ধারাবাহিক পতনের পর এবার পুঁজিবাজারে লেনদেন খরা

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
কারণে-অকারণে ধারাবাহিক পতন ঘটলেও দেশের পুঁজিবাজারগুলো সাম্প্রতিক সময়ে একটি গ্রহণযোগ্য লেনদেন নিষ্পত্তি করে চলেছিল। বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত পর্যায়ে না পৌঁছলেও একটি সম্মানজনক অবস্থায় ঘুরপাক খাচ্ছিল দেশের পুঁজিবাজারগুলোর লেনদেন। কিন্তু তাও এখন আর টিকে থাকছে না। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে ব্যর্থ পুঁজিবাজারগুলোতে তাই শুরু হয়েছে লেনদেন খরা। শনিবারের পর গতকাল রোববারও চার শ’ কোটির নিচে নামে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) লেনদেন। 
বাজারসংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন রাখেন, দিনের পর দিন বাজারে সূচকের পতন ঘটতে থাকলে বিনিয়োগকারীরা কিসের আশায় বাজারে পড়ে থাকবে? নতুন সরকার দায়িত্ব নিলো আট মাস হয়ে গেলো। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) গঠিত হওয়ার পর পার হয়েছে চার মাসের বেশি। সরকার ও বিএসইসির পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে বিনিয়োগকারীদের আশ^স্ত করা হলেও পুঁজিবাজার তার স্বাভাবিক গতিতে ফিরছে না। ধারাবাহিক পতনের ফলে প্রতিদিনই মূলধন হারাচ্ছেন বাজারের ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। এর ফলে ক্রমান্বয়ে বাজার থেকে সরে যাচ্ছেন তারা। তবে তারা মনে করেন, এটি যেকোনো পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক চিত্র। বাজার ভালো আচরণ শুরু করলে সাইড লাইনে সরে যাওয়া এসব বিনিয়োগকারী আবার বাজারে ফিরবেন বলে মনে করেন তারা। 
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ গতকাল ৩৬৫ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের দিন অপেক্ষা ৪৮ কোটি টাকা বেশি। শনিবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৩১৭ কোটি টাকা। তবে ডিএসইর গতকালের এ লেনদেনও ছিল বাজারটির বিগত দশ মাসের সর্বনি¤œ। চলতি বছরের ১২ জানুয়ারির পর  আর এ পর্যায়ে নামেনি পুঁজিবাজারটির লেনদেন। অন্য দিকে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) লেনদেন ছিল মাত্র আট কোটি টাকা। এমনিতেই সিএসইর লেনদেন খুব উৎসাহব্যঞ্জক না হলেও সাম্প্রতিক সময়ে বাজারটির লেনদেন ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছিল। তবে সম্প্রতি এখানেও লেনদেন নেমে এসেছে ১০ কোটির নিচে। 
পুঁজিবাজারের লেনদেন বরাবরই তার সূচকের আচরণের দ্বারা প্রভাবিত হয়। সূচকের ধারাবাহিক পতন যেমন বিনিয়োগকারীদের বাজারে অংশগ্রহণের আগ্রহ কমিয়ে দেয় তেমনি সূচকের ধারাবাহিক উন্নতি বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে দিতে পারে। এটাই সাড়া বিশে^র সব পুঁজিবাজারের ধর্ম। আমাদের দেশও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু আমাদের পুঁজিবাজারে গত দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে চলে আসছে অস্থিরতা। এর মধ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উপসর্গ যেমন সক্রিয় ছিল তেমনি কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াও মাসের পর মাস বাজারে পতন ঘটেছে সূচকের। অর্থাৎ কোনো উপসর্গ ছাড়াও নেতিবাচক প্রবণতা থেকে বের হতে পারেনি আমাদের পুঁজিবাজার। এটাই আমাদের বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বেশি হতাশ করেছে। 
ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১০ দশমিক ৫০ পয়েন্ট অবনতি ঘটে। ৫ হাজার ৪৩৩ দশমিক ১৭ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৪২২ দশমিক ৬৭ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৪ দশমিক ৫৪ ও ৩ দশমিক ১৯ পয়েন্ট। অন্য দিকে সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক গতকাল ৩৬ দশমিক ১৫ পয়েন্ট হ্রাস পায়। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের পতন ঘটে যথাক্রমে ৩ দশমিক ১৯ ও ২০ দশমিক ৮৩ পয়েন্ট। 
