সুরা সরঞ্জাম ছাড়াই বিষ ছিটিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে স্প্রেয়ারম্যান

কাওসার আজম

Advertisement

ফসলের উৎপাদন বাড়াতে রাসায়নিক সারের পাশাপাশি বাড়ছে বালাইনাশক ও আগাছানাশকের ব্যবহার। তবে যথেচ্ছ প্রয়োগ, সঠিক মাত্রা সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই জমিতে স্প্রে করার প্রবণতা কৃষকের স্বাস্থ্য, মাটির উর্বরতা ও সামগ্রিক পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বালাইনাশক মিশ্রণ ও জমিতে প্রয়োগের কাজে নিয়োজিত স্প্রেয়ারম্যানদের বড় অংশ প্রয়োজনীয় সুরাসামগ্রী ব্যবহার না করায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। একই সাথে বৃষ্টির পানি ও সেচের মাধ্যমে বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশ পাশের খাল-বিল ও জলাশয়ে গিয়ে মাছ, জলজপ্রাণী এবং উপকারী জীববৈচিত্র্যের তি করছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) সাবেক সদস্য পরিচালক ড. মো: বক্তীয়ার হোসেনের মতে, বালাইনাশকের নির্বিচার ব্যবহার কৃষক ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনছে। মাঠপর্যায়ে যারা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বালাইনাশক প্রয়োগ করেন, তাদের জরুরি ভিত্তিতে প্রশিণের আওতায় এনে নিরাপত্তা সরঞ্জামের ব্যবহার, সঠিক মাত্রা নির্ধারণ এবং উপযুক্ত সময়ে প্রয়োগের বিষয়ে দ করে তোলা দরকার। 
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিএআরসির গভর্নিং বডির ষষ্ঠ সাধারণ সভাতেও বালাইনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি, মাটির অম্লতা বৃদ্ধি এবং ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সভায় কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় প্রশিণ এবং মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে প্রায়োগিক গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সুরা সরঞ্জাম ছাড়াই বিষ প্রয়োগ
দেশের গ্রামাঞ্চলে ফসলের জমিতে বালাইনাশক প্রয়োগের সাথে জীবিকার তাগিদে যুক্ত রয়েছেন বিপুলসংখ্যক স্প্রেয়ারম্যান। মাঠপর্যায়ে দেখা যায়, অনেকের কাছেই গ্লাভস, উপযুক্ত মাস্ক, সুরাচশমা কিংবা শরীর ঢাকার পোশাক থাকে না। ফলে স্প্রে করার সময় বালাইনাশক সরাসরি ত্বকে লাগা, শ্বাসের সাথে ফুসফুসে প্রবেশ করা কিংবা অসাবধানতাবশত মুখের মাধ্যমে শরীরে ঢোকার ঝুঁকি থাকে। বালাইনাশকের প্রত্য সংস্পর্শে মাথাব্যথা, বমি ভাব, মাথা ঘোরা, ত্বকে জ্বালাপোড়া ও দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। 
ড. বক্তীয়ার হোসেন বলেন, ‘পেস্টিসাইডের নির্বিচার ব্যবহার অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মাধ্যমে সব এলাকার পেশাদার স্প্রেয়ারম্যানদের তালিকা করে নিরাপত্তা সরঞ্জামের ব্যবহার এবং সঠিক সময় ও প্রয়োগমাত্রার ওপর বাস্তবমুখী প্রশিণ দেয়া এখন সময়ের দাবি।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, বালাইনাশকের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে শুধু জমির মালিক বা কৃষকদের সচেতন করলেই হবে না। যারা পেশাগতভাবে অন্যের জমিতে মজুরির বিনিময়ে বালাইনাশক প্রয়োগ করেন, তাদেরও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিণ ও তদারকির আওতায় আনতে হবে। 
এ ছাড়া বালাইনাশক প্রয়োগের পর জমিতে প্রবেশ, ফসল সংগ্রহ এবং সংলগ্ন জলাশয় ব্যবহারের েেত্রও নির্দিষ্ট নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি। 
বিপন্ন মাটি, মাছ ও উপকারী জীববৈচিত্র্য
স্প্রে করার পর রাসায়নিকের একটি অংশ মাটিতে পড়ে এবং পরে বৃষ্টি বা সেচের পানিতে ধুয়ে খাল, বিল ও জলাশয়ে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে জলজ পরিবেশ দূষিত হয়ে মাছ, ব্যাঙ, প্লাঙ্কটনসহ বিভিন্ন জলজ অমেরুদণ্ডী প্রাণীর তি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সাথে মৌমাছি, প্রজাপতি এবং তিকর পোকা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখা বিভিন্ন উপকারী কীটপতঙ্গও বালাইনাশকের শিকার হচ্ছে। এতে কৃষিজ বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। উপকারী পোকামাকড় কমে গেলে তিকর পোকা প্রাকৃতিকভাবে নিয়ন্ত্রণের সুযোগও কমে যায়। ফলে পরবর্তী সময়ে তিকর পোকার আক্রমণ আরো বাড়তে পারে।
কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা আইপিএম (ওহঃবমৎধঃবফ চবংঃ গধহধমবসবহঃ) পদ্ধতির প্রসার ঘটাতে হবে। আলোক ফাঁদ, ফেরোমোন ফাঁদ, পরজীবী ও শিকারি পোকার ব্যবহার এবং নিয়মিত মাঠ পর্যবেণের মাধ্যমে রাসায়নিক বালাইনাশকের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।
নির্বিচার আগাছানাশকে তিগ্রস্ত মাটির পরিবেশ
ফসলের জমিতে নিড়ানি দেয়ার শ্রম ও খরচ কমাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হার্বিসাইড বা আগাছানাশকের ব্যবহারও বেড়েছে। তবে ফসলের ধরন, আগাছার প্রকৃতি ও জমির বৈশিষ্ট্য বিবেচনা না করে ভুল রাসায়নিক প্রয়োগ করলে তা কৃষির জন্য তিকর হয়ে উঠতে পারে। ড. বক্তীয়ার হোসেনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আগাছানাশক প্রধানত দুই ধরনেরÑ সিলেক্টিভ ও নন-সিলেক্টিভ। সিলেক্টিভ আগাছানাশক নির্দিষ্ট ধরনের আগাছা দমন করে, অন্যদিকে নন-সিলেক্টিভ আগাছানাশক সংস্পর্শে আসা বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ ধ্বংস করতে পারে।
ফসল উৎপাদনে সারের গুরুত্ব, ভেজালও উদ্বেগের
জাতীয় খাদ্য উৎপাদনে রাসায়নিক সারের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। ড. বক্তীয়ার হোসেনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, উন্নত বীজ ব্যবহার করলেও মাটিতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান না থাকলে কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া সম্ভব নয়। ফসলের উৎপাদনের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ সারের কার্যকারিতার সাথে সম্পর্কিত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দেশে একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল উৎপাদনের ফলে শস্যের নিবিড়তা বেড়েছে। পাশাপাশি ভুট্টা ও সবজির মতো অধিক পুষ্টি শোষণকারী ফসলের আবাদ বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত জৈব সারের অভাবে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। কৃষিজমির বাইরেও মাছের ঘেরে শৈবাল নিয়ন্ত্রণ ও পশুখাদ্য উৎপাদনসহ বিভিন্ন েেত্র সারের ব্যবহার রয়েছে। তবে সারের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে মান বজায় রাখা জরুরি। 
মাটির অম্লতা ও ভারী ধাতু নিয়ে উদ্বেগ
অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে মাটির স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জমিতে কোনো না কোনো মাত্রায় অম্লতার সমস্যা রয়েছে।  মাটির পিএইচ মাত্রা অতিরিক্ত কমে গেলে ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় ফসফরাস, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের মতো পুষ্টি উপাদান গ্রহণে সমস্যা হতে পারে। 
বিএআরসির গভর্নিং বডির সভায় কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ উল্লেখ করেন, অনেক কৃষি অঞ্চলে মাটির পিএইচ ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫-এর মধ্যে নেমে এসেছে, যা ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য অনুকূল নয়। মাটির অম্লতা কমাতে ডলোচুন ও জৈব পদার্থ ব্যবহারের পাশাপাশি মাটি পরীার ভিত্তিতে ব্যবস্থাপনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
একই সাথে ভূগর্ভস্থ পানি সেচে ব্যবহার, নি¤œমানের ফসফেট সার দীর্ঘদিন প্রয়োগ এবং অপরিকল্পিত বালাইনাশক ব্যবহারের ফলে মাটিতে আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম ও সিসার মতো ভারী ধাতু জমছে কি না, তা নিয়মিত পরীার মাধ্যমে পর্যবেণ করা জরুরি। এসব ধাতু খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করলে দীর্ঘমেয়াদে মানবস্বাস্থ্যের ওপর তিকর প্রভাব পড়তে পারে।
টেকসই কৃষি, কৃষকের স্বাস্থ্য সুরা এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বালাইনাশকের যৌক্তিক ব্যবহার এখন সময়ের দাবি। একই সাথে পেশাদার স্প্রেয়ারম্যানদের প্রশিণ, ব্যক্তিগত সুরা সরঞ্জাম ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা, বাজারে মানসম্মত বালাইনাশক ও সার সরবরাহ এবং ভেজাল ও অননুমোদিত পণ্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।