গণপিটুনিতে ৯ মাসে প্রাণ হারিয়েছেন ১৮৭ জন, রাজনৈতিক সহিংসতায় ৭৩

নিজস্ব প্রতিবেদক 

Advertisement

চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে বাংলাদেশে গণপিটুনি ও গণসহিংসতার ৩৯৮টি ঘটনায় ১৮৭ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার এক হাজার ১৩টি ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৭৩ জন, আহত হয়েছেন প্রায় সাড়ে ছয় হাজার জন। এ ছাড়া কারাগারে ৯৫ বন্দী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে থাকাবস্থায় বা নির্যাতনের শিকার হয়ে আরো ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
মানবাধিকার সহায়তাবিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) প্রকাশিত ২০২৬ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। 
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী রাজনৈতিক বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা, গণপিটুনি ও হেফাজতে মৃত্যুর মতো ঘটনাগুলো দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। 
গণপিটুনি ও গণসহিংসতায় নিহত ১৮৭ : চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে সারা দেশে গণপিটুনি ও গণসহিংসতার ৩৯৮টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে এইচআরএসএস। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৮৭ জন। 
গণপিটুনির ঘটনা সাধারণত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ, সন্দেহ, গুজব কিংবা জনতার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হতে পারে। তবে কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাই, অপরাধের তদন্ত এবং অপরাধীর শাস্তি নির্ধারণের দায়িত্ব আইন ও বিচারব্যবস্থার। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে হত্যা বা শারীরিকভাবে আক্রমণ করা আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। 
প্রতিবেদনে উল্লিখিত মৃত্যুর সংখ্যা গণসহিংসতার ব্যাপকতা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিলেও ঘটনাগুলোর স্থান, কারণ, ভুক্তভোগীদের পরিচয় এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগ ছিল- এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ছাড়া প্রতিটি ঘটনার প্রকৃতি নির্দিষ্টভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। 
রাজনৈতিক সহিংসতার নিহত ৭৩ : এইচআরএসএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী বছরের প্রথম ৯ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার এক হাজার ১৩টি ঘটনায় ৭৩ জন নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় আহতের সংখ্যা ছয় হাজার ৪৭৩ জন ছাড়িয়েছে। 
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাগুলোতে প্রাণহানি ও বিপুলসংখ্যক মানুষের আহত হওয়ার পাশাপাশি জননিরাপত্তা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং স্বাভাবিক সামাজিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। 
রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, দলীয় আধিপত্য বিস্তার ও নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার জেরে সহিংসতা সৃষ্টি হলে তার প্রভাব কেবল সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সাধারণ মানুষ, স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। 
তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা মোট ঘটনার মধ্যে কতটি দলীয় সংঘর্ষ, কতটি আধিপত্য বিস্তারকেন্দ্রিক বিরোধ এবং কতটি অন্য কোনো কারণে ঘটেছে, তার বিস্তারিত বিভাজন এখানে পাওয়া যায়নি। 
নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় মৃত্যু ১৩ : এ সময় নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় ১৩ জন নিহত হওয়ার তথ্য মিলেছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের মতামত প্রকাশ এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া হচ্ছে নির্বাচন। কিন্তু এটিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হামলা কিংবা কারো মৃত্যু হলে ভোটারদের নিরাপত্তা, অবাধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচনী কার্যক্রম চালানোর পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। 
নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ ভূমিকা, অভিযোগের দ্রুত তদন্ত, সহিংসতায় জড়িতদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক পক্ষগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ গুরুত্বপূর্ণ। 
তবে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় নিহত ১৩ জনের তথ্যকে রাজনৈতিক সহিংসতায় মোট ৭৩ জন নিহত হওয়ার পরিসংখ্যানের বাইরে আলাদা করে যোগ করার আগে দু’টি শ্রেণীর মধ্যে কোনো ওভারল্যাপ আছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। একইভাবে নির্বাচনকেন্দ্রিক ঘটনাগুলো রাজনৈতিক সহিংসতার মোট ঘটনার অন্তর্ভুক্ত কি না, সে বিষয়টিও প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্য দিয়ে নিশ্চিত করা দরকার। 
হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতন নিয়ে উদ্বেগ : প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে থাকাবস্থায় অথবা নির্যাতনের শিকার হয়ে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। কারাগার বা পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতনের অভিযোগ মানবাধিকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কোনো ব্যক্তিকে আটক করলে তার জীবন, শারীরিক নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তার প্রতি নির্যাতন বা অমানবিক আচরণের কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের মৃত্যুর ক্ষেত্রে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত কারণ নির্ধারণ, চিকিৎসা ও ময়নাতদন্তের তথ্য যাচাই এবং অভিযোগের ভিত্তিতে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। 
৯ মাসে ৯৫ কারাবন্দীর মৃত্যু : এইচআরএসএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের কারাগারগুলোতে ৯৫ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। কারাগারে বন্দীদের স্বাস্থ্যসেবা, পর্যাপ্ত চিকিৎসা, নিরাপদ আবাসন ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা মানবাধিকার সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারাগারে মৃত্যুর সংখ্যা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বন্দীদের বয়স, অসুস্থতা, মৃত্যুর কারণ, কারাগারভিত্তিক তথ্য ও চিকিৎসাসেবার প্রাপ্যতার মতো বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। 
শুধু মৃত্যুর মোট সংখ্যা থেকে সব মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করা যায় না। এ জন্য প্রতিটি মৃত্যুর কারণ, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা নথি এবং প্রয়োজনীয় তদন্তের তথ্য বিশ্লেষণ করা দরকার। 
এইচআরএসএস জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এ জন্য ১৬টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ, সংগঠনটির নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ এবং বিভিন্ন ঘটনার অনুসন্ধানভিত্তিক প্রতিবেদন ব্যবহার করা হয়েছে। 
সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য, নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন একত্র করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন ঘটনা শনাক্তের চেষ্টা করেছে সংগঠনটি। 
প্রয়োজন জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা : প্রতিবেদনে উঠে আসা পরিসংখ্যানগুলো বাংলাদেশের জননিরাপত্তা, রাজনৈতিক সহিংসতা, হেফাজতে ব্যক্তিদের সুরক্ষা এবং কারাগারের পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। 
গণপিটুনি ও রাজনৈতিক সহিংসতায় মৃত্যু প্রতিরোধে আইনের কার্যকর প্রয়োগ, অপরাধের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সেই সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, আটক ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষা এবং কারাগারে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। 
তবে মানবাধিকার পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র বুঝতে শুধু মোট মৃত্যুর সংখ্যা জানাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ঘটনাভিত্তিক তথ্য, নিরপেক্ষ তদন্তের ফলাফল, বিচারিক অগ্রগতি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কার্যকারিতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা। এইচআরএসএসের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন সেই আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতির উন্নতি মূল্যায়নের জন্য একই পদ্ধতিতে সংগৃহীত ধারাবাহিক তথ্য, সরকারি পরিসংখ্যান এবং স্বাধীন তদন্তের ফলাফলের সাথে এসব তথ্য তুলনা করা প্রয়োজন।