কোম্পানির তালিকাভুক্তিতে সুফল পেতে অংশীজনদের অবস্থান স্বচ্ছ হতে হবে


পুঁজিবাজারে ভালো শেয়ারের প্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির বাজারে তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করতে নতুন করে সংশোধন করা হচ্ছে আইপিও বিধিমালা। ইতোমধ্যেই এ সংক্রান্ত ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পাবলিক অফার অব ইকুইটি সিকিউরিটিজ) রুলস, ২০২৫’-এর সংশোধিত খসড়া জনমত গ্রহণের জন্য প্রকাশ করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। দেশের সর্বস্তরের জনগণ আগামী ২ নভেম্বর পর্যন্ত প্রস্তাবিত এই খসড়ার ওপর মতামত দিতে পারবেন। 
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানির শেয়ারের প্রবাহ নিশ্চিত করতে বেশ ক’বার আইপিও বিধিমালা সংশোধন করা হয়েছে। এবার আবার নতুন সংশোধিত বিধিমালা প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু এই বিধিমালা সংশোধন তখনই পুঁজিবাজারের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে যদি এর সাথে যুক্ত সব অংশীজন যার যার অবস্থান থেকে স্বচ্ছ ও নৈতিকতার সাথে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করবে। এসব অংশীজনদের মধ্যে রয়েছে কোম্পানির উদ্যোক্তা, মার্চেন্ট ব্যাংক যারা আইপিও ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা নির্ণয়কারী প্রতিষ্ঠান চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্মস এবং সর্বোপরি যেসব প্রতিষ্ঠান কোম্পানির শেয়ারের বিডিংয়ে অংশ নেবেন সবার মধ্যেই স্বচ্ছতার সাথে তার ওপর অর্পিত এ দায়িত্ব পালনের মানসিকতা থাকতে হবে। তা না হলে শুধু বিধিমালা সংশোধন করে কাক্সিত ফল পাওয়া সম্ভব হবে না।  
বরাবরই দেশের পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বড় সমস্যা ভালো কোম্পানির তথা ভালো শেয়ারের অভাব। ১৯৯৬ সালের প্রথম পুুঁজিবাজার বিপর্যয়ের পূর্বে কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি, কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ও দেশীয় কয়েকটি মৌলভিত্তির কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে নিজস্ব মান ধরে রাখতে সক্ষম হলেও বিপর্যয় পরবর্তী সময়ে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয়নি। বিপর্যয় পরবর্তী দীর্ঘসময় ধরে পুঁজিবাজারের স্থবিরতা কাটাতে দ্রুত কিছু কোম্পানির তালিকাভুক্তির প্রয়োজনীয়তার কারণেই ওই সময় তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিগুলোর পরিপূর্ণ স্বচ্ছতা যাচাই করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। 
এই সুযোগে তখন প্রায় অর্ধশতাধিক কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় যার মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া সবগুলোই পরবর্তীতে ওটিসি মার্কেটে চলে যায়। 
পরবর্তীতে মোবিল যমুনা, এসিআই ফরমুলেশন, আরএকে সিরামিকস, ক্রাউন সিমেন্টের মতো কিছু বেসরকারি কোম্পানি বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস, পাওয়ারগ্রিড কোম্পানি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, যমুনা অয়েল, ঢাকা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি ডেসকোর মতো রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ও গ্রামীণ ফোনের মতো বহুজাতিক কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাজারে শেয়ারের চাহিদা কিছুটা হলেও মেটায়। এসব কোম্পানির তালিকাভুক্তির পর পুঁজিবাজারে দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগকারীদেরও যথেষ্ট আনাগোনা ছিল। সে সময় ভালো কোম্পানিগুলোর শেয়ারের একটি বড় অংশও ছিল বিদেশী বিনিয়োগকারিদের দখলে। 
কিন্তু গত একযুগ ধরে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির নামে যা ঘটেছে তা দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারকে তার স্বাভাবিক অবস্থা ধরে রাখতে দেয়নি। এ সময় যেসব কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে তার মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ কোম্পানিই প্রাথমিক গণপ্রস্তাবে প্রস্তাবকৃত দর ধরে রাখতে পারেনি। এমনকি এসব কোম্পানির বেশির ভাগই এখন দুই পুঁজিবাজারে মৌলভিত্তির বিচারে সবচেয়ে খারাপ ‘জেড’ গ্রুপে লেনদেন হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে আসা কোম্পানি যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিও। 
