ময়লার ভাগাড় থেকে জ্বালানি তেল সুজনের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ
চিতলমারীর নিজ বাড়িতে জ্বালানি তেল উৎপাদন করছেন সুজন : নয়া দিগন্ত।

 

Advertisement

বাড়ির সামনে প্রতিদিন জমত বাজারের টনকে টন ময়লা-আবর্জনা। খোলা জায়গায় পলিথিনে আগুন দেয়ায় ধোঁয়ায় অতিষ্ঠ হতেন পরিবারের সদস্যসহ আশপাশের বাসিন্দারা। পরিবেশদূষণ ও সন্তানদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ থেকেই বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করেন বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার সুজন বিশ্বাস (৩৫)। ইউটিউব দেখে সীমিত সামর্থ্যে গড়ে তোলেন পলিথিন থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের একটি ইউনিট। তার দাবি, এই প্রক্রিয়ায় ডিজেল, পেট্রল ও অকটেন উৎপাদন করছেন তিনি। তবে উদ্যোগটির পরিবেশগত নিরাপত্তা ও উৎপাদিত জ্বালানির মান যাচাই জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 
চিতলমারী উপজেলা হেলিপ্যাডের পাশে ঋষি সম্প্রদায়ের কয়েকটি পরিবারের বসবাস। সেখানেই সুজনের বাড়ি। পরিবারের ছয় সদস্যের ভরণ-পোষণের জন্য উপজেলা সদর বাজারের ফুটপাথে জুতা-স্যান্ডেল সেলাইয়ের কাজ করেন তিনি। দৈনিক আয় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। সীমিত আয়ের মধ্যেই সংসার চালানোর পাশাপাশি পলিথিন থেকে তেল উৎপাদনের উদ্যোগ এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন। 
সুজন বলেন, বাজারের ময়লা তাদের বাড়ির সামনে ফেলা হয়। পরে খোলা জায়গায় পলিথিনে আগুন ধরিয়ে দেয়ায় ধোঁয়ায় শিশু ও বৃদ্ধদের শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে গিয়ে পলিথিন থেকে জ্বালানি তেল তৈরির ধারণা পান। তার ভাষ্য, পরিবেশ রার পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানি উৎপাদনের ল্েযই তিনি ‘পলিথিন বার্ন ইউনিট’ তৈরি করেছেন। 
সুজনের দেয়া তথ্যানুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৪০ কেজি পলিথিন প্রক্রিয়াজাত করতে তার ছয় ঘণ্টা সময় এবং পাঁচ মণ কাঠ লাগে। এতে তিনি প্রায় ১৫ লিটার ডিজেল, চার লিটার পেট্রল ও এক লিটার অকটেন পান বলে দাবি করেন। উৎপাদিত ডিজেলের একটি অংশ পরিশোধনের প্রয়োজন হয়। এসব জ্বালানি দিয়ে স্যালো ইঞ্জিন ও মোটরসাইকেল চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তবে পলিথিন পুড়িয়ে জ্বালানি উৎপাদনের প্রক্রিয়াটি পরিবেশের জন্য কতটা নিরাপদ, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যথাযথ প্রযুক্তি, নির্গমন নিয়ন্ত্রণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ছাড়া এ ধরনের প্রক্রিয়ায় বিষাক্ত ধোঁয়া ও তিকর অবশিষ্টাংশ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। উৎপাদিত জ্বালানির গুণগত মান এবং ইঞ্জিনে ব্যবহারের উপযোগিতাও পরীাগারে যাচাই করা প্রয়োজন। ফলে উদ্যোগটিকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে বিবেচনার আগে কারিগরি ও পরিবেশগত মূল্যায়ন জরুরি।
সুজনের স্ত্রী বিউটি বিশ্বাস বলেন, অভাবের সংসারেও পরিবেশ ও সন্তানদের সুরার কথা ভেবে তার স্বামী উদ্যোগটি গড়ে তুলেছেন। অর্থের অভাবে যেন এটি বন্ধ হয়ে না যায়, সে জন্য সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা চান তারা।
নসিমনচালক রাসেল মোল্লা জানান, তিনি সুজনের কাছ থেকে ডিজেল কিনে স্যালোইঞ্জিনচালিত নসিমন চালাচ্ছেন এবং এখন পর্যন্ত কোনো অসুবিধা হয়নি বলে তার অভিজ্ঞতা। স্থানীয় ব্যবসায়ী সুবল কর্মকারও সুজনের উৎপাদিত পেট্রল দিয়ে মোটরসাইকেল চলার কথা জানিয়েছেন। তবে ব্যক্তিগত ব্যবহারের অভিজ্ঞতা জ্বালানির নিরাপত্তা ও মানের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। 
চিতলমারী উপজেলা পরিবেশ আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট ফজলুল হক বলেন, পলিথিন পরিবেশের জন্য হুমকি। সুজনের উদ্যোগ প্রশংসনীয়; তাকে সহযোগিতা করা উচিত।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা আক্তার জানান, দেশের বিভিন্ন স্থানে পলিথিন থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের খবর পাওয়া যাচ্ছে।