
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর ও তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে ইয়েমেনের হাউছিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে দেশটির রিয়াদ ও দাম্মামের প্রধান বিমানবন্দরগুলোর কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে, যা বৈশ্বিক বিমান চলাচল এবং জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের বিঘœ ঘটিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানসহ বেশ কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের জন্য নতুন করে ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। ফলে রিয়াদের আকাশপথ কার্যত ফাঁকা হয়ে পড়েছে। গত শনিবার দেশটির প্রধান বিমানবন্দরে ভয়াবহ প্রাণহানির পর বিমানবন্দরটির কার্যক্রম বন্ধের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে বড় ধরনের অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে। তাছাড়া হাউছিরা সৌদি আরবের আকাশসীমা ও বিমানবন্দর ব্যবহার না করার জন্য এয়ারলাইনস, শিপিং কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তাদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, সৌদি আকাশসীমা বা বিমানবন্দর ব্যবহার করলে তারা হাউছি বাহিনীর সামরিক হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবেন।
গত চার দিনে অন্তত তিনবার রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা চালানো হয়েছে, যাতে শনি ও রোববার মিলিয়ে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। এসব হামলায় এ পর্যন্ত ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। প্রথম হামলার পর থেকেই রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধ রয়েছে। সৌদি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রোববারেও বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় আরো বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এই নজিরবিহীন নিরাপত্তা সঙ্কটের কারণে ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন প্রধান বিমান সংস্থাও সৌদি আরবের সাথে তাদের ফ্লাইট পরিচালনা স্থগিত করেছে। ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিমান সংস্থা লুফথানসা গ্রুপ আগামী ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদের সব ফ্লাইট বাতিল করেছে। এয়ার ফ্রান্স-কেএলএম চলতি মাসের শেষ পর্যন্ত রিয়াদগামী ফ্লাইটগুলোর স্থগিতাদেশ বাড়িয়েছে। আবুধাবির ইতিহাদ এয়ারওয়েজ সোমবার ও মঙ্গলবারের রিয়াদ, জেদ্দা এবং দাম্মামগামী প্রায় ২০টি ফ্লাইট বাতিল করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল অ্যাভিয়েশন প্রশাসন (এফএএ) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন অ্যাভিয়েশন সেফটি এজেন্সি (ইএএসএ) সৌদি আরব বা এর আকাশসীমা ব্যবহার করার ক্ষেত্রে মার্কিন ও ইউরোপীয় এয়ারলাইনসগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কবার্তা জারি করেছে। রয়টার্সের খবরে বলা হয়, এই হামলার ফলে সৌদি আরবের অর্থনীতিতেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চলতি বছরে দেশটির জিডিপি ৩ দশমিক ৬ শতাংশ সঙ্কুচিত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।
গতকাল সোমবার লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের খবরে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক বার্তায় সারি এয়ারলাইনস, জাহাজীকরণ প্রতিষ্ঠান, সেসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, সৌদি আরবে কাজ করতে ইচ্ছুক কর্মী এবং পর্যটকদের উদ্দেশে এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
সারি দাবি করেছেন, গত শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দরে হাউছিরা কয়েকটি সামরিক অভিযান চালিয়েছে। এতে বিমানবন্দরের ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং এটি এখন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। রোববার টেলিভিশনে দেয়া বক্তব্যে তিনি এই হামলার দায় স্বীকার করেন। একইসাথে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের দাম্মাম বিমানবন্দর এবং আরামকোর দু’টি স্থাপনায়ও হামলার দাবি করেন তিনি।
অন্য দিকে হাউছিদের টেলিভিশন চ্যানেল আল মাসিরাহ জানিয়েছে, ইয়েমেনের সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হামলা চালিয়েছে। এ বিষয়ে সৌদি জোটের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এর আগে রোববারও সারি একই ধরনের হুমকি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও আকাশসীমা হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং এগুলো তাদের সামরিক অভিযানের লক্ষ্যবস্তু। তবে মক্কা ও মদিনাকে এই হুমকির বাইরে রাখার কথা তিনি নিশ্চিত করেন। সে সময় ওই দুই পবিত্র শহর ছাড়া অন্যান্য স্থানে যাতায়াত না করার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। এবারের বার্তায় সৌদি আকাশসীমা পুরোপুরি এড়িয়ে চলার কথা বলা হয়েছে।
হাউছিদের এই হুমকির প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, রিয়াদের আকাশ অনেকটাই ফাঁকা। উড়োজাহাজ চলাচল বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার নির্ধারিত ফ্লাইটের প্রায় ৬০ শতাংশ বাতিল হওয়ার আশঙ্কা ছিল। রোববার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নির্ধারিত ফ্লাইটের ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশ বাতিল করা হয়। সোমবার দেশজুড়ে নির্ধারিত ফ্লাইটের এক-তৃতীয়াংশের বেশি চলাচল করেনি। ফ্লাইটরাডার২৪-এর হিসাবে রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রায় ৭৮ শতাংশ ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। রোববারের হামলায় একজন নিহত এবং অন্তত এক ডজন মানুষ আহত হওয়ার পর বিমানবন্দরটি বন্ধ রাখা হয়। এর আগের দিন হুতিদের দাবি করা আরেকটি হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন বলে জানা গেছে।