পুঁজিবাজারে কোম্পানির তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে সাধারণত দু’টি পদ্ধতিই অনুসরণ করা হয়ে থাকে। একটি ফিক্সড প্রাইস সিস্টেম এবং অপরটি বুক বিল্ডিং সিস্টেম। সাধারণ বিচারে ভালো কোম্পানিগুলো বাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে যাতে কোম্পানির উদ্যোক্তরা তাদের কোম্পানির শেয়ারের ন্যায্য দাম পান সে লক্ষ্যেই যোগ্য বিনিয়োগকারীদের বিডিংয়ের মাধ্যমে কোম্পানির শেয়ারের দাম নির্ধারণ করে থাকেন। এটিই বুকবিল্ডিং সিস্টেমস।  স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা হয় বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ, মার্চেন্ট ব্যাংক ও মিউচুয়াল ফান্ডের সম্পদ ব্যবস্থাপকদের মতো অভিজ্ঞ এসব যোগ্য বিনিয়োগকারীরা বিডিং পদ্ধতিতে কোম্পানির শেয়ারের যে দর নির্ধারণ করে থাকেন সেসব কোম্পানিগুলো অবশ্যই মৌলভিত্তিসম্পন্নই হবে এবং এসব কোম্পানির ভবিষ্যৎ ভালো হবে। কারণ কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দর নির্ধারণে নিশ্চয়ই কোম্পানির অতীত ইতিহাস জেনেই তারা তাতে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। 
কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে ২০১০ সাল থেকে ২০২৪ সালে পুঁজিবাজার বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে মোট ২২টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয় যেগুলোর হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বাকিগুলো প্রথমিক গণপ্রস্তাবের দর ধরে রাখতে পারেনি। আবার কয়েকটি কোম্পানি ভালো লভ্যাংশ দিলেও বাজার পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন সময় দর হারিয়েছে। কিছু কিছু কোম্পানি বাজারে ১০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করে কোনোভাবে টিকে আছে। আবার কিছু কোম্পানি লভ্যাংশ দিতে না পেরে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে গেছে। এগুলোর মধ্যে এমন কোম্পানিও রয়েছে যেগুলো বিনিয়োগকারীরা প্রতিটি শেয়ার ৭২ টাকায় কিনলেও এ মুহূর্তে ‘জেড’ গ্রুপে ২৪ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। আবার কোনো কোনো কোম্পানি শেয়ারের অভিহিত মূল্যও ধরে রাখতে পারছে না। এর ফলস্বরূপ গত কিছুদিন আগে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ কমপক্ষে ৩৪টি কোম্পানিকে অকার্যকর ও বন্ধ কোম্পানি হিসাবে ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। 
অন্য দিকে ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে দুইভাবে কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। একটি অভিহিত মূল্যে। অর্থাৎ দশ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারের দর প্রস্তাব করা হয় ১০ টাকা। অন্যটি উদ্যোক্তরা অভিহিত মূল্যে শেয়ার বিক্রি না করে অভিহিত মূল্যের সাথে কিছু প্রিমিয়াম নিয়ে দর প্রস্তাব করা হয়। বিনিয়োগকারীরা সেই নির্ধারিত দরেই শেয়ার কেনেন। এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থাই কোম্পানির আর্থিক অবস্থা যাচাই-বাছাই করে প্রিমিয়ার নির্ধারণ করেন। ২০১১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে ১১০টির বেশি কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে কমপক্ষে ৩৫টি কোম্পানি বর্তমানে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে লেনদেন হচ্ছে। বাকি ৩৫টি কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের নামমাত্র লভ্যাংশ প্রদান সাপেক্ষে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে লেনদেন হচ্ছে।
তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় তা হলো কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্তির আগে এগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ভালো দেখানো হলেও তালিকাভুক্তির পর বছর না যেতেই কোম্পানিগুলো লোকসানের শিকার হয়। আর্থিক প্রতিবেদনে উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে এটাই প্রকাশ করা হয়। এভাবে সময়ের সাথে সাথে কোম্পানিগুলো দিনদিন দুর্বল হতে থাকে। একপর্যায়ে  দেখা যায় কোম্পানিগুলোর উৎপাদন পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। আর বিনিয়োগকারীরা এসব কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে মারাত্মকভাবে প্রতারিত হন। 
আবার ফিক্সড প্রাইস বা বুক বিল্ডিং উভয় পদ্ধতিতেই কোম্পানিগুলো যে পরিমাণ শেয়ারবাজারে ছাড়ে তার একটি বড় অংশই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা পেয়ে থাকেন। লেনদেন শুরুর দিন থেকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তারা এ শেয়ার বিক্রি করার সুযোগ পান। যতদিন এসব প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর হাতে শেয়ার থাকছে ততদিনই শেয়ারের দর একটি যৌক্তিক অবস্থানে থাকে। যখন তাদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি হয়ে যায় তখন কমতে শুরু করে শেয়ারদর। 
এ ছাড়া বিগত সরকারের আমলে কয়েকটি কোম্পানির তালিকাভুক্তিতে নেককারজনকভাবে সরকারের প্রভাবকে কাজে লাগানো হয়। বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে ও ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে বড় প্রিমিয়াম নিয়ে আসা এসব কোম্পানির সব ক’টিই এখন ‘জেড’ গ্রুপে কোনোভাবে টিকে রয়েছে।
কোনো কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুমিকাটি রাখে মার্চেন্ট ব্যাংক। তারাই কোম্পানির ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে কাজ করে থাকে। কিন্তু মানসম্পন্ন ইস্যু ম্যানেজ করা মার্চেন্ট ব্যাংক খুব একটা নেই বললেই চলে। কারণ দেশে মার্চেন্ট ব্যাংকার হিসাবে শীর্ষ তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানির হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বেশির ভাগই পরবর্তীতে দুর্বল কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। এমনও ঘটেছে বহুজাতিক কোম্পানি হিসেবে বড় প্রিমিয়াম নিয়ে বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিও এখন লভ্যাংশ দিতে পারছে না।  
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা মনে করেন, দেশের পুঁজিবাজারের সাথে যেসব স্টেকহোল্ডাররা জড়িত তাদের মধ্যে স্বচ্ছতার প্রচণ্ড অভাব রয়েছে। পুঁজিবাজারকে সবাই যেকোনো মূল্যে টাকা বানানোর হাতিয়ার হিসেবেই নিয়েছেন। উদ্যোক্তরা যেনতেনভাবে শেয়ার ছেড়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। ইস্যু ম্যানেজাররা কোনো বাছবিচার ছাড়াই শুধুমাত্র নিজেদের প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে আঁস্তাকুড়ের কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করতে সহায়তা করছে।  যতদিন পুঁজিবাজারের সাথে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো যার যার জায়গা থেকে নিজেদের কাজটি সঠিক ও স্বচ্ছভাবে না করবে ততদিন পুঁজিবাজার থেকে ভালো কিছু আশা করা যাবে না। 
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, বিগত সময়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে অনুসৃত দুই পদ্ধতিতেই অনিয়ম হয়েছে। বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে বিডিংয়ে অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলো কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের চেয়ে উদ্যোক্তাদের দ্বারাই বেশি প্রভাবিত হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা অযৌক্তিক দরও প্রস্তাব করেছে। সেখানে কোনো স্বচ্ছতা ছিল না। ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির পক্ষ থেকে একই ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
ফলে কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্তির পর অনেক ক্ষেত্রে মার্জিন রুলকে ব্যবহার করে শেয়ার ধারণ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সাময়িক অযৌক্তিকভাবে মূল্যবৃদ্ধি ঘটালেও একটি সময়ের পর প্রস্তাবিত দর ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে তিনি আশা করেন, সংশোধিত নতুন আইপিও রুলস এর প্রস্তাবে এসব বিষয় বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। যদি তা ঠিকভাবে পরিপালন সম্ভব হয় তাহলে তালিকাভুক্তিকে কিছুটা হলেও স্বচ্ছতা আসবে।

Advertisement