এ দিকে পুঁজিবাজারের জন্য সৃষ্ট বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ একাডেমি ফর সিকিউরিটিজ মার্কেট’ (বিএএসএম) গুটিয়ে নেয়ার অবস্থান থেকে পিছু হেঁটেছে এর পরিচালনা পর্ষদ। পর্ষদের নতুন সিদ্ধান্তের ফলে এখনই বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে না জাতীয় পর্যায়ের এই বিনিয়োগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। এর আগে পর্ষদ সভা থেকে প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়ার একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। তবে সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সার্বিক সমালোচনা তৈরি হলে পর্ষদ তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
জানা যায়, প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় কমাতে দিলকুশার জীবন বীমা ভবনের বর্তমান কার্যালয়টি মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই) ভবনে অবস্থিত ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডের (সিএমএসএফ) কার্যালয়ে সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বর্তমানে অফিস ভাড়া ও বিভিন্ন সার্ভিস চার্জ বাবদ প্রতি মাসে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা খরচ হলেও নতুন স্থানে গেলে এই ব্যয়ের বড় অংশই বেঁচে যাবে। 
সিদ্ধান্ত  অনুযায়ী আগামী ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ডিসিসিআই ভবনের সিএমএসএফ কার্যালয় থেকে বিএএসএমের যাবতীয় নতুন কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিনিয়োগ শিক্ষাকার্যক্রম বিভাগের নির্বাহী পরিচালক মো: শফিউল আযম স্পষ্ট করেন যে, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম স্থগিত বা বন্ধ করা হচ্ছে না।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ‘বিনিয়োগ শিক্ষামালা গেজেট’-এর আইনি কাঠামোর আওতায় বিএএসএমকে একটি স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গঠন করা হয়েছিল। সরকারি গেজেটের কোথাও এর কার্যক্রম চিরতরে বিলুপ্ত করার কোনো বিধান বা ইচ্ছার উল্লেখ নেই; বরং দেশের অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের ধারাবাহিক অগ্রগতির সুরক্ষায় একে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেওয়া হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির মূল নীতি যেমন দেশব্যাপী বিনিয়োাগ শিক্ষা, আর্থিক সচেতনতা বাড়ানো এবং মাঠপর্যায়ে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ প্রদান তেমনি এসব কর্মসূচি গতিশীল রাখার ক্ষেত্রে বিএএসএম একটি দক্ষ ‘বাস্তবায়নকারী শাখা’ হিসেবে অবদান রাখছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিকিউরিটিজ কমিশনের প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ও দ্রুত সক্ষমতা বৃদ্ধির কর্মসূচিগুলো কোনো সাধারণ একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একা সামাল দেয়া প্রায় অসম্ভব। প্রশাসনিক জটিলতা এড়িয়ে এবং কাজের সঠিক সমন্বয় ঘটিয়ে এই জরুরি চাহিদা পূরণ করতেই বিএএসএমকে গড়ে তোলা হয়। যদিও একই ধরনের আরেকটি প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেট’ (বিআইসিএম) শেয়ারবাজারে উচ্চতর গবেষণা ও একাডেমিক ডিগ্রি প্রদানে কাজ করছে, তথাপি বিএএসএম মূলত বিএসইসির সরাসরি পরিচালনাধীন ব্যবহারিক দক্ষতা উন্নয়ন এবং মাঠপর্যায়ের নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে মনোযোগ দিয়ে থাকে।

Advertisement