
নিজস্ব প্রতিবেদক
বিরোধী দলকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে এবং তাদের সাথে কোনো আলোচনা না করে ১৪ সদস্যের সংবিধান সংস্কার কমিটি গঠন করা নিয়ে সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী। তিনি একে ফ্যাসিবাদের একটি লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
দিলারা চৌধুরী বলেন, সরকার ও বিরোধী দল উভয়ই সংসদীয় ব্যবস্থার অংশ। এ ব্যবস্থায় নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে আইন প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিরোধী দলকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে একতরফাভাবে দেশ পরিচালনার চেষ্টা ফ্যাসিবাদেরই বহিঃপ্রকাশ।
গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির উদ্যোগে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন। এতে (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, মহাসচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, ভয়েস অব রিফর্মের সংগঠক মাশরুর ফাহিম, মানবাধিকারকর্মী ও কলামিস্ট আমাতুল্লাহ রুবীসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
১৯৭২ সালের সংবিধান প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলে অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, কার উদ্দেশ্যে ও কার ইঙ্গিতে ১৯৭২ সালের সংবিধান রক্ষায় এত তৎপরতা দেখানো হচ্ছে? ১৯৭২ সালের সংবিধান নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, যে গণপরিষদের মাধ্যমে ওই সংবিধান তৈরি হয়েছিল, সেটি মূলত পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্য নির্বাচিত হয়েছিল। পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার পর নতুন প্রেক্ষাপটে নতুন গণপরিষদ গঠন এবং গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান অনুমোদিত হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। এই সংবিধানই পরবর্তী সময়ে কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিস্ট সরকারের জন্ম দিয়েছে।
সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কার কমিটিতে জনমত নেয়ার নামে নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে ডেকে মতামত নেয়া হচ্ছে। অথচ সংসদে থাকা বিরোধী দল বা জোটের পক্ষ থেকে কোনো জোরালো বা দৃশ্যমান ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। বিরোধী দলকে কথা বলতে দেয়া হয় না- এমন অভিযোগ থাকলেও অন্তত সংসদে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানানো বা সোচ্চার হওয়া উচিত ছিল। আইজিপির ‘সরকার অনুমতি দিলে ক্রসফায়ার করা সম্ভব’- এমন বিতর্কিত মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী।
সংবিধান সংস্কার কমিটির উচ্চকক্ষ ও নি¤œকক্ষ গঠনের প্রস্তাব নিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে উচ্চকক্ষ বা নির্বাচনপদ্ধতি গঠন করা উচিত। নি¤œকক্ষের অনুলিপি কখনো উচ্চকক্ষে নিয়ে যাওয়া অর্থহীন ও অপচয় ছাড়া কিছু নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, নি¤œকক্ষ ও উচ্চকক্ষের ক্ষমতার ভারসাম্য এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে যে চিন্তাভাবনা চলছে, তার সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক পরিণতি হতে পারে।
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, যে জুলাই সনদের ওপর ভর করে সরকার গদিতে বসেছে তার একটি অক্ষর আজও বাস্তবায়ন করা হয়নি। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করলে সরকারকে জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে একদিন রাজনৈতিক ও আইনগত বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
তিনি বলেন, কোন ভাষায় সমালোচনা করলে কিংবা কী ধরনের কর্মসূচি দিলে সরকারি দলের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হবেন না, গালাগালি করবেন না, মারতে উদ্যত হবেন না কিংবা ক্রসফায়ারে দেয়ার চিন্তা করবেন না, তা আমাদের জানা নেই। আবার আমাদের প্রতিবাদ যেন কুসুম-কুসুম বিরোধিতা মনে না হয়, কার্যকর বিরোধী দল হিসেবে আমাদের ভূমিকা ও রাজনৈতিক অবস্থানও যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। এমন ভাষা ও কর্মসূচি কারো জানা থাকলে আমাদের জানাবেন।
সরকারের সমালোচনা করে এবি পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, প্রধানমন্ত্রী বা সরকারকে কটূক্তি করার অভিযোগে গ্রেফতার করা হলেও অন্যদের ক্ষেত্রে কেন একই ধরনের অভিযোগে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না? সে প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে বরাদ্দসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
মতবিনিময় সভায় এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, জুলাই সনদের কথা বললেই সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, জনগণ জুলাই সনদ বোঝে না। অথচ জনগণ বিচার ও সংস্কার চায়। সরকার চাইলেও কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা ক্রসফায়ারের অনুমতি দিতে পারে না। অতীতের ক্রসফায়ার ও গুমের ঘটনাগুলো দেশের মানুষকে গভীরভাবে ক্ষত-বিক্ষত করেছে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই জুলাই সনদের প্রয়োজন। জুলাই গণহত্যার বিচারপ্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। দেশের ভেঙে পড়া শিক্ষাব্যবস্থার উত্তরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কার নিশ্চিত করতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন জরুরি।
ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা একটি মীমাংসিত বিষয়। সেটি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করা উচিত নয়। গুম, মানবাধিকার ও সাইবার আইনসংক্রান্ত বিভিন্ন উদ্যোগের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের মধ্যে বিএনপিও রয়েছে। অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে সরকারকে প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও জনগণের সাথে ওয়াদা বরখেলাপ না করার আহ্বান জানান তিনি।
মতবিনিময় সভায় এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্যের কারণে গ্রেফতারের ঘটনা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে, যা অতীতের রাজনৈতিক সঙ্কটের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তৈরি করছে। বিচারপতিদের অবসরের বয়স বাড়ানোকে কেন্দ্র করে অতীতে যে রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরি হয়েছিল, তার পরিণতি শুধু রাজনৈতিক দল নয়, পুরো জাতিকে ভোগ করতে হয়েছে। জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির বক্তব্য ও বাস্তব অবস্থানের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে কোনো কুমতলব থাকলে তা সফল হবে না।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








