
- মডিফিকেশন করলে আইন ভাঙার শঙ্কা, না করলে জরিমানার ভয়
- এআই ট্রাফিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও সড়কে আইন প্রয়োগের সমতা নিয়ে প্রশ্ন
আমিনুল ইসলাম
মোটরসাইকেলের সামনে নতুন করে নম্বর প্লেট লাগানো নিয়ে চরম বিপাকে পড়ার অভিযোগ করছেন বাইকাররা। তাদের অভিযোগ, বাজারে থাকা অনেক মটরসাইকেলে তৈরির সময় থেকে সামনে নম্বর প্লেট লাগানোর অপশন দেয়া হয়নি। এখন সরকারের নতুন আদেশ মানতে হলে মটরসাইকেলকে মডিফাই করে নম্বর প্লেট লাগানোর অপশন তৈরি করতে হবে, যা আইন অমান্য (মডিফাই করা) করার শামিল।
বাইকাররা বলছেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ট্রাফিকিং সিস্টেমের জন্য নতুন এ নিয়ম চালু করা হয়েছে। অথচ রাস্তাগুলো এখনো অরক্ষিত। ব্যটারিচালিত রিকশার দৌরাত্ম্য, অনুমোদনহীন যানবাহন এখনো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে প্রতিটি সড়কে। তাহলে আইন কি কেবল বাইকারদের জন্য।
আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে মোটরসাইকেলের সামনে নম্বর বাধ্যতামূলক করে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপ (বিআরটিএ)। ওই বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, স্কুটার ও অন্যান্য মোটরসাইকেলের সামনের নম্বর প্লেটের জন্য পৃথক মাপ নির্ধারণ করা হয়েছে। স্কুটারের প্লেটের দৈর্ঘ্য হবে ২০০ মিলিমিটার ও প্রস্থ ১০০ মিলিমিটার। অন্য মোটরসাইকেলের েেত্র দৈর্ঘ্য ২৮৫ মিলিমিটার ও প্রস্থ ৫০ মিলিমিটার।
উভয় ধরনের নম্বর প্লেট স্টেইনলেস স্টিল অথবা অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি হতে হবে। প্লেটের পটভূমি সাদা এবং অর ও সংখ্যা কালো রঙের বাংলা হরফে লিখতে হবে। অর ও সংখ্যার উচ্চতা কমপে ২০ মিলিমিটার হতে হবে। প্লেটে কোনো নকশা বা অতিরিক্ত সাজসজ্জা রাখা যাবে না। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ ও সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২ অনুযায়ী, মোটরসাইকেলের পেছনে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেনটিফিকেশন (আরএফআইডি) প্রযুক্তিসংবলিত আলো প্রতিফলক নম্বর প্লেট থাকা বাধ্যতামূলক। তবে যান চলাচল ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি আরো জোরদার করতে সামনের অংশেও নিবন্ধন নম্বর প্রদর্শন প্রয়োজন বলে জানিয়েছে বিআরটিএ।
বিআরটিএর নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্ধারিত মাপ ও নকশা অনুসরণ করে মোটরসাইকেল মালিকদের নিজ উদ্যোগে সামনের নম্বর প্লেট তৈরি ও স্থাপন করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দেশনা না মানলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে। এ দিকে সময় ঘনিয়ে আসায় মোটরসাইকেল মালিকদের মধ্যে নম্বর প্লেট লাগানো নিয়ে তোড়জোড় বেড়েছে। সে কারণে ব্যস্ততা বেড়েছে নম্বর প্লেট তৈরি ও বিক্রির দোকানগুলোতে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার দোকানে ঘুরে দেখা গেছে, শ্রমিকরা দিন-রাত কাজ করেও যথাসময়ে গ্রাহকদের নম্বর প্লেট বুঝিয়ে দিতে হিমশিম খাচ্ছে। এতে কোথাও কোথাও প্লেট তৈরিতে আগের চেয়ে বেশি সময় লাগছে।
বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর থেকে রাজধানীর বংশাল, পল্টন, মগবাজার, ডেমরা, দোলাইপাড়, ধোলাইখাল, শ্যামপুরসহ বিভিন্ন এলাকার ধাতব প্লেট তৈরির দোকানগুলোতে যোগাযোগ করছেন মোটরসাইকেল চালকরা। দোকানে সরাসরি অর্ডার দেয়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে নম্বর প্লেট তৈরির প্রচার। অনলাইনভিত্তিক বিক্রেতারাও এ ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন।
