ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ, আটক এক হাজার ৫ নভেম্বর ফের ধর্মঘটের ডাক

 মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, ফ্রান্স

Advertisement

ফ্রান্সজুড়ে গত শনিবার ব্যাপক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, সারা দেশে প্রায় চার লাখ ১০ হাজার মানুষ এতে অংশ নেন। প্রধান শ্রমিক সংগঠন কনফেডারেশন জেনেরাল দু ত্রাভাই (সিজিটি) দাবি করেছে, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল আট লাখের বেশি।
শ্রমিকদের দাবি, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ এবং সরকারের নীতির প্রতিবাদে এ কর্মসূচি পালিত হয়। দিনের প্রথম ভাগে  বেশির ভাগ মিছিল শান্তিপূর্ণ থাকলেও বিকেল থেকে প্যারিস, গ্রেনোবল, মার্সেই, স্ট্রাসবুর্গ, রেন, নঁতে ও লিলসহ বিভিন্ন শহরে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ হয়। কয়েকটি স্থানে দোকানপাটে ভাঙচুর, লুটপাটের চেষ্টা ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে জানান, বিক্ষোভের ঘটনায় তখন পর্যন্ত প্রায় এক হাজার ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। গত ১৭ অক্টোবর একই সময় পর্যন্ত ৩৮৫ জনকে আটক করা হয়েছিল বলে তিনি জানান। তার দাবি, এবার নিরাপত্তা বাহিনী বেশ কয়েকটি লুটপাট প্রতিরোধ করেছে এবং আগের সপ্তাহের মতো সরকারি স্থাপনায় বড় হামলা হয়নি। তবে কয়েকটি শহরে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার দেশজুড়ে ২৮৯টি বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। তুলুজ ও ক্লেরমঁন্ট ফেরঁ শহরে দুজন গুরুতর আহত হয়েছেন বলেও জানান তিনি।
প্যারিসে পুলিশ প্রশাসনের হিসাবে প্রায় এক লাখ ১০ হাজার এবং সিজিটির হিসাবে দুই লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। মিছিলের শেষ পর্যায়ে পোর্ত দ্য ভিনসেন ও কুর দ্য ভিনসেন এলাকায় সংঘর্ষ শুরু হয়। পুলিশের দাবি, পাঁচ শতাধিক ভাঙচুরকারী নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করা হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর যান ও একটি হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়।
সংঘর্ষের মধ্যে সাধারণ বিক্ষোভকারীদের একটি অংশও আটকে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়ায় এলাকা ঢেকে যায় এবং কেউ কেউ আবাসিক এলাকার বাগানে আটকে ছিলেন। রাত ৮টার দিকে পুলিশ জানায়, নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল থেকে জনতাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। পুলিশের বলপ্রয়োগ নিয়ে পরে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়।
গ্রেনোবলে স্থানীয় প্রশাসনের হিসাবে ১০ হাজার এবং সিজিটির হিসাবে ২৩ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। প্রায় ৪০০ জন ব্ল্যাক ব্লকের সদস্য উপস্থিত ছিলেন বলে প্রশাসন জানায়। মুখোশধারী ব্যক্তিরা কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালান। একটি পিৎজা হাটের শাখা ও একটি সুপারমার্কেটে ভাঙচুর ও আংশিক লুটপাট হয়। ব্যাংক ও আবাসন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জানালাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইজের প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সাতজনকে আটক করা হয়েছে। সংঘর্ষে আট পুলিশ সদস্য ও সাত বিক্ষোভকারী আহত হন। পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় শহরের কয়েকটি এলাকা ও বাণিজ্যিক অঞ্চলে সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরদিন সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়।
মার্সেইয়ে প্রশাসনের হিসাবে ১৭ হাজার এবং সিজিটির হিসাবে ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। দিনের  বেশির ভাগ সময় মিছিল শান্তিপূর্ণ থাকলেও শেষভাগে কয়েকটি দল লুটপাটের চেষ্টা করে। পোর্ত দেক্স ও কাস্তেলান এলাকায় কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করা হয়। কয়েকটি স্থানে ব্যারিকেড তৈরির চেষ্টা ও আবর্জনার পাত্রে আগুন দেয়া হয়।
স্ট্রাসবুর্গে প্রশাসনের হিসাবে ছয় হাজার ৬০০ এবং সিজিটির হিসাবে ১৫ হাজার মানুষ অংশ নেন। বিকেলের দিকে মুখোশধারী কয়েকজন পুলিশের দিকে আতশবাজি ও বস্তু নিক্ষেপ করলে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। প্রায় দেড় হাজার মানুষের একটি অননুমোদিত মিছিলও গড়ে উঠেছিল বলে প্রশাসন জানায়।
রেন শহরে বৃষ্টির মধ্যেও প্রায় ১১ হাজার ৫০০ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। নির্দিষ্ট এলাকায় সমাবেশ নিষিদ্ধ থাকলেও বিক্ষোভকারীরা প্লাস দ্য লা রিপাবলিক এলাকায় পৌঁছালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়ায় এলাকা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন সড়কে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ হয়। তুলুজে প্রশাসনের হিসেবে ২৬ হাজার ৫০০ এবং সিজিটির হিসাবে ৮০ হাজার মানুষ অংশ নেন। 
নঁতে শহরে নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশ সেতুর প্রবেশপথ আটকে দেয়। পরে জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ও শব্দসৃষ্টিকারী গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়। 
চার্লভিল-মেজিয়েরে শহরে বিক্ষোভের শেষ পর্যায়ে কয়েকজন অপ্রাপ্তবয়স্ককে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে ১৬ ও ১৭ বছর বয়সী তরুণ ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আটকের সুনির্দিষ্ট কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
বোর্দোতে প্রশাসনের হিসাবে ১৫ হাজার ৫০০ এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর হিসাবে ৬০ হাজার মানুষ অংশ নেন। মিছিলের শেষ পর্যায়ে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। লিওঁয়ে প্রশাসনের হিসাবে প্রায় ১০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন।
সিজিটি জানিয়েছে, দমনমূলক পদক্ষেপে মানুষের অসন্তোষ থামানো যাবে না। সংগঠনটি আগামী ৫ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার, নতুন করে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। শ্রমিকদের দাবি পূরণ ও জীবনযাত্রার উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে তারা।