
শাহ আলম নূর
দেশের তৈরী পোশাক শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি আমদানি নীতির অনিশ্চয়তা নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তুলার সুতা সংগ্রহে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রত্যাহার, স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানিতে বিধিনিষেধ এবং রফতানি পণ্য পরিবহনের েেত্র বিভিন্ন পরিবর্তনের কারণে উৎপাদন ও সরবরাহ পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত ক্রয়াদেশের একটি অংশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তারা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে পোশাক কেনা ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ভিত্তিক বড় ফ্যাশন প্রতিষ্ঠান ইন্ডিটেক্সও এমন পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সাথে বৈঠকে নীতিগত পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং পণ্য সরবরাহে জটিলতার বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
রফতানি বাণিজ্যের উদ্যোক্তারা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ২৫০ কোটি মার্কিন ডলারের পোশাক সংগ্রহ করে ইন্ডিটেক্স। বাংলাদেশের অন্যতম বড় বিদেশী ক্রেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। তাদের উদ্বেগের বিষয়টি দেশের পোশাক রফতানির প্রতিযোগিতা সমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) পরিচালক ফকির কামরুজ্জামান নাহিদ নয়া দিগন্তকে বলেন, ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের তুলার সুতায় বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রত্যাহারের পর স্থানীয় বাজারে সুতার দাম বেড়েছে। আগে প্রতি কেজি সুতা গড়ে ৩ দশমিক ১৫ ডলারে পাওয়া গেলেও বর্তমানে তা ৩ দশমিক ৭০ ডলার পর্যন্ত উঠেছে। এতে কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে ৫৫ সেন্ট বা প্রায় ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
তিনি বলেন, সুতার এই মূল্যবৃদ্ধি পোশাক উৎপাদনের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতারা বিভিন্ন দেশের উৎপাদন মূল্য, পণ্যের মান ও সরবরাহের সমতা তুলনা করে ক্রয়াদেশ দিয়ে থাকেন। বাংলাদেশের উৎপাদকদের খরচ বেড়ে গেলে প্রতিযোগিতামূলক দামে পোশাক সরবরাহ করা কঠিন হতে পারে। ফলে নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়া এবং আগের ক্রেতাদের ধরে রাখার েেত্র চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু সুতার দাম নয়, নীতিগত সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা নিয়েও উদ্বিগ্ন পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ও বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান নয়া দিগন্তকে বলেন, জ্বালানি সঙ্কটসহ বিদ্যমান সমস্যার মধ্যে নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরো কঠিন করে তুলছে। আমদানি প্রক্রিয়ায় কখন কী পরিবর্তন আসবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদন পরিকল্পনা ও সময়মতো পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিদেশী ক্রেতারা নতুন ক্রয়াদেশ দেয়া স্থগিত রাখতে পারেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পাকিস্তান, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশ থেকে পোশাক সংগ্রহের পরিমাণ বাড়াতে পারেন। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখতে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করছেন তিনি।
এ দিকে তৈরী পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে যৌথভাবে চিঠি দিয়েছে। সংগঠন দু’টির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঘন ঘন ও অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং উৎপাদনকারীদের সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় জটিলতা বাড়াচ্ছে।
সংগঠন দু’টি ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা, তুলার সুতা আমদানিতে সুরামূলক শুল্ক বাড়ানোর উদ্যোগ এবং ২০২৬-২৯ সালের আমদানি নীতিতে নিট কাপড় আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর তা প্রত্যাহারের বিষয়গুলো তুলে ধরেছে। সর্বশেষ তুলার সুতা আমদানিতে বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তও তাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এ দিকে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে। একই সাথে স্থানীয় বস্ত্রকলের স্বার্থরা এবং রফতানিমুখী পোশাক কারখানার প্রতিযোগিতা সমতা বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট সব পরে সাথে আলোচনা করে নীতিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছে তারা।
এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) বলছে, বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহারের অর্থ সুতা আমদানিতে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা কিংবা নতুন শুল্ক আরোপ নয়। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিদ্যমান ব্যাংক গ্যারান্টিভিত্তিক ব্যবস্থায় শুল্কমুক্ত আমদানির সুযোগ রয়েছে। সুবিধাটির অপব্যবহার রোধ, সরকারি রাজস্ব সুরা এবং দেশীয় ও আমদানি করা সুতার মধ্যে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করাই এ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশীয় বস্ত্রকলের স্বার্থ রা এবং পোশাক রফতানিকারকদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক দামে কাঁচামাল সংগ্রহের সুযোগ নিশ্চিত করার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় শিল্পকে সুরা দেয়ার প্রয়োজন থাকলেও আমদানি নীতির পরিবর্তনের কারণে রফতানিমুখী কারখানার ব্যয় ও সরবরাহ সমতা কতটা প্রভাবিত হচ্ছে, তা বিবেচনায় নেয়া জরুরি।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু নয়া দিগন্তকে বলেন, পোশাক শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়াদেশ, কাঁচামাল সংগ্রহ ও উৎপাদন পরিকল্পনার জন্য নীতিগত পূর্বানুমানযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হলে উদ্যোক্তাদের ব্যয় বাড়তে পারে এবং ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়সীমা বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। এ কারণে নীতিমালা প্রণয়নের আগে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর সাথে কার্যকর আলোচনা, সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন এবং রফতানিকারকদের জন্য বাস্তবসম্মত আমদানি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের পোশাক রফতানির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, সময়মতো পণ্য সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখার ওপর। নীতিগত অনিশ্চয়তা দূর করে দেশীয় বস্ত্রশিল্প ও রফতানিমুখী পোশাক খাতের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা না গেলে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর কাছে ক্রয়াদেশ হারানোর ঝুঁকি আরো বাড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








