘটের নেপথ্য কারণ জানতে চাওয়া হলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন অভিযোগ করেন, নতুন পরিচালক দায়িত্ব নেয়ার পর তাদের সব গাড়ি হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়া হয়। পরে নতুন ভবনের নিচে পার্কিংয়ের আশ্বাস পেয়ে তারা নিজস্ব অর্থায়নে সিসি ক্যামেরা ও লাইট স্থাপন করলে সেখান থেকেও গাড়ি সরিয়ে দেয়া হয়। রাস্তায় গাড়ি রাখলে পুলিশ মামলা দেয়, আর হাসপাতালের ভেতরেও জায়গা দেয়া হচ্ছে না। সিসি ক্যামেরা ও গেট স্থাপনে আমাদের কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আমরা সরকারকে রাজস্ব দিতেও রাজি আছি।এ দিকে বুধবার সন্ধ্যায় চলমান বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘট আগামী সাত দিনের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমবায় সমিতির কর্মকর্তারা। সংগঠনের সেন্ট্রাল কমিটির সাধারণ সম্পাদক বাদল মাতবর সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বাংলাদেশ বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাদল মাতবর বলেন, দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের চরম ভোগান্তির কথা চিন্তা করে আমরা মানবিক কারণে ধর্মঘট বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেন জানান, আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি রোগীদের সেবায় ঢাকা মেডিক্যালের জন্য আরো কয়েকটি সরকারি অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের সাথে কথা হয়েছে এবং তারা আশ্বাস দিয়েছেন। আগামী সাত দিন হাসপাতালের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং এরপর পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে। এখানে চিকিৎসাসেবায় কোনো ধরনের ব্যাঘাত ঘটুক, তা কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই চায় না।