রাজধানীর মদিনা মেটালিকের স্বত্বাধিকারী জাহিদ বলেন, মোটরসাইকেল চাহিদা মেটাতে দিন-রাত কাজ করছেন শ্রমিকরা। ঢাকার মোটরসাইকেল মালিকদের কাছ থেকে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০টি প্লেট তৈরির অর্ডার পাচ্ছি। পাশাপাশি ঢাকার বাইরের ক্রেতাদের কাছ থেকেও কাজ আসছে। প্লেটের মান ও উপকরণ অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে। সাধারণত প্রতি পিস প্লেটের দাম ২৫০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে। আর অ্যালুমিনিয়ামের প্লেটের দাম ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা। বিসমিল্লাহ মার্বেল হাউজের কর্ণধার বলেন, স্বাভাবিক সময়ে একটি নম্বর প্লেট তৈরি করে ডেলিভারি করতে ৪০ মিনিটের মতো লাগে। তবে বর্তমানে চাপ বেশি থাকায় প্লেটের জন্য ক্রেতাদের এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত সময় দিতে হচ্ছে।
এ দিকে মোটরসাইকেলের সামনে নম্বর প্লেট লাগানোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন চালকদের অনেকে। তাদের মতে, সামনে ও পেছনে নিবন্ধন নম্বর দৃশ্যমান থাকলে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী ও অপরাধে জড়িত মোটরসাইকেল শনাক্ত করা সহজ হবে।
মিরপুরের বাসিন্দা মোটরসাইকেল মালিক আহসান হাবিব বলেন, বিআরটিএর এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই। তবে তার জন্য সব ধরনের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী রেজিস্ট্রিকৃত মোটরসাইকেলে নতুন কোনো অংশ সংযোজন বা বাতিল করা আইনত অপরাধ। এখন বেশির ভাগ মটরসাইকেলে সামনের অংশে নম্বর প্লেট দেয়ার অপশন নেই। সে ক্ষেত্রে নতুন করে অপশন তৈরি করতে মটরসাইকেলে মডিফাই করতে হবে, যা আইনগতভাবে অপরাধ; আবার না করলেও অপরাধ।
তিনি বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা চালু হয়েছে। সামনে নম্বর প্লেট থাকলে সিগন্যাল অমান্য করা কিংবা মোটরসাইকেল ব্যবহার করে অপরাধের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট যান শনাক্ত করা সহজ হতে পারে। কিন্তু আমাদের সড়ক কি আদৌ সেভাবে তৈরি করা হয়েছে। এখনো অনিয়ন্ত্রিতভাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। রাস্তার অবস্থাও বেহাল। এ অবস্থায় গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালাতে একটু এ দিক-সে দিক হলেই এআই মামলা করে দিবে। কারণ এআই বুঝবে না কার দোষে কী হয়েছে। সে শুধু সেট করে দেয়া প্রোগ্রাম অনুযায়ী কাজ করবে।
আহসান হাবিব নামে রাইড শেয়ারকারী এক বাইকার বলেন, অনেক সময় অপরাধীরা মোটরসাইকেলের পেছনের নম্বর প্লেট ঢেকে রাখে। এতে আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনী ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়। সামনে নম্বর প্লেট থাকলে এ ধরনের ফাঁকি দেয়ার সুযোগ কমবে। তবে সব নিয়মকানুন শুধু বাইকারদের জন্য নির্ধারণ করলে হবে না। পুরো ঢাকা শহর অটোরিকশায় ভরে গেছে। তাদের ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না সরকার। অথচ একটু কিছু হলেই বাইকারদের দিকে নজরদারি শুরু হয়।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








