বরাদ্দ শেষ হলেও উদ্ধার হয় না খাল, হারিয়ে যাচ্ছে নগরের পানি নিষ্কাশনের পথ

আবুল কালাম 

Advertisement

কয়েক দশক আগেও রাজধানীর পানি নিষ্কাশনে নগরবাসীর কোনো অভিযোগ ছিল না। বৃষ্টি শেষে অসংখ্য খাল, জলাশয় ও প্রাকৃতিক নালা দিয়ে পানি দ্রুত নদীতে নেমে যেত। কিন্তু দখল দূষণে এখন সব বদলে গেছে। ফলে নদী খাল-বিল-জলাভূমির জীবন্ত নেটওয়ার্ক ঢাকা এখন বাসের অযোগ্য নগরীতে পরিণত হয়েছে। জলাবদ্ধতা ও দখলে হারিয়ে যাচ্ছে নগরের পানি নিষ্কাশনের পথ। 
একাধিক সংস্থার গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, একসময় রাজধানীতে প্রায় ৩৪৪ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল ছিল। সময়ের ব্যবধানে এই নেটওয়ার্কের প্রায় ৬৪ শতাংশই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ অবস্থায় ঢাকায় জলাধার উদ্ধারে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার বাজেট হচ্ছে। কিন্তু তাতে লাভ হচ্ছে না। প্রতি বছর বরাদ্দ শেষ হলেও উদ্ধার হয় না খাল। 
ঢাকা জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, রাজধানীতে ৫০টি খাল রয়েছে। তবে দুই সিটি করপোরেশন ৪৬টি খালের অস্তিত্বের কথা বলছে। এর মধ্যে বর্তমানে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ২৬টি খালের দায়িত্বে রয়েছে, আর বাকি খালগুলো গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন। 
এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের পিএইচডি গবেষক ও সহকারী অধ্যাপক মো: আশ্রাফ উদ্দিন একটি গবেষণা চালিয়েছেন। গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে ঢাকার জলাভূমির দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন, এর কারণ, ভবিষ্যৎ প্রবণতা ও ব্যবস্থাপনা চর্চা তুলে ধরা হয়। 
এতে বলা হয়, ১৯৮৮ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার জলাভূমি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এ সময়ে জলাভূমিবহির্ভূত ভূমি প্রায় ৮৩ বর্গকিলোমিটার বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মার্শ বা নিম্নভূমি জলাভূমি। এটি ১০১ বর্গকিলোমিটার থেকে কমে ২২ দশমিক ৯ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে। 
খালগুলো মানচিত্রে থাকলেও বাস্তবে অনেক খালের প্রস্থ, গভীরতা, পানিপ্রবাহ ও পরিবেশগত কার্যকারিতা কমেছে উল্লেখ করে গবেষণায় বলা হয়, পুকুর ও লেকের ক্ষেত্রে ভরাট, দখল, বর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্য, অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।  
গবেষণায় জলাভূমি হ্রাসের প্রধান কারণ হিসেবে ভূমি ভরাট, দখল, বর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্য দূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং দুর্বল আইন প্রয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ভূমির রেকর্ড ও সীমানাসংক্রান্ত জটিলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব এবং জনসচেতনতার ঘাটতিকেও দায়ী করা হয়েছে। 
অন্য দিকে গেল বছরের ২৭ জুলাই ‘চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ’ আরেকটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ‘প্রকৃতিবিহীন ঢাকা? প্রাকৃতিক অধিকারভিত্তিক টেকসই নগর ভাবনার পুনর্বিচার’ শীর্ষক গবেষণায় ৪৪ বছরে ঢাকার ৬০ শতাংশ জলাশয় হারিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়। এতে বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে ঢাকা এমন অশঙ্কা প্রকাশ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় ১৯৮০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নির্মাণাধীন এলাকা সাত গুণ বেড়েছে, ভূমির তাপমাত্রা ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে এবং ৬০ শতাংশ জলাশয় হারিয়েছে।  
গবেষণায় বলা হয়, ১৯৮০ সাল থেকে এ পর্যন্ত রাজধানী ঢাকা তার মোট গাছের প্রায় অর্ধেক হারিয়েছে। যেখানে এই শহরের ২১.৬ শতাংশ জায়গায় গাছ ছিল, এখন তা কমে এসেছে মাত্র ১১.৬ শতাংশে। শহরের কিছু এলাকায় গাছপালা ও জলাশয় প্রায় নেই বললেই চলে। 
বিরাজমান সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বাজেট খরচ করলেও তাতে সফলতা দেখাতে পারছে না। ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশনের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত এক দশকে নালা নির্মাণ ও সংস্কার, খাল পরিষ্কার ও জলাবদ্ধতা নিরসনসহ নানা কাজে অন্তত দুই হাজার ১৪৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। 
অন্য দিকে ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৯-২০ এই পাঁচ অর্থবছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নালা নির্মাণ ও সংস্কারে ৬০৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা এবং ঢাকা উত্তর সিটি ৭১১ কোটি টাকা খরচ করে। প্রায় একই সময়ে ঢাকা ওয়াসার জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যয় ছিল ১০০ কোটি টাকার মতো। তিন সংস্থার ব্যয় মিলে দাঁড়ায় প্রায় এক হাজার ৪১৬ কোটি টাকা। 
এরপর ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে খাল ও পানি নিষ্কাশনের দায়িত্ব যায় দুই সিটি করপোরেশনের হাতে। পরের চার বছরে তারা আরো অন্তত ৭৩০ কোটি টাকা খরচ করে। আগের এক হাজার ৪১৬ কোটির সাথে এই ব্যয় যোগ করেই ২০২৪ সাল পর্যন্ত অঙ্কটি দুই হাজার ১৪৬ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। হিসাব করলে দেখা যায়, এ সময়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৯ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। 
এর বাইরে সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই সিটি করপোরেশনের বরাদ্দ ছিল ১৬৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ডিএসসিসির ১১৫ কোটি টাকা ও ডিএনসিসির ৫০ কোটি। খরচের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে শান্তিনগর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে ডিএসসিসি প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করে। মালিবাগ রেলক্রসিং থেকে বিজয়নগর পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার স্টর্ম ড্রেনেজ লাইন নির্মাণে সেই টাকা খরচ করা হয়। কিন্তু এই বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও কার্যত ফলাফল মিলছে না। এ নিয়ে ডিএসসিসির ভাষ্য, ঢাকা ওয়াসার ভাটিতে থাকা পাম্প স্টেশনগুলোর পর্যাপ্ত নিষ্কাশন ক্ষমতা না থাকায় তাতে সফলতা আসছে না।  
এ বিষয়ে পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক পরিবেশ বিশেষজ্ঞ মো: মাহামুদুর রহমান পাপন নয়া দিগন্তকে বলেন, এর উত্তোরণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও টেকসই ড্রেনেজ ব্যবস্থার জন্য ভবিষ্যৎ বিবেচনায় বিনিয়োগ প্রয়োজন। এ ছাড়া সরকারি সংস্থাগুলোর দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতা দূর করে একটি শক্তিশালী একক সেন্ট্রাল সেলের অধীনে কাজ করা এবং নাগরিকদের নিজেদেরও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বশীলতা অত্যন্ত জরুরি। অন্য দিকে বৃষ্টির পানি বাইরে নিষ্কাশনে খাল প্রাকৃতিকভাবেই শহরকে রক্ষা করে। তাই স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে অবৈধ দখল ও স্থাপনা উচ্ছেদ,কঠোর মনিটরিং ও আইন প্রয়োগ, সীমানা নির্ধারণ, দূষণ প্রতিরোধ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ পরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে।