পরিবারের আয়ের বড় অংশই খরচ হচ্ছে শিক্ষা খাতে

 শাহেদ মতিউর রহমান

Advertisement

নিম্নবিত্ত কিংবা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের আয়ের একটি বড় অংশই ব্যয় হচ্ছে শিক্ষা খাতে। পরিসংখ্যান বলছে বছরে প্রতি শিক্ষার্থীর জন্য পরিবারভেদে এই ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪ হাজার থেকে ২৭ হাজার টাকা। বিশেষ করে বাচ্চাদের কোচিং কিংবা প্রাইভেট পড়ানোর পেছনেই খরচের বড় অংশ চলে যাচ্ছে। ফলে অন্যান্য খরচের বিষয়ে পরিবার ব্যয় সংকোচন নীতি মানলেও শিক্ষার  ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের আয়ের বড় অংশই চলে যাচ্ছে।  
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে শিক্ষা অর্জনের জন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর পরও অভিভাবকদের অনেকের ব্যয় শেষ হচ্ছে না। বিদ্যালয়ের বেতন, বই-খাতা, পোশাক ও যাতায়াতের খরচের সাথে যুক্ত হচ্ছে প্রাইভেট টিউশন, কোচিং সেন্টার ও গাইডবইয়ের ব্যয়। সন্তানকে ভালো ফল করানোর প্রত্যাশা থেকে অনেক পরিবারকে মাসের পর মাস এই বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য তা হয়ে উঠছে বড় আর্থিক চাপ। অন্য দিকে, প্রাইভেট ও কোচিংয়ের পেছনে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বিশ্রাম, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজের সুযোগও কমছে।
শিক্ষা নিয়ে কাজ করা সংস্থা ক্যাম্পেইন ফর পপুলার এডুকেশনের (ক্যাম্পে) এডুকেশন ওয়াচের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে পরিবারের শিক্ষাব্যয়ের যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে এই চাপের স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে প্রাথমিক স্তরের একজন শিক্ষার্থীর পেছনে পরিবারের গড় বার্ষিক ব্যয় ছিল ১৩ হাজার ৮৮২ টাকা। এর মধ্যে প্রাইভেট শিক্ষক ও কোচিংয়ের পেছনে ব্যয় ছিল সাত হাজার ৮৬৮ টাকা। অর্থাৎ মোট শিক্ষাব্যয়ের  প্রায় ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশই গেছে এই খাতে। মাধ্যমিক স্তরে ব্যয় আরো বেশি। একই প্রতিবেদনে ২০২২ সালে একজন মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর পেছনে পরিবারের গড় বার্ষিক শিক্ষাব্যয় ছিল ২৭ হাজার ৩৪০ টাকা। এর মধ্যে প্রাইভেট শিক্ষক ও কোচিং সেন্টারের পেছনে ব্যয় ছিল ১২ হাজার ২০৪ টাকা, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ  বিদ্যালয়ের অন্যান্য খরচের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বাড়তি পড়াশোনার পেছনেও পরিবারের উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
অবশ্য বিশেষজ্ঞদের মতে একজন পরিবারের মাসিক আয়ের কত অংশ সন্তানের প্রাইভেট ও কোচিংয়ের পেছনে যাচ্ছে, তা নির্ভর করে পরিবারের আয়, শিক্ষার্থীর শ্রেণী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধরন এবং এলাকার ওপর। ক্যাম্পের প্রতিবেদনটি শিক্ষাব্যয়ের হিসাব তুলে ধরলেও, উপরের গড় ব্যয়ের তথ্য দিয়ে সব পরিবারের আয়ের নির্দিষ্ট শতাংশ নির্ধারণ করা যায়নি। শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে কোনো পরিবারের মাসিক আয় ৩০ হাজার টাকা এবং সন্তানের প্রাইভেট ও কোচিংয়ের পেছনে মাসে তিন হাজার টাকা ব্যয় হলে শুধু এই খাতেই আয়ের ১০ শতাংশ চলে যায়। দুই সন্তানের ক্ষেত্রে একই হারে ব্যয় হলে তা দাঁড়ায় ২০ শতাংশে। এর সাথে বিদ্যালয়ের ফি, বই-খাতা, পোশাক ও যাতায়াতের খরচ যোগ হলে শিক্ষার মোট ব্যয়ের চাপ আরো বাড়ে। তাই শুধু শিক্ষাব্যয়ের পরিমাণ নয়, পরিবারের আয়ের তুলনায় এই ব্যয়ের অনুপাত নির্ধারণ করাও জরুরি। এ জন্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) আয়-ব্যয় জরিপের তথ্যের পাশাপাশি শিক্ষার্থীর শ্রেণী, অঞ্চল, পরিবারের আয় ও প্রাইভেট-কোচিংয়ের ব্যয় ধরে আলাদা জরিপ প্রয়োজন।
কেন বাড়ছে কোচিং নির্ভরতা?
শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের সাথে এ বিষয়ে আলোচনায় কয়েকটি বিষয় সামনে এসেছে যেমন  শ্রেণীকক্ষে পাঠ পুরোপুরি বুঝতে না পারা, পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের প্রতিযোগিতা, পাঠ্যসূচি শেষ করার চাপ, বড় শ্রেণীকক্ষ এবং শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগতভাবে শেখার সুযোগের অভাব। এর সাথে যুক্ত হয়েছে অভিভাবকদের মধ্যে এমন ধারণা যে, অন্য শিক্ষার্থীরা কোচিং করলে নিজের সন্তান পিছিয়ে পড়তে পারে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের ভিত্তিতে অতিরিক্ত সহায়তা নেয়ার পরিবর্তে প্রাইভেট বা কোচিং বাধ্যতামূলক অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে। এতে যেসব পরিবারের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের সামর্থ্য আছে, তাদের সন্তান বাড়তি সহায়তা পাচ্ছে; আর আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক অসুবিধায় পড়ে যাচ্ছে। তবে কারো কারো মতে সব প্রাইভেট টিউশন বা কোচিংকে অপ্রয়োজনীয় বলা যাবে না। কোনো শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট বিষয়ে দুর্বল হলে অতিরিক্ত সহায়তা তার শেখার ঘাটতি পূরণ করতে পারে। সমস্যা তৈরি হয় যখন বিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠদানের বিকল্প হিসেবে কোচিংয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়ে, কিংবা শিক্ষার্থীরা সামাজিক ও পারিবারিক চাপের কারণে কোচিং করতে বাধ্য হয়।
কেমন নীতিমালা প্রয়োজন? 
প্রথমত, বিদ্যালয়ে কার্যকর পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত ক্লাসে পাঠ বুঝিয়ে দেয়া, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তামূলক ক্লাস এবং বিষয়ভিত্তিক মূল্যায়ন চালু করা গেলে প্রাইভেটের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে। বিদ্যালয়ে শেখার ঘাটতি রেখে পরে অর্থের বিনিময়ে তা পূরণের পরিস্থিতি তৈরি হওয়া উচিত নয়।
দ্বিতীয়ত, কোচিং সেন্টারের নিবন্ধন, ফি, নিরাপত্তা, বিজ্ঞাপন ও পরিচালনা বিষয়ে বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের ওপর অযৌক্তিক চাপ, বিভ্রান্তিকর ফলাফলের বিজ্ঞাপন এবং অভিভাবকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং পরিচালনা বা শিক্ষার্থীদের সেখানে যেতে উৎসাহিত করার বিষয়ে স্বার্থের সংঘাত এড়াতে স্পষ্ট বিধান দরকার। তৃতীয়ত, সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যালয়ভিত্তিক সহায়ক পাঠের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা মূল্যে অতিরিক্ত ক্লাস, বিষয়ভিত্তিক সহায়তা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষাবৃত্তির সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
চতুর্থত, পরিবারের শিক্ষাব্যয়ের ওপর নিয়মিত জাতীয় জরিপ করতে হবে। এতে মাসিক আয় অনুযায়ী প্রাইভেট ও কোচিং ব্যয়ের হার, শ্রেণীভিত্তিক ব্যয়, শহর-গ্রামের পার্থক্য এবং একাধিক সন্তান থাকা পরিবারের চাপ আলাদাভাবে তুলে ধরতে হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই কার্যকর নীতিমালা ও নজরদারির ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব। পঞ্চমত, শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা ও অবসরকে গুরুত্ব দিতে হবে। অতিরিক্ত ক্লাস, কোচিং ও পরীক্ষার প্রস্তুতির চাপে ঘুম, খেলাধুলা ও পরিবারের সাথে সময় কাটানোর সুযোগ যেন নষ্ট না হয়, সেজন্য বিদ্যালয়ভিত্তিক সময়সূচি ও মূল্যায়নব্যবস্থার পর্যালোচনা প্রয়োজন।
শিক্ষা যেন সামর্থ্যরে প্রতিযোগিতা না হয়
শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা ও চিন্তাশক্তির বিকাশ। কিন্তু নিয়মিত বিদ্যালয়ের পাঠের পাশাপাশি বাড়তি অর্থ ব্যয় না করলে ভালো ফল করা কঠিন- এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলে শিক্ষার সুযোগে বৈষম্য বাড়ার ঝুঁকি থাকে। প্রাইভেট ও কোচিংয়ের ওপর নির্ভরতা কমাতে শুধু নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়। শ্রেণীকক্ষে মানসম্মত পাঠদান, শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা, শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি পূরণ এবং কোচিং খাতে স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রণ- সব কিছু একসাথে নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারের আয় অনুযায়ী শিক্ষাব্যয়ের চাপ পরিমাপ করে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করাও জরুরি। নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, একটি শিশুর মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পরিবারকে বিদ্যালয়ের বাইরে কতটা অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে এবং কেন। সেই প্রশ্নের তথ্যভিত্তিক উত্তর খুঁজে বের করেই এমন নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে অভিভাবকের আর্থিক সামর্থ্য নয়, শিক্ষার্থীর শেখার সুযোগই শিক্ষার মান নির্ধারণ করে।