
বোরহান উদ্দিন রব্বানী শরীয়তপুর
একটি পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহারের পর মুহূর্তেই যত্রতত্র ফেলে দেওয়া হচ্ছে। অসচেতনভাবে ফেলে দেয়া এসব পলিথিন ও প্লাস্টিক অণুজীবের প্রভাবে না পচে ধীরে ধীরে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হচ্ছে। ছড়িয়ে পড়ছে জল ও স্থলে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ, তীব্র হচ্ছে জলাবদ্ধতা এবং ক্ষুণœ হচ্ছে মাটির গুণাগুণ। পলিথিন যেন অক্টোপাসের মতো পরিবেশের সর্বস্তরে জড়িয়ে অঞ্চলটির জীববৈচিত্র্যকে মারাত্মক হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পরিবেশবাদীরা সতর্ক করে বলছেন, এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
শরীয়তপুরের বসতবাড়ি, হাটবাজার ও বিপণিবিতান থেকে শুরু করে খাল-বিল, পুকুর ও নদীর তীরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য। বর্ষায় এসব বর্জ্য ভেসে গিয়ে জমা হচ্ছে নালা-নর্দমায়। এতে ড্রেনেজ ব্যবস্থা অবরুদ্ধ হয়ে তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি। কৃষিনির্ভর এই জেলায় দীর্ঘদিন মাটিতে পড়ে থাকা পলিথিন আলো-বাতাস ও পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করায় মাটির জৈবিক সক্রিয়তা নষ্ট হচ্ছে।
প্লাস্টিক বর্জ্য নদী ও জলাশয়ে গিয়ে জমায় জলজ পরিবেশও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত। প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হওয়ায় নদীর ঐতিহ্যের প্রধান নিয়ামক ইলিশসহ বিভিন্ন দেশীয় মাছের অস্তিত্ব ঝুঁকিতে পড়েছে।
এই সঙ্কট নিরসনে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে মাঠে নেমেছে তারুণ্যের সংসদ শরীয়তপুর। তারা পরিত্যক্ত প্লাস্টিক সংগ্রহের পাশাপাশি প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে। উদ্যোগটির উদ্দেশ্য- ব্যক্তি ও পরিবার পর্যায়ে প্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কমানো এবং নির্দিষ্ট স্থানে তা সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করা।
উদীচী শরীয়তপুরের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম রিপন মনে করেন, সচেতনতার পাশাপাশি কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। অন্য দিকে জাতীয় সাহিত্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট মির্জা হজরত সাইজী বলেন, পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব কেবল সরকারের নয়; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের মানুষকে নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে।
মাটির স্বাস্থ্য ও কৃষির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো: জাহীদুল আলম। তিনি জানান, কৃষিজমিতে পলিথিন জমলে ফসলের ফলনে দীর্ঘমেয়াদি ধস নামবে। তাই কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ নুরুজ্জামান সিপন বলেন, শরীয়তপুরের নদীগুলো স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান ভিত্তি। নদীতে প্লাস্টিক জমে পানি দূষিত হওয়ায় মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। যার প্রভাব ইতোমধ্যে ইলিশের ওপর দৃশ্যমান। তিনি এই আন্দোলনে শিশু ও তরুণদের সম্পৃক্ত করার জোর দাবি জানান।
পরিবেশবিদদের মতে, শরীয়তপুরে পলিথিনবিরোধী এই আন্দোলন কেবল শহর পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয় নয়; এর সাথে জড়িয়ে আছে জলাবদ্ধতা নিরসন, মাটির উর্বরতা রক্ষা, জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং মাইক্রোপ্লাস্টিকমুক্ত নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার তাগিদ। নদী বাঁচলে মাছ বাঁচবে, মাটি সুস্থ থাকলে টিকবে কৃষি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








