
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর পূর্বাচলে পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) আবদুল্লাহ আল জহিরের ভাড়া দেয়া বাড়িতে এক বছর ধরে চলত অবৈধ ডিজে পার্টি, অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বসত মাদকের আসর। মাসে হতো প্রায় ২২টি পার্টি। তা ছাড়া বিয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণের মামলায় তার বিরুদ্ধে আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
জানা গেছে, বাড়িটিতে রহস্যময় গোপন বৈঠকে অংশ নিয়েছেন বিতর্কিত বিজ্ঞাপনী সংস্থা এশিয়াটিকের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কমপে ২০ জন কর্মকর্তা। প্রায় এক বছর ধরে নিয়মিত ডিজে পার্টি ও মাদকের আসর বসা সেই বাড়ি থেকে মাত্র ৩০ গজ দূরে অবস্থিত ছয়তলা একটি পুলিশ ফাঁড়ি। প্রতি মাসে ২০ থেকে ২২টি পার্টির আয়োজন করা হতো, যেখান থেকে রাতভর উচ্চশব্দে সাউন্ড বক্সে গান-বাজনা চলত এবং সিসার ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ত। গান ও নাচের উচ্চশব্দ খিলেেতর ওই হাউজিংসংলগ্ন মসজিদ পর্যন্ত পৌঁছাত এবং ফজরের নামাজের সময়ও বাইরে উন্মুক্ত স্থানে তরুণ-তরুণীদের নাচতে দেখা গেছে বলে স্থানীয় বাসিন্দা ও মসজিদের ইমাম জানিয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, অভিযানকালে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওপর সরাসরি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে অতিরিক্ত ডিআইজি জহিরের বিরুদ্ধে। ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবিরকে অভিযান চলার সময়ই তিনবার ফোন করেন ওই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তিনি ডিবির কাছে দাবি করেন, তার ম্যানেজার ও কো-হোস্ট মাহবুবুল আলমকে যেন গ্রেফতার বা হয়রানি না করা হয়। যদিও অতিরিক্ত ডিআইজি জহিরের দাবি ছিল, তিনি গরিব ম্যানেজারকে অহেতুক হয়রানি থেকে বাঁচাতে ফোন করেছিলেন; কিন্তু তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, একটি অপরাধ চক্রের মূল সমন্বয়কারীকে বাঁচাতে পুলিশের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার এই তৎপরতা আড়াল করার প্রচেষ্টাকেই স্পষ্ট করে।
এ দিকে ডিবির অভিযানে ২৬ নারীসহ মোট ৮৫ জনকে আটক করা হলেও উদ্ধারকৃত মাদকের পরিমাণ নিয়ে পুলিশের প্রশ্ন উঠেছে। জব্দ তালিকায় ছিল মাত্র একটি ইয়াবা বড়ি, এক লিটার ৭০০ মিলিলিটার মদ (তিনটি আংশিক খালি বোতল) এবং অল্প পরিমাণ ‘কুশ’। যে স্থানে ৮৫ জন মানুষ উপস্থিত ছিল এবং বাইরে ২২টি বিলাসবহুল গাড়ি পার্ক করা ছিল, সেখানে নামমাত্র মাদক উদ্ধার হওয়ায় অভিযানের খবর আগেই ফাঁস হয়েছিল কি না কিংবা কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির সন্তানকে বাঁচানোর পথ তৈরি হয়েছে কি নাÑ এ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। আটক ২৬ নারীকে ১৫ দিন করে কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। তা ছাড়া গ্রেফতার ৫৯ পুরুষকে এক মাস করে কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। মঙ্গলবারই তাদের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ২৬ জনকে নেয়া হয় কাশিমপুর কারাগারে। অন্যরা আছেন কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে।
ডিবির তদন্তে উঠে এসেছে, বাড়িটি এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলার প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত হলেও আবাসিক হোটেল বা রিসোর্ট হিসেবে অনুমোদনপ্রাপ্ত ছিল না। ছিল না বার ও রেস্টুরেন্টের লাইসেন্স। অবৈধভাবেই বাড়িটিতে চলছিল বাণিজ্যিক কার্যক্রম। ১০ জনের জন্য পাঁচটি ঘরের দৈনিক ভাড়া নেয়া হতো ১৮ হাজার ৫০০ টাকা এবং অনুষ্ঠানে আসা প্রতিটি তরুণের থেকে ৬০০ টাকা করে প্রবেশ ফি তোলা হতো। এই আয়ের বেশির ভাগ অর্থাৎ ৭০ শতাংশ সরাসরি পেতেন বাড়ির মালিক অতিরিক্ত ডিআইজি জহির এবং ৩০ শতাংশ পেতেন কো-হোস্ট মাহবুব। অবৈধ বাণিজ্যিক আয় পকেটে পুরলেও ঘটনার পর ওএসডি (পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত) হওয়া ওই কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তিনি এসব অসামাজিক কর্মকাণ্ডের কিছুই জানতেন না।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর নির্দেশে বিয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা এক মামলায় আবদুল্লাহ আল জহিরের বিরুদ্ধে সম্প্রতি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন বিচারক মুনতাসির আহমেদ। গত ২০ মে ভুক্তভোগী এক নারী অভিযোগ দায়ের করার পর বিচার বিভাগীয় তদন্ত শেষে তদন্ত কর্মকর্তা ১৪ জুলাই অভিযোগ সত্য বলে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেন। শুনানির দিন অভিযুক্ত কর্মকর্তা অনুপস্থিত থাকায় আদালত তার বিরুদ্ধে এই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








