
মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখার কঠোর পরীক্ষায় ক্ষমতাসীন বিএনপি। তৃণমূল নেতাকর্মীদের পাশাপাশি দলের মন্ত্রী, এমপি ও শীর্ষ নেতাদের প্রকাশ্যে ফৌজদারি অপরাধে জড়িয়ে পড়ায় দল ও সরকারে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সরকার গঠনের আট মাসে তিনজন মন্ত্রী ও একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগের ঘটনাও ঘটেছে। যদিও সরকারি দলের নেতারা বলছেন, একের পর এক মন্ত্রীদের পদত্যাগের ঘটনায় স্পষ্ট বার্তা মিলেছে যে, শাসনব্যবস্থায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং অপরাধ বা বিতর্কের ক্ষেত্রে বিএনপি সরকার কোনো আপস করতে রাজি নয়। অন্য দিকে বিরোধীরা বলছেন, মাত্র আট মাসের মধ্যে একটি সরকারের চারজন শীর্ষ ব্যক্তির বিদায় নেয়া প্রমাণ করে, সরকারের ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল বিদ্যমান। সরকার এখন পদত্যাগকে ‘জবাবদিহিতা’ হিসেবে প্রচার করে সস্তা রাজনৈতিক ফায়দা ও জনপ্রিয়তা পাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা পদত্যাগের বিষয়টি এক দিকে ইতিবাচক মন্তব্য করে ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থা নেয়ারও তাগিদ দিয়েছেন।
জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, তিন মন্ত্রী ও একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগের বিষয়টিকে খারাপ দেখি না, ভালোই দেখছি। এর পেছনে হয়তো নানা কারণ থাকতে পারে। তবে অতীতে এরকম অসংখ্য অপরাধ করার পরও কারো বিরুদ্ধে তেমন ব্যবস্থা নিতে দেখা যেত না। সবাই অন্যায় করে পার পেয়ে যেত। সবাই ভাবতো, ক্ষমতায় থাকলে যেকোনো অন্যায় অপরাধ করা জায়েজ। এখন সেই সংস্কৃতির কিছুটা পরিবর্তন আমরা দেখতে পারছি। যদিও কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে শুধু পদত্যাগ বা বহিষ্কারই শাস্তি হতে পারে না। কয়েকজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের দায়ে আরো কঠোর হওয়া দরকার ছিল। তিনি বলেন, আমি মনে করি সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রীদের জন্য একটি কঠোর আচরণ বিধি থাকা প্রয়োজন। তাদের সব কার্যক্রমকে নজরদারিতে রাখতে হবে। বেসামাল হলেই আইনিকাঠামাতে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ ১৭ বছর পর ক্ষমতায় আসার মাত্র আট মাসের মাথায় বড় ধরনের প্রশাসনিক রদবদল ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখার কঠোর পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে বিএনপি সরকার। এই অল্প সময়ের মধ্যেই মন্ত্রিসভার তিনজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে পদ ছাড়তে হয়েছে। এর পাশাপাশি পদত্যাগ করেছেন দলের একজন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যও। এসব পদত্যাগের নেপথ্যে স্বইচ্ছার চেয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কঠোর বার্তা ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।
সূত্র মতে, ঘটনার সর্বশেষ শিকারে পরিণত হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। গেল সোমবার দুপুরে জাতীয় প্রেস কাবে সংবাদ সম্মেলন ডেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি নিজের পদত্যাগের ঘোষণা দেন। ঘটনার সূত্রপাত গত শনিবার, যখন রাজধানীর গেন্ডারিয়া এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে সহযোগীদের নিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে নামেন ইশরাক। সেই ঘটনার ভিডিও তিনি নিজের ফেসবুকে প্রচার করলে মুহূর্তেই তা নেটপাড়ায় ছড়িয়ে পড়ে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র অসন্তোষ ও অস্বস্তির জন্ম দেয়। বিতর্কের মুখে পরদিন রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে তিনি পদত্যাগ করেন। ইশরাক হোসেনের আগে গত ১ জুন শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। তবে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, একজন প্রতিমন্ত্রীর সাথে বিরোধ, রাঙ্গামাটি বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়া, পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন এবং প্রশাসনিক নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে মতপার্থক্যের জেরেই তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। এরপর গত ২২ আগস্ট পদ ছাড়তে হয় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনকে। একইভাবে শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে সংসদ সদস্য পদ হারিয়েছেন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। রাজধানীর মিরপুরে ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে’ অনভিপ্রেত হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে গত ১ অক্টোবর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি।
