৩ মাসে বিদেশী ঋণ ৪.০৫ বিলিয়ন বেড়ে ১১৫ বিলিয়ন ডলার

 বিশেষ সংবাদদাতা

Advertisement

বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি বেড়ে ১১৪.৯৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিক, অর্থাৎ এপ্রিল-জুন সময়ে আগের প্রান্তিকের তুলনায় এ ঋণ বেড়েছে ৩.৬৫ শতাংশ। ঋণের এই বৃদ্ধিতে প্রধান ভূমিকা রেখেছে সরকারি খাত। অন্য দিকে বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ কিছুটা কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুন শেষে সরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫.১০ বিলিয়ন ডলারে। মার্চ শেষে এ ঋণ ছিল ৯০.৯১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ তিন মাসে সরকারি খাতের ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪.১৯ বিলিয়ন ডলার বা ৪১৯ কোটি ডলার।
বিপরীতে, বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ আগের প্রান্তিকের তুলনায় ১৪ কোটি ডলার কমে ১৯.৮৯ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। স্বল্পমেয়াদি ঋণ, ক্রেতাঋণ (বায়ার্স ক্রেডিট) এবং বাণিজ্যঋণ কমে যাওয়াকে এ হ্রাসের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ ও বৈদেশিক ঋণ (ঋড়ৎবরমহ উরৎবপঃ ওহাবংঃসবহঃ ধহফ ঊীঃবৎহধষ উবনঃ) শীর্ষক প্রতিবেদন এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে বৈদেশিক ঋণের খাতভিত্তিক চিত্র ও প্রবণতা তুলে ধরা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন শেষে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ ছিল ১১৩.২০ বিলিয়ন ডলার। একই বছরের ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১৩.৫২ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ঋণের স্থিতি কমে ১১০.৯৩ বিলিয়ন ডলারে নেমেছিল। এরপর জুনে তা আবার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সরকারি ঋণ বৃদ্ধির কারণ
গত বছরের জুন শেষে সরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ ছিল ৯৩.৭৪ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের মার্চ শেষে তা কমে ৯০.৯১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। বিদেশী সহায়তাপুষ্ট উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে ঋণের অর্থ ছাড় ও ব্যবহার কম থাকাকে আগের সময়ে ঋণের স্থিতি কমার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে সরকারি ঋণ আবার বেড়েছে। বহু পক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা পাওয়ার বিষয়টি এ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে পাওয়া এ ধরনের অর্থ সরকারের বাজেটের অর্থায়ন চাহিদা মেটাতে সহায়তা করে।
মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতজনিত অর্থনৈতিক চাপ মোকাবেলায় বাজেট সহায়তার গুরুত্ব থাকলেও, ঋণ হিসেবে পাওয়া অর্থের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়ও বিবেচনায় রাখতে হবে। ঋণের অর্থ কী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা থেকে কী পরিমাণ অর্থনৈতিক সুফল আসছে এবং ভবিষ্যতে তা পরিশোধের সক্ষমতা কতটা বাড়ছে- এসব বিষয় ঋণ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
মোট ঋণের বড় অংশ সরকারি খাতে
জুন শেষে সরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ মোট ঋণের প্রায় ৮২.৭ শতাংশ। বেসরকারি খাতের অংশ প্রায় ১৭.৩ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের বৈদেশিক ঋণের প্রধান দায় এখন সরকারি খাতের ওপর।
সরকারি খাতের ঋণের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য সরকারি সংস্থার দায়ও রয়েছে। ফলে সরকারি বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে শুধু বাজেটের সরাসরি ঋণ নয়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায় এবং রাষ্ট্রের ওপর সম্ভাব্য আর্থিক ঝুঁকিও বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।
বেসরকারি খাতের ঋণ কমে যাওয়াকে এককভাবে ইতিবাচক বা নেতিবাচক বলা যায় না। এক দিকে স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ কমলে তাৎক্ষণিক পরিশোধের চাপ কমতে পারে। অন্য দিকে নতুন ঋণ গ্রহণ কমার পেছনে ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্থরতা, বিনিয়োগের দুর্বলতা কিংবা বৈদেশিক অর্থায়ন পাওয়ার সীমাবদ্ধতাও থাকতে পারে। তাই ঋণের স্থিতির পাশাপাশি নতুন ঋণ গ্রহণ, পরিশোধ এবং বিনিয়োগের প্রবণতাও বিশ্লেষণ করা জরুরি।
ঋণ বাড়লেই ঝুঁকি বাড়ে- এমন নয়
বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ অর্থনীতির ঝুঁকি নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও এটিই একমাত্র সূচক নয়। ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, রফতানি সক্ষমতা বৃদ্ধি কিংবা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী প্রকল্পে ব্যবহৃত হলে তা ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। বিপরীতে, ঋণনির্ভর ব্যয় থেকে পর্যাপ্ত আয় বা অর্থনৈতিক সুফল না এলে ভবিষ্যৎ বাজেটে সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় তিনটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রথমত. ঋণের অর্থ ছাড় ও প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত. বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতের সক্ষমতা বাড়ানো। তৃতীয়ত. ঋণ পরিশোধের সময়সূচি, সুদের হার ও মুদ্রার ধরন বিবেচনায় নিয়ে মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন করা।
এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রফতানি আয়, প্রবাসী আয়, আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণের সুদ-আসল পরিশোধের পরিমাণ একসাথে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কারণ ডলারে ঋণের দায় পরিশোধ করতে হয়; কিন্তু দেশের রাজস্ব আয়ের বড় অংশ আসে টাকায়। টাকার অবমূল্যায়ন হলে একই পরিমাণ ডলার পরিশোধে বেশি টাকা ব্যয় করতে হয়।
সামনে যে প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ প্রায় ১১৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর প্রেক্ষাপটে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, নতুন ঋণের ব্যবহার এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এখন গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়। শুধু ঋণের মোট স্থিতি বাড়ছে না কমছে, তা দিয়ে অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থার পূর্ণ মূল্যায়ন সম্ভব নয়।
বরং মোট ঋণের কত অংশ স্বল্পমেয়াদি, কত অংশ দীর্ঘমেয়াদি, কোন খাতে ঋণ নেয়া হচ্ছে, আগামী কয়েক বছরে কত অর্থ সুদ ও আসল হিসেবে পরিশোধ করতে হবে এবং ঋণের অর্থ থেকে কী পরিমাণ আয় তৈরি হচ্ছে- এসব তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকি নিরূপণ করা প্রয়োজন।
সরকারি খাতে এক প্রান্তিকে ৪১৯ কোটি ডলার ঋণ বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পভিত্তিক ঋণ ব্যবহারের স্বচ্ছতা, ব্যয়-সাশ্রয়ী বাস্তবায়ন এবং অর্থনৈতিক সুফল মূল্যায়ন আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সাথে বেসরকারি খাতে ঋণ কমার পেছনে বিনিয়োগের দুর্বলতা কাজ করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। বৈদেশিক ঋণ উন্নয়নের অর্থায়ন জোগাতে পারে, কিন্তু ঋণ ব্যবস্থাপনার সাফল্য নির্ভর করে সেই অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তা পরিশোধের জন্য অর্থনীতি কতটা সক্ষমতা অর্জন করছে তার ওপর।