
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে আবারো সামরিক হামলা চালানোর পরিকল্পনা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক খবরে এ তথ্য উঠে এসেছে। আগামী ৩ নভেম্বর মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
খবরটিতে বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত মার্কিন কর্মকর্তা ও অন্য কয়েকজনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সামরিক মহড়া জোরদার করেছে। খবরে একে ‘স্বল্পমেয়াদি কিন্তু কড়া অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। হামলার কৌশল অনুশীলনের অংশ হিসেবে ইরানের পশ্চিমের প্রতিবেশী ইরাকের আকাশসীমায়ও উড়োজাহাজ ওড়ানো হয়েছে। সম্ভাব্য ল্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে ইরানের জ্বালানি স্থাপনা, পারমাণবিক স্থাপনা এবং পেণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুদ।
খবরে উল্লিখিত কর্মকর্তাদের দাবি, ইরানে আরেক দফা বড় ধরনের হামলা চালানো হলে দেশটির অর্থনীতি মারাত্মকভাবে তিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে কূটনৈতিক আলোচনায় ইরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করা সম্ভব হতে পারে বলে তারা মনে করছেন। এতে আরো বলা হয়েছে, চলতি মাসেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হামলার নির্দেশ দিতে পারেনÑ এমন সম্ভাবনা কম। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত ইরানে কোনো সামরিক পদেেপর অনুমোদন না-ও দিতে পারেন।
ইরানের সাথে আলোচনার কথা অস্বীকার ট্রাম্পের
ইরানের সাথে আলোচনা চালানোর কথা অস্বীকার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তিনি বলেছেন, ‘খুব শিগগির’ পরিস্থিতির সমাধান হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়, তিনি ইরানের সাথে আলোচনার আশা ছেড়ে দিয়েছেন কি না। জবাবে ট্রাম্প বলেছেন, ‘না, আমি মনে করি না যে আমরা তাদের সাথে আলোচনা করছি। তবে একভাবে হোক বা অন্যভাবে, একটা সমাধান আসবেই। খুব শিগগিরই তা ঘটবে।’ ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ও আর্থিকÑ দুই দিক থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব ভালো করছে’। ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধকে তিনি ‘একটি ছোটখাটো সংঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বেশির ভাগ মানুষ মনে করছেন, এটি নির্বাচনের পর ঘটবে। দেখা যাক কী হয়।’ ট্রাম্প আরো বলেন, ‘তবে আমি এটুকু বলব, ইরানের বিরুদ্ধে আমরা যা করেছি, তা অসাধারণ।
পারস্য উপসাগরে চার জাহাজে ইরানের একযোগে হামলা
এ দিকে পারস্য উপসাগরে অবৈধ তেল পরিবহনের অভিযোগে চারটি বাণিজ্যিক জাহাজে একযোগে আক্রমণ চালিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী। অভিযানের পর ল্যবস্তু হওয়া জাহাজগুলোতে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। একই সাথে হরমুজ প্রণালীর পশ্চিমাংশে আরো তিনটি জাহাজ জলসীমার মাইন বিস্ফোরণের কবলে পড়ে তিগ্রস্ত হয়েছে।
রয়টার্সের খবরে আইআরজিসির বিবৃতির বরাতে জানানো হয়, সাগরে চারটি জাহাজের গতিবিধি চিহ্নিত করার পরপরই সমন্বিত এই আঘাত হানা হয়। সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো অননুমোদিত জ্বালানি পাচারের সাথে যুক্ত ছিল বলে দাবি করেছে আইআরজিসি। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে আঞ্চলিক মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে আরো বড় ধরনের সামরিক পদপে নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে বাহিনীটি।
উপসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রসীমায় উদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্যে হরমুজ প্রণালী ও আঞ্চলিক ইরানি বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাখ্যানের দাবি জানিয়ে জাতিসঙ্ঘে চিঠি পাঠিয়েছে তেহরান। সংস্থাটির মহাসচিব এবং নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির কাছে এই পদেেপর নিন্দা জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি গোলাম হোসেইন দারজি। চিঠিতে তিনি ওয়াশিংটনের সামরিক আগ্রাসন বন্ধের আহ্বান জানিয়ে উল্লেখ করেন, যেকোনো আগ্রাসনের মুখে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী আত্মরার পূর্ণ অধিকার প্রয়োগ করবে ইরান।
সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরানো হবে না : রেজায়ি
এক গ্রাম সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামও ইরান থেকে সরানো হবে না বলে সাফ জানিয়েছেন ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ি। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সাথে বৈঠকের পর তিনি একথা বলেন। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যকার যুদ্ধ পরিস্থিতি নিরসনে কূটনৈতিক সমঝোতার আশায় সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ব্যাপক তৎপরতা চলছে। এরই অংশ হিসেবে যুদ্ধ ও ইয়েমেনের চলমান উত্তেজনা নিয়ে আলোচনার জন্য পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির তেহরান সফর করেছেন। অঞ্চলটিতে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যেই এই গুরুত্বপূর্ণ সফরটি অনুষ্ঠিত হলো।