সূত্র মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে পদত্যাগ, অব্যাহতি কিংবা বহিষ্কারের ঘটনা নতুন নয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি সরকারের আট মাসের মধ্যে তিন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ এবং সংরক্ষিত নারী আসনের একজন সংসদ সদস্যের বিদায় নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এসব পদত্যাগের পেছনে কী ছিল, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা থাকলেও সব ক্ষেত্রে জোরপূর্বক পদত্যাগের অভিযোগ কিছুটা থেকেই যায়। যদিও ক্ষমতাসীনরা বলছে, পদত্যাগের ঘটনায় স্পষ্ট বার্তা মিলেছে যে, শাসনব্যবস্থায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং অপরাধ বা বিতর্কের ক্ষেত্রে বিএনপি সরকার কোনো আপস করতে রাজি নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে ব্যক্তিগত বা শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করলেও কয়েকটি ঘটনায় দলীয় ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য এবং বিতর্কের বিষয় সামনে এসেছে। রাজনৈতিকভাবে বিতর্ক এড়াতে সরকার এদের পদত্যাগ বাধ্য করেছে।
বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ড. শিব্বির আহমদ নয়া দিগন্তকে বলেন, মন্ত্রী ও এমপিদের পদত্যাগের পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে তাদের আচরণে সরকারের চরম বিব্রত হওয়া। সরকারের এ ক্ষেত্রে অন্য কিছু করার ছিল না। মন্ত্রী-এমপিরা প্রকাশ্যে ফৌজদারি অপরাধ করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ মিডিয়াতে ফলাও করে প্রাচার হচ্ছে। তিনি ইশরাকের ঘটনার উদাহরণ দিয়ে বলেন, ইশরাক মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে প্রকাশ্যে ফৌজদারি অপরাধ করেছেন। বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার করেছেন। পদত্যাগ করিয়ে সরকার মূলত ইশরাককে বাঁচিয়ে দিয়েছে। তাকে বিচারের আওতায় না এনে শুধু মন্ত্রী থেকে সরিয়ে দিয়েছে। তার সংসদ সদস্য পদ তো যায়নি। মূলত সামান্য বিচার করে বড় অপরাধ থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। এখন পর্যন্ত মামলা হয়নি, কাউকে ধরা হয়নি। এতে বুঝা যায়, মূলত সরকার তাদের বিব্রত হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই পদত্যাগের ঘটনা ঘটাচ্ছে। এতে করে আইনের শাসন বা জনগণের কোনো মঙ্গল হবে না।
এ দিকে বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের পক্ষ থেকে এই পদত্যাগগুলোকে সরকারের ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল বলে অভিহিত করা হচ্ছে। ব্যাপক সমালোচনার পাশাপাশি জনরোষ থেকে বাঁচতে সরকার এখন পদত্যাগকে ‘জবাবদিহিতা’ হিসেবে প্রচার করে সস্তা রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করছে। জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ইতোমধ্যে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী চেয়েছেন বলেই ইশরাক হোসেন পদত্যাগ করেছেন। এর আগে জনগণের চোখে ধুলো দিতেই একজন সংসদ সদস্যকে পদত্যাগ করানো হয়েছে। সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, আট মাসের মাথায় সরকার লেজেগোবরে জড়িয়েছে এবং বিরোধী দলকে ঘায়েল করতে ব্যস্ত। আইনশঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে। যা সরকারি দলের মন্ত্রী- প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের পদত্যাগের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। জানতে চাইলে খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী বলেন, এসব ঘটনার মাধ্যমে সরকারের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার চিত্র ফুটে উঠেছে। আমরা মনে করি কাউকে সরিয়ে দিলেই সঙ্কটের সমাধান হয়ে যাবে না। বরং সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন এমপি নয়া দিগন্তকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে সরকারের ব্যর্থতায় ইশরাক হোসেনকে অস্ত্র হাতে নিতে হয়েছে। এর আগে একজন সংসদ সদস্যকেও ফৌজদারি অপরাধের দায়ে পদত্যাগ করানো হয়েছে। তিনি বলেন, শুধু তাদের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে, এমনটি ভাবা উচিত হবে না। কারণ এদের বিরুদ্ধে আইনগতভাবে শাস্তি মূলত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।
সরকারি দলের নেতারা এ ঘটনাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য একটি ইতিবাচক মোড় হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে ক্ষমতার অপব্যবহার বা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য মন্ত্রীদের পদত্যাগের নজির প্রায় নেই বললেই চলে। অতীতে দুর্নীতি বা পেশী প্রদর্শনের অভিযোগ উঠলেও তা ধামাচাপা দেয়া হতো। বর্তমান সরকার সেটি না করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করছে। মিষ্টি এবং ইশরাকের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দেশের সাধারণ মানুষের মনে আইনের শাসনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনবে। জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকার কোনো অপরাধীকে ছাড় দিচ্ছে না। অতীতে অন্যায় করেও অনেকে দলীয় বিবেচনায় পার পেয়ে গেছেন। এটা সরকারের জন্য স্বস্তি না অস্বস্তির সেটা বিবেচ্য নয়। যিনিই অপরাধ করবেন, তাকেই শাস্তির আওতায় আনা হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