এসব ঘটনার জেরে সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিঘœ ঘটেছে। ইউরোপ ও এশিয়ার কয়েকটি এয়ারলাইনস ইতোমধ্যে ফ্লাইট স্থগিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) দেশটির এয়ারলাইনসগুলোকে সৌদি আরবে যাওয়া বা আকাশসীমার ওপর দিয়ে উড়ানের সময় সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে। এয়ার ফ্রান্স-কেএলএম সৌদি রাজধানীতে যাওয়া-আসার ফ্লাইট স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের মেয়াদ বাড়িয়ে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত করেছে।
গত শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চালানো ভয়াবহ হামলায় বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, যা এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে সবচেয়ে মারাত্মক হামলা বলে বিবেচিত হচ্ছে। এর পরের দিন আবার একই বিমানবন্দর লক্ষ্য করে আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন বিমানবন্দরে অন্তত পাঁচটি হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এসব হামলার জেরে রিয়াদের কিং খালিদ এবং দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে নজিরবিহীন অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে জেদ্দার কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শতাধিক ফ্লাইট বাতিল ও বহু ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে মার্কিন দূতাবাস ও অন্যান্য দেশের কূটনৈতিক মিশনগুলো নাগরিকদের সৌদি ভ্রমণ পুনর্বিবেচনা কিংবা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া দেশত্যাগের পরামর্শ দিয়েছে। এই সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে ইয়েমেনের বিভিন্ন রণাঙ্গনে সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনী ও হাউছিদের মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে। দেশটির তাইজ ও সানার বিভিন্ন এলাকায় সরকারি বাহিনীর বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। হাউছিদের নিয়ন্ত্রণাধীন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, সঙ্ঘাত তীব্র হওয়ার পর থেকে ইয়েমেনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে রিয়াদে চলমান একটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সম্মেলন থেকে বড় বড় তেল কোম্পানিগুলো নিজেদের প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনার পর ব্রিটেনের বহুজাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানি বিপি ঘোষণা করেছে যে, তারা সৌদি আরবে ওয়ার্ল্ড পেট্রোলিয়াম কাউন্সিলের এনার্জি কংগ্রেসে অংশগ্রহণ থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। ওই হামলার পরেও সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় ঘোষণা করেছে যে, রিয়াদে ১১ থেকে ১৫ই অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠেয় ওয়ার্ল্ড পেট্রোলিয়াম কাউন্সিলের আন্তর্জাতিক জ্বালানি সম্মেলন নির্ধারিত সময় অনুযায়ীই শুরু হয়েছে। এটি শহরের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে একটি কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এর আগে বিপির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেগ ও’নিলকে সম্মেলনের বক্তা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। তবে, বিপির একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন যে, কোম্পানিটি এ ইভেন্টে যোগ দেয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিল, কিন্তু যাতায়াত বা ভ্রমণের ব্যাঘাতের কারণে তারা সরাসরি উপস্থিত হতে পারেনি।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক খবরে বিশ্বস্ত সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে যে, সম্মেলনে যোগ দেয়ার কথা থাকা এক্সনমোবিল, টোটাল এনার্জিজ এবং শেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার্তারাও অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। শেল এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি এবং রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে টোটাল এনার্জিজ ও এক্সনমোবিল তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেয়নি।
এ দিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, তারা খামিস মুশাইত শহরের দিকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করেছে। সৌদি আরবের ওপর ধারাবাহিক এই হামলার প্রেক্ষাপটে তেহরানের সাথেও কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু হয়েছে। সৌদি বিমানবন্দরে হামলার পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল-সৌদের সাথে ফোনালাপ করেছেন। ফোনালাপে আরাকচি জানান, সামরিক পন্থায় সঙ্ঘটের সমাধান সম্ভব নয় এবং ইয়েমেনের সাথে সংলাপ শুরু করতে তেহরান সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত। তবে এই মধ্যস্থতার প্রস্তাব নিয়ে রিয়াদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। আঞ্চলিক এই উত্তেজনার মধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান আল সৌদ। তিনি জানিয়েছেন, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও অবকাঠামো গুরুতর পরীক্ষার মুখে পড়েছে। তবে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করে বিশ্ববাজারে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখতে দেশটির পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন এবং লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের বিকল্প পথ কার্যকর রয়েছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেছেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