তা সত্ত্বেও, তেহরান তার অবস্থানে অনড় রয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের শর্ত মেনে না নেয়া পর্যন্ত যুদ্ধের অবসান হবে না এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়া হবে না। ইরান তার বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু করার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তের পেছনে এই কর্মসূচিও একটি কারণ ছিল। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেকদের তত্ত্বাবধানে দেশের ভেতরেই উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের সমৃদ্ধকরণের মাত্রা কমিয়ে আনার সম্ভাবনা তিনি নাকচ করেননি। এর আগে ইরান এমন প্রস্তাব দিয়েছিল। ইরানের কর্তৃপ কয়েক দশক ধরে চলে আসা পারমাণবিক কর্মসূচিকে দেশটির সার্বভৌম অধিকার এবং হামলা, অন্তর্ঘাত ও হত্যাকাণ্ড সত্ত্বেও অর্জিত একটি সাফল্য হিসেবে তুলে ধরে আসছে। মঙ্গলবার রেজায়ি এটিকে ‘জাতীয় সম্পদ’ বলে বর্ণনা করেন।
ইরান কমমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বেসামরিক কাজেও ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে রেডিও ফার্মাসিউটিক্যালস উৎপাদন এবং রাশিয়ার সহযোগিতায় বুশেহর বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন। ইরানের কর্তৃপরে যুক্তি, সামরিক চাপের মুখে পারমাণবিক কর্মসূচি সমর্পণ করা আত্মসমর্পণের শামিল হবে- বিশেষ করে যদি এর ফলে ইরান ভবিষ্যতে আরো হামলার ঝুঁকির মুখে পড়বে না, এমন কোনো নিশ্চয়তা না পাওয়া যায়।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ বন্ধে মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। তবে এখনো সমঝোতার কোনো লণ দেখা যাচ্ছে না। ইরান তাদের আগের অবস্থানেই অনড়। দেশটি বলছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের শর্ত মেনে না নিলে তারা হরমুজ প্রণালী খুলবে না এবং যুদ্ধের অবসানও হবে না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের যুদ্ধ শুরুর অন্যতম কারণ ছিল দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি। ট্রাম্প যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বারবার বলেছেন, তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি শেষ করে দিতে চান। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহসেন রেজায়ি গত মঙ্গলবার রাতে আসিম মুনিরের সাথে বৈঠকের পর বলেন, ‘সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের এক গ্রামও ইরান থেকে সরানো হবে না।’
তবে মোহসেন রেজায়ি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা কমানোর সম্ভাবনা নাকচ করেননি। আন্তর্জাতিক পর্যবেকদের তত্ত্বাবধানে ইরানের ভেতরেই এ কাজ করা যেতে পারে। এর আগে তেহরান এমন প্রস্তাব দিয়েছিল। চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইঙ্গিত দেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সমতা উল্লেখযোগ্য হারে কমানো হলে ওয়াশিংটন সন্তুষ্ট হতে পারে।
২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে হামলা চালায়। এর আগে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ধারণা করেছিল, তেহরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম আছে। পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য ইউরেনিয়ামকে ৯০ শতাংশের বেশি সমৃদ্ধ করতে হয়।
ইরান কয়েক দশকের পুরনো পারমাণবিক কর্মসূচিকে দেশের সার্বভৌম অধিকার ও অর্জন হিসেবে তুলে ধরছে। চলমান যুদ্ধ এবং এর আগে বিভিন্ন হামলা ও হত্যাকাণ্ডের মধ্যেও এ কর্মসূচি বন্ধ হয়নি। গত মঙ্গলবার মোহসেন রেজায়ি এটিকে ‘জাতীয় সম্পদ’ বলে বর্ণনা করেন। ইরান কম মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বেসামরিক কাজেও ব্যবহার করে। এর মধ্যে রয়েছে ওষুধ তৈরি এবং রাশিয়ার সহযোগিতায় বুশেহর বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন।
ইরান বলছে, সামরিক চাপের মুখে পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করে দেয়া আত্মসমর্পণের শামিল হবে। তা ছাড়া কর্মসূচি বন্ধ করলে ভবিষ্যতে হামলা না হওয়ার নিশ্চয়তাও নেই। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান আইএইএকে তাদের পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনের অনুমতি দেয়নি। তেহরানের অভিযোগ, সংস্থাটি মূলত পশ্চিমা দেশগুলোর স্বার্থে কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরামন্ত্রী পিট হেগসেথ চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইসরাইলের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে এসব বৈঠকের পরও নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা কমেছে বলে মনে হচ্ছে না। তেহরানে ইরানি রফতানিকারকদের এক সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেন, দেশটির ওপর নতুন করে হামলা এবং আরো কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি রয়েছে। ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রকে বলার মতো নতুন কিছুই নেই। গত মাসে দেয়া শর্তগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। ওই শর্ত মানলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়া সম্ভব।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








