
টনি বলল, দাদুভাই আমরা কাল থেকেই ডাংগুলি খেলব। তুমি আমাদের সাথে থাকবে তো? আমরা কোথাও ভুল করলে তুমি ঠিক করে দেবে। নিমাই দাদু মৃদু হেসে বললেন, অবশ্যই থাকব। তোমাদের আরো ভালো করে শেখাব। তবে মনে রেখো, শুধু ডাংগুলি নয়, আমাদের গ্রামের পুরনো খেলাগুলোও তোমাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। দাদু একটু আকাশের দিকে তাকালেন, পশ্চিম আকাশে তখন সূর্য ডুবে যাচ্ছে। মাঠের ওপর নেমে এসেছে অন্ধকার
গ্রামের প্রবীণ নিমাই দাদু প্রতিদিন বিকেল বেলা মাঠের এক কোণে বসে থাকেন। গ্রামের ছেলেরা মাঠে খেলাধুলা করে দাদু তাদের খেলা দেখেন। খেলা শেষ হলে সবাই দল বেঁধে দাদুর কাছে এসে বসে।
সেদিনও খেলা শেষে সবাই দাদুর কাছে এসে বসল। দাদু হাসিমুখে বললেন, আজ টনির খেলা খুব ভালো হয়েছে। টনি বেশ ভালো খেলতে পারে।
মনি, রাতুল, নাফিস, সুজন ও জনি দাদুর চারপাশে গোল হয়ে বসে বলল, দাদু আজ একটা গল্প বলো।
দাদু হেসে বললেন, প্রতিদিন তো তোমাদের গল্প বলি। শুধু গল্প বলি না তোমাদের কত রকম গ্রামীণ খেলাও শিখিয়েছি। মোরগ-লড়াই, কানামাছি, গোল্লাছুট, মার্বেল খেলা কত কী! আজ তোমাদের সবাইকে আরেকটি পুরনো খেলা শিখাব। বলো তো ডাংগুলি খেলা সম্পর্কে তোমরা কেউ কিছু জানো?
মনি বলল, দাদু নাম শুনেছি কিন্তু কিভাবে খেলতে হয়, তা জানি না। শুনেছি নব্বইয়ের দশকে এ খেলা খুব জনপ্রিয় ছিল।
নিমাই দাদু একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, হ্যাঁ, আমাদের ছোটবেলায় ডাংগুলি ছিল দারুণ জনপ্রিয় খেলা। তখন তো মোবাইল ফোন ছিল না; মোবাইল গেমও ছিল না। বিকেল হলে আমরা মাঠে ছুটে যেতাম। ঘুড়ি ওড়াতাম ডাংগুলি খেলতাম লাঠিখেলা খেলতাম আবার বন্ধুদের সাথে বসে কত গল্প করতাম! আহা, কী সুন্দর শৈশব ছিল আমাদের!
দাদু একটু থেমে আবার বললেন এখনকার ছেলেমেয়েরা বেশির ভাগ সময় মোবাইল গেম নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তবে তোমরা যে আমার শেখানো গ্রামীণ খেলাগুলো খেলো সেটা দেখে আমার খুব ভালো লাগে। এ খেলাগুলো শুধু আনন্দের নয় আমাদের শৈশব গ্রামবাংলার ঐতিহ্যেরও অংশ। তাই তোমাদের এগুলো শেখাতে চাই।
জনি আগ্রহ নিয়ে বলল, দাদু তাহলে আজ আমাদের ডাংগুলি খেলাটা ভালো করে শেখাও।
নিমাই দাদু হাসলেন বললেন, তাহলে মন দিয়ে শোনো। কাল মাঠে গিয়ে নিজেরাও খেলতে পারবে।
ডাংগুলি খেলতে কী কী লাগে আমরা জানতে চাই।
দাদু বললেন, প্রথমেই লাগবে দু’টি কাঠি। একটি হবে লম্বা কাঠি সেটির নাম ডাং। আরেকটি হবে ছোট কাঠের টুকরো, সেটির নাম গুলি।
গুলিটি সাধারণত প্রায় দুই থেকে তিন ইঞ্চি লম্বা হয়। এর দুই মাথা একটু সূচালো করে কেটে নেয়া হয়। এতে ডাং দিয়ে গুলির মাথায় আঘাত করলে সেটি সহজে লাফিয়ে ওঠে এবং দূরে পাঠানো যায়।
রাতুল বলল, দাদু এবার একটু ধীরে ধীরে বলো। তাহলে আমরা ভালো করে বুঝতে পারব।
দাদু বললেন, ঠিক আছে। এবার একেবারে ধাপে ধাপে বলছি।
প্রথমে মাটিতে একটি ছোট গর্ত বা খাঁজ করতে হয়। সে গর্তের ওপর ছোট কাঠের টুকরো অর্থাৎ গুলি আড়াআড়িভাবে রাখা হয়।
নাফিস জিজ্ঞেস করল, দাদুভাই গুলি কী?
দাদু বললেন, গুলি হলো ছোট একটি কাঠের টুকরো আর লম্বা কাঠিটাকে বলা হয় ডাং।
তারপর গুলিকে আঘাত করা এবার খেলোয়াড় ডাং দিয়ে গুলির এক মাথায় আঘাত করে সেটিকে মাটি থেকে লাফিয়ে তুলবে। গুলি যখন বাতাসে উঠবে তখন ডাং দিয়ে সেটিকে সজোরে আঘাত করে যত দূরে সম্ভব পাঠাতে হবে। ডাংগুলি খেলা অঞ্চল ভেদে এক এক রকম হয়ে থাকে। আমাদের নাগডেমরা গ্রামে আমরা সবাই খেলতাম গুলি মাটির উপর রেখে জোরে দূরে পাঠিয়ে দেয়া।
মনি বলল, তারপর কী হবে?
