ভার্চুয়ালি বিচার চলবে জিয়াউলের, কথা বলবেন হোয়াটসঅ্যাপে

 নিজস্ব প্রতিবেদক

Advertisement

নিরাপত্তা ও জীবননাশের আশঙ্কার কথা বিবেচনায় নিয়ে কারাগারে বসেই ভাচুয়ালি বিচারকাজে অংশ নেয়ার সুযোগ পেয়েছেন সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান। একই সাথে আইনজীবীদের সাথে গোপনীয়তা বজায় রেখে যোগাযোগের স্বার্থে হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলার অনুমতিও দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, আইনজীবীদের সাথে তার কথোপকথন অন্য কেউ শুনতে পারবেন না।
গতকাল মঙ্গলবার প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীম এ তথ্য জানান। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে শতাধিক গুম ও খুনের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ১৫তম সাক্ষী ও তদন্ত কর্মকর্তা মো: রফিকুল ইসলামের জেরা এদিন ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হয়। জেরা আবার শুরুর জন্য আগামী ২৬ অক্টোবর দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীম জানান, নিরাপত্তার কারণে জিয়াউল আহসানকে সশরীরে ট্রাইব্যুনালে হাজির না করে কারাগারে রেখেই বিচারকাজ পরিচালনার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন আদালত। এর আগে গত ৮ অক্টোবর তার আইনজীবী নাজনীন নাহার জীবননাশের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে আবেদন করেন। আবেদনে অন্য আসামিদের সাথে প্রিজনভ্যানে তাকে ট্রাইব্যুনালে আনা-নেয়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।
তামীম বলেন, আসামিপক্ষের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগের সাথে রাষ্ট্রপক্ষ একমত হলেও অন্য আসামিদের সাথে একই প্রিজনভ্যানে আনা-নেয়ার আবেদনে আপত্তি জানানো হয়েছিল। পরে জিয়াউল আহসানকে কারাগারে রেখেই ভার্চুয়ালি হাজির করার আবেদন করা হয়। ট্রাইব্যুনাল সেই আবেদন মঞ্জুর করেন।
গতকাল জিয়াউল আহসানের আইনজীবীরা আরেকটি আবেদন করেন। এতে ভার্চুয়াল বিচারকাজ চলাকালে আসামির সাথে আইনজীবীদের নিরাপদ ও গোপনীয় যোগাযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। আইনজীবীদের সাথে আলোচনার বিষয়বস্তু যেন অন্য কেউ শুনতে না পারেন, সেটিই ছিল আবেদনের অন্যতম যুক্তি।
প্রসিকিউটর তামীমের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনাল লিখিত আবেদনটি মঞ্জুর করেছেন। ফলে কারাগারে বসে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে আইনজীবীদের সাথে কথা বলতে পারবেন জিয়াউল আহসান। এ কথোপকথন শুধু আসামি ও তার আইনজীবীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আদালত মনে করলে পরবর্তী সময়ে তাকে সশরীরে হাজির করার সুযোগও রাখা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের বিবেচনায় যত দিন প্রয়োজন, তত দিন ভার্চুয়াল পদ্ধতিতেই মামলার কার্যক্রম চলবে। তামিম আরো জানান, ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে বিচারকাজ পরিচালনার পরও কোনো অসুবিধা দেখা দিলে তা ট্রাইব্যুনালকে জানানো যাবে। প্রয়োজন মনে করলে আসামিকে সশরীরে হাজির করার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।
জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা মো: রফিকুল ইসলামের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় গত ৩০ সেপ্টেম্বর। গত ৮ অক্টোবর তার জবানবন্দী শেষ হয়। মঙ্গলবার আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাকে জেরা শুরু করেন। জবানবন্দীতে রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রকাশ্যে এলে সেগুলোকে বৈধতা দিতে লোকদেখানো প্রশাসনিক তদন্ত করা হতো। প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে নিয়ন্ত্রিত তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ গোপন রাখা এবং মিথ্যা বা ভুল ময়নাতদন্ত ও পুলিশ প্রতিবেদন তৈরিতে কর্মকর্তাদের বাধ্য করার অভিযোগও তুলে ধরেন তিনি। এসব অভিযোগের সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মামলায় তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। প্রথম অভিযোগটি ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাতে গাজীপুরের পুবাইলে সজলসহ তিনজনকে হত্যার ঘটনা নিয়ে। অভিযোগে ওই ঘটনায় জিয়াউল আহসানের সরাসরি উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় অভিযোগে ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী এলাকায় বলেশ্বর নদীর মোহনায় নজরুল, মল্লিকসহ ৫০ জনকে হত্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তৃতীয় অভিযোগেও একই সময়কালে বরগুনার বলেশ্বর নদী ও বাগেরহাটের শরণখোলা-সংলগ্ন সুন্দরবন এলাকায় তথাকথিত বনদস্যু দমনের আড়ালে মাসুদসহ ৫০ জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এসব ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল-১। একই দিন প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরে ২৩ ডিসেম্বর তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়া হয়।
নিরাপত্তা ও আইনজীবীদের সাথে গোপনীয় যোগাযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এখন কারাগার থেকেই মামলার পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নেবেন জিয়াউল আহসান। আগামী ২৬ অক্টোবর তদন্ত কর্মকর্তাকে আবার জেরার মধ্য দিয়ে মামলার কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার কথা রয়েছে।