রোহিঙ্গা, নিরাপত্তা
  • কাঁটাতার, ওয়াচটাওয়ার ও সিসিটিভির বেশির ভাগ অকেজো  
  • কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ অনলাইন গেমিংয়ে জড়িয়ে পড়ছে

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ ভয়াবহ অনলাইন গেমিংয়ে জড়িয়ে পড়েছে। পাশাপাশি সংগঠিত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও জেন-জি রোহিঙ্গা তরুণদের বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কারণে শিবিরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। একই সাথে রোহিঙ্গা শিবিরের নিরাপত্তায় স্থাপন করা কাঁটাতারের বেড়া, ওয়াচটাওয়ার ও সিসিটিভি ক্যামেরার বেশির ভাগই অকেজো হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় রোহিঙ্গা শিবিরের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবছে সরকার। নিরাপত্তায় বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সম্প্রতি সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন রোহিঙ্গাবিষয়ক জাতীয় কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। 
সূত্র জানায়, বৈঠকে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা শিবিরের নিরাপত্তা নিয়ে বেশ কিছু তথ্য তুলে ধরা হয়। বৈঠকে জানানো হয়, রোহিঙ্গা শিবিরের নিরাপত্তায় স্থাপন করা ৭০ কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া, ৮৩টি ওয়াচটাওয়ার ও ৭৬০টি সিসিটিভি ক্যামেরার বেশির ভাগই নেই অথবা অকেজো হয়ে পড়েছে। 
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আরআরআরসি ও এপিবিএন সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক মিলিয়ে প্রায় ১৮ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। রোহিঙ্গা শিবিরের কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ অনলাইন গেমিংয়ে জড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি সংগঠিত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও জেন-জি রোহিঙ্গা তরুণদের বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কারণে শিবিরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। 
বৈঠকে জানানো হয়, অনলাইন গেমিং ও অন্যান্য অপরাধ দমনে এপিবিএন নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত, বিশেষ অভিযান ও যৌথ অভিযান পরিচালনা করছে। অপরাধে জড়িত রোহিঙ্গা তরুণদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। 
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, এপিবিএন, ব্যাটালিয়ন আনসার, জেলা পুলিশ, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি), বিজিবি ও সেনাবাহিনী ৩২টি যৌথ অভিযান চালিয়েছে। বৈঠকে অনলাইন গেমিং, সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং অপরাধে জড়িত রোহিঙ্গা তরুণদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। 
বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। বৈঠকে ক্ষতিগ্রস্ত কাঁটাতারের বেড়া মেরামত এবং হারিয়ে যাওয়া ও নষ্ট হওয়া নিরাপত্তা সরঞ্জাম পুনঃস্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। এ কাজের প্রস্তাব তৈরি করবে সশস্ত্রবাহিনী বিভাগ। আর পুলিশ সদর দফতর বাজেট তৈরি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখায় জমা দেবে। 
আরআরআরসি কার্যালয় জানায়, ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর কক্সবাজারের উপমহাপুলিশ পরিদর্শককে (এফডিএমএন) চিঠি দিয়ে ৮, ১৬, ১৮ ও ২০ নম্বর ক্যাম্পে চেকপোস্ট স্থাপনের অনুরোধ করা হয়েছিল। এর আগে একই বছরের ১১ মার্চ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কাঁটাতারের বেড়া মেরামতের অনুরোধ জানানো হয়। কক্সবাজারের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বৈঠকে জানায়, সিসিটিভি ক্যামেরা সুরক্ষায় ড্রোন, লোহার ব্যারিকেড ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা প্রয়োজন। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চলতি বছরের ১৩ জুলাই এপিবিএন সদর দফতরে চিঠি দেয়া হয়েছে।  
বৈঠকে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ২ হাজার ৬৭৫ বর্গফুট জায়গায় অস্থায়ী মাদক পরীক্ষাগার স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। পরীক্ষাগারের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দেবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়। 
অবৈধ মাদকের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করার সিদ্ধান্তও হয়েছে। মাদক কারবারীদের বিষয়ে তথ্য দিতে দেরি করলে ডিএনসিকে তা জানানো হবে। মামলা করার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আগের মামলার নথিও যাচাই করা হবে। 
অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রতিনিধিরা বৈঠকে জানান, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে তারা সব ইউনিটকে চিঠি দিয়েছেন। পাশাপাশি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত কক্সবাজার এলাকায় ১৮টি মাদক মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। আরো ৩২টি মামলা তদন্তাধীন। 
এপিবিএন জানায়, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত রোহিঙ্গা শিবির থেকে এক লাখ ১৯ হাজার ৫৩০ পিস ইয়াবা, ৭৯০ গ্রাম গাঁজা, ৯ লিটার দেশী মদ ও ১২ ক্যান বিয়ার উদ্ধার করা হয়েছে। ৫৪ জনের বিরুদ্ধে ৪৪টি মামলা করা হয়েছে। 
এসআরবি জানায়, মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত তারা রোহিঙ্গা শিবিরে ৫৩টি অভিযান চালিয়েছে। এসব অভিযানে দু’টি শটগান, একটি বিদেশী পিস্তল, ৩৫৪ রাউন্ড গুলি, ৬৫ হাজার ৫২২ পিস ইয়াবা ও পাঁচ কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় পাচারের শিকার পাঁচ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ৬৬ জনকে। 
আরআরআরসি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে রোহিঙ্গা শিবিরে ২৫৭টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়েছে। এসব আদালতে ৩৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১২২টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে।

Advertisement