
বছরের পর বছর মাত্রাতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে অনেক ইউরোপীয় দেশই এখন গভীর ঋণসঙ্কটে নিমজ্জিত, আর সেই ঋণের সুদের পরিমাণ দিন দিন অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়ছে। ফ্রান্সের েেত্র ঋণ নেয়ার খরচ ২০০২ সালের পর এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ঋণের সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারের কোষাগার খালি হয়ে যাওয়ায় আন্দোলনকারীদের দাবির মুখে থাকা বিদ্যালয়, হাসপাতাল ও পেনশনের মতো মৌলিক খাতগুলোতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেয়া অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
সাধারণ নাগরিকদের মতো ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ না নিয়ে সরকার মূলত বাজারে বন্ড বিক্রির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে থাকে। বন্ড ক্রেতাদের নির্দিষ্ট সময় পরপর সুদ প্রদান করা হয় এবং নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে মূল অর্থ ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতি থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ১০ বছর মেয়াদি একটি বন্ডের েেত্র বিনিয়োগকারী ১০০ ইউরো দিলে এবং সুদের হার ২.৫ শতাংশ হলে তিনি ১০ বছরে মোট ২৫ ইউরো সুদ পাবেন। আর সুদের হার ৫ শতাংশ হলে সুদের পরিমাণ দাঁড়াবে ৫০ ইউরো। মেয়াদ শেষ হলে বিনিয়োগকারী তার মূল ১০০ ইউরো ফেরত পান। বন্ডের দাম কমে গেলে এর ইল্ড বা সুদের হার বাড়ে, যা সরকারের ঋণ নেয়াকে আরো ব্যয়বহুল করে তোলে। ফলে স্কুল, হাসপাতাল কিংবা অবকাঠামো উন্নয়নের মতো জনকল্যাণমূলক খাতে অর্থ ছাঁটাই করতে হয়। ২০০০-এর দশকের শুরুর পর ইউরো অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিগুলোতে ১০ বছর মেয়াদি ঋণের সুদের হার সাধারণত ৫ শতাংশের বেশি ওঠেনি। তবে ২০১০ থেকে ২০১২ সালের ইউরোজোন সঙ্কটকালে গ্রিস, ইতালি ও স্পেনকে ৫ শতাংশ বা তার বেশি সুদে ঋণ নিতে হয়েছিল। সুদের হার ৭ শতাংশ অতিক্রম করায় আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালকে তখন বৈশ্বিক আর্থিক সহায়তা বা বেলআউট নিতে হয়। বর্তমানে ফ্রান্সকে ১০ বছর মেয়াদি ঋণের জন্য প্রায় ৫ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে, যেখানে জার্মানির সুদের হার ৩.৪১ শতাংশ; অর্থাৎ ফ্রান্সকে অর্থ ঋণ দিতে বিনিয়োগকারীরা এখন অনেক বেশি ঝুঁকি অনুভব করছেন ও বাড়তি মুনাফা দাবি করছেন। বর্তমানে ইউরোজোন ও যুক্তরাজ্যের বাজারে ফ্রান্সকে ইতালি ও গ্রিসের চেয়েও বেশি সুদে ঋণ নিতে হচ্ছেÑ যদিও গত সঙ্কটে এই দু’টি দেশই সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত ছিল।
সরকারি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪১ লাখ ৪০ হাজার কোটি বা ৪১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের বা জিডিপির ১২৭ শতাংশ। বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের সর্বজনীন চাহিদার কারণে যুক্তরাষ্ট্র এই সুবিধার সুযোগ পায়। এর পরই রয়েছে চীন, যাদের সরকারি ঋণ ২২ লাখ ৫০ হাজার কোটি বা ২২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার এবং এটি জিডিপির ১০৪ শতাংশ। জাপানের মোট ঋণের পরিমাণ আট লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলার। প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে জাপানের ঋণ-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ১৯৯ শতাংশ। যুক্তরাজ্যের সরকারি ঋণের পরিমাণ চার লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার, যা তাদের জিডিপির ১০২ শতাংশ। বিশ্বে সরকারি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে ফ্রান্স। দেশটির ঋণ চার লাখ ২০ হাজার কোটি ডলার, যা জিডিপির ১১৮ দশমিক ৫ শতাংশ। ইতালির সরকারি ঋণের পরিমাণ তিন লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলার হলেও দেশটির ঋণ-জিডিপি অনুপাত ১৩৮ শতাংশ; অর্থাৎ অর্থনীতির আকারের তুলনায় ইতালির ঋণের বোঝা ফ্রান্সের চেয়েও বেশি। অন্য দিকে জার্মানির সরকারি ঋণের পরিমাণ তিন লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার, যা তাদের জিডিপির মাত্র ৬৫ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বা আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ ফ্রান্সের সরকারি ঋণ বেড়ে জিডিপির ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা দেশটির সরকারি অর্থব্যবস্থাকে টেকসই অবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
সরকারি ঋণের পাশাপাশি ব্যক্তিশ্রেণী ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঋণও লাফিয়ে বাড়ছে। ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের বা আইআইএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে মোট ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ কোটি ডলার বেড়ে ৩৬৫ লাখ কোটি বা ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এই ঋণের মধ্যে রয়েছে সরকার, পরিবার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণ। বিশ্বের প্রতিটি মানুষের হিসাবে এই ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪৪ হাজার ডলার, যার বড় অংশই এসেছে উদীয়মান অর্থনীতিগুলো থেকে। এই বিপুল ঋণের সুদ পরিশোধ করাও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো গত এক বছরে সরকারি বন্ডের সুদ পরিশোধে তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি বা ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেছে। এই অর্থ বিশ্বের সামরিক খাতে ব্যয় হওয়া তিন লাখ ১০ হাজার কোটি ডলার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে ব্যয় হওয়া দুই লাখ ৬০ হাজার কোটি ডলার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে ব্যয় হওয়া দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলারের চেয়েও বেশি। সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে জনসেবামূলক খাতে। স্কুল, হাসপাতাল ও পেনশনের মতো খাতে ব্যয়ের জন্য সরকারের হাতে অর্থ কমে আসে। সুদের বাড়তি ব্যয় মেটাতে সরকারকে কর বাড়াতে অথবা সরকারি ব্যয় কমাতে হতে পারে। এ ছাড়া সরকারের ঋণ নেয়ার খরচ বেড়ে গেলে বাড়ি কেনার ঋণ, গাড়ির ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের সুদের হারও বাড়তে পারে। ফলে সরকারি ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