এবার আসবে বিপক্ষ দলের পালা। তারা চেষ্টা করবে বাতাসে থাকা গুলিটি ক্যাচ করতে।
জনি জিজ্ঞাসা করল, ক্যাচ হলে কী হবে?
দাদু বললেন, বিপক্ষ দলের কোনো খেলোয়াড় যদি গুলিটি বাতাসে থাকা অবস্থায় ক্যাচ করতে পারে তাহলে যে খেলোয়াড় গুলি মেরেছিল তার পালা শেষ হবে। অর্থাৎ সে ওই দফায় আর খেলতে পারবে না। এরপর তার দলের অন্য খেলোয়াড় সুযোগ পাবে।
রাতুল বলল, ক্যাচ না হলে।
দাদু বললেন, আর যদি বিপক্ষ দল গুলিটি ক্যাচ করতে না পারে তাহলে গুলি যেখানে গিয়ে পড়েছে সেখান থেকে গর্ত পর্যন্ত দূরত্ব মাপা হবে।
রাতুল বলল, কী দিয়ে মাপব?
দাদু বললেন, যে লম্বা কাঠি দিয়ে গুলি মেরেছ সে ডাং দিয়েই দূরত্ব মাপতে হবে।
ডাং দিয়ে দূরত্ব মাপার নাম।
দাদু এবার মাটিতে ডাং রেখে দেখিয়ে বললেন,
গুলি যেখানে পড়েছে সেখান থেকে গর্ত পর্যন্ত ডাং বসিয়ে বসিয়ে দূরত্ব মাপা হয়। এ মাপগুলোরও আলাদা আলাদা নাম আছে ।
মনি বলল, কী নাম দাদুভাই। নিমাই দাদু বললেন,
এক কাঠি বাড়ি, দুই কাঠি দুড়ি, তিন কাঠি তেড়ি,
চার কাঠি চুড়ি, পাঁচ কাঠি চম্পা, ছয় কাঠি ঝেঁক,
সাত কাঠি মেক।
মনি অবাক হয়ে বলল, বাহ! মাপেরও এত সুন্দর সুন্দর নাম! দাদু হেসে বললেন, এটাই তো পুরনো গ্রামীণ খেলার মজা।
সুজন বলল, তারপর। দাদু বললেন, মাপ যত বেশি হবে খেলোয়াড়ের পরের চালের সুযোগও তত ভালো হতে পারে। যেমন, গুলি যদি মাত্র এক কাঠি দূরে যায় সেটি বাড়ি। আবার দুই কাঠি হলে দুড়ি। তিন কাঠি হলে তেড়ি। এভাবে সাত কাঠি হলে মেক। এসব চালেও গুলিকে আঘাত করার আলাদা কৌশল আছে।
দাদু বললেন, যেমন বাড়ি হলে গুলিকে পায়ের ওপর রেখে একটু উঁচু করে ডাং দিয়ে আঘাত করতে হয়। আর দুড়ি হলে দুই আঙুলের মাঝখানে গুলি ধরে ডাং দিয়ে আঘাত করে দূরে পাঠাতে হয়। এরপর অন্যান্য চালেও গুলিকে আঘাত করার নিজস্ব কৌশল থাকে।
সবাই মুগ্ধ হয়ে দাদুর কথা শুনছিল।
জনি বলল, দাদু সত্যিই তো! খেলার মধ্যে এত নিয়ম আছে, আগে তো কিছুই জানতাম না।
দলে কতজন খেলোয়াড়? মনি আবার প্রশ্ন করল।
দাদু বললেন, সাধারণত তিনজন চারজন পাঁচজন কিংবা ছয়জন খেলতে পারে। আমাদের সময় অবশ্য চার-পাঁচজন মিলে খেললে বেশ জমে যেত। খেলতে খেলতে আবার নানা নিয়মে নতুন খেলোয়াড় দলে নেয়ার সুযোগও থাকত।
টনি বলল, দাদু এ খেলায় সবচেয়ে মজার ব্যাপার কী ছিল? দাদু একটু হেসে বললেন, মজার তো অনেক কিছুই ছিল। গুলি মারতে গিয়ে কখনো ডুমুর গাছের ডালে আটকে যেত। কখনো ঘাসের মধ্যে গিয়ে হারিয়ে যেত। তখন সবাই মিলে গুলি খুঁজতাম। তাই আমরা একসাথে চার পাঁচটি গুলি সাথে নিয়ে মাঠে আসতাম।
টনি বলল, দাদুভাই আমরা কাল থেকেই ডাংগুলি খেলব। তুমি আমাদের সাথে থাকবে তো? আমরা কোথাও ভুল করলে তুমি ঠিক করে দেবে।
নিমাই দাদু মৃদু হেসে বললেন, অবশ্যই থাকব। তোমাদের আরো ভালো করে শেখাব। তবে মনে রেখো, শুধু ডাংগুলি নয় আমাদের গ্রামের পুরনো খেলাগুলোও তোমাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
দাদু একটু আকাশের দিকে তাকালেন পশ্চিম আকাশে তখন সূর্য ডুবে যাচ্ছে। মাঠের ওপর নেমে এসেছে অন্ধকার । দক্ষিণ দিক থেকে শীতল বাতাস বইছে।
নিমাই দাদু বললেন, চলো এবার বাড়ি ফিরে যাই। কাল আবার মাঠে দেখা হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








