গ্যাসের টানাটানিতে কমছে শিল্পের গতি

শাহ আলম নূর

Advertisement

গ্যাসের টানাটানিতে গতি হারাচ্ছে দেশের শিল্পকারখানা। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না মেলায় উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারছেন না উদ্যোক্তারা। কোথাও কমাতে হচ্ছে উৎপাদন, কোথাও বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে কারখানা সচল রাখতে গিয়ে কয়েক গুণ বাড়ছে ব্যয়। এতে এক দিকে ব্যবসার মুনাফা সঙ্কুুচিত হচ্ছে, অন্য দিকে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা ও কর্মসংস্থান নিয়ে সৃষ্টি হচ্ছে অনিশ্চয়তা। উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সরবরাহ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে রফতানি আদেশ পূরণ নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ। শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা জ্বালানি সরবরাহের এ অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারখানা আছে, শ্রমিক আছে, ক্রয়াদেশও রয়েছে-  কিন্তু চাহিদামতো গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতে পারছেন না শিল্প উদ্যোক্তারা। দিনের কোন সময়ে কতটুকু গ্যাস পাওয়া যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে কোথাও যন্ত্রপাতির ব্যবহার কমাতে হচ্ছে, কোথাও বিকল্প জ্বালানি কিনে উৎপাদন ধরে রাখার চেষ্টা চলছে। এতে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, কমছে মুনাফার সুযোগ। সঙ্কট দীর্ঘায়িত হলে এর চাপ শুধু কারখানার আয়-ব্যয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না; নতুন বিনিয়োগ, শ্রমিকদের আয় এবং রফতানি বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তারা বলছেন, শিল্প খাতের জন্য গ্যাস এখন কেবল জ্বালানি সরবরাহের বিষয় নয়, বরং উৎপাদন পরিকল্পনা ও ব্যবসায়িক ঝুঁকির বড় একটি উপাদান। একটি কারখানা দৈনিক কত ঘণ্টা চালু থাকবে, কত পণ্য তৈরি করতে পারবে এবং নির্ধারিত সময়ে ক্রেতার কাছে চালান পাঠাতে পারবে কিনা- এসব সিদ্ধান্ত অনেকাংশে নির্ভর করছে গ্যাসের প্রাপ্যতা ও চাপের ওপর। বিশেষ করে বস্ত্র, সুতা, ডাইং, সিরামিক ও ইস্পাতের মতো শিল্পে জ্বালানির ঘাটতি উৎপাদনের একাধিক ধাপে প্রভাব ফেলতে পারে। কোনো একটি ধাপে গতি কমলে পরবর্তী ধাপেও কাজ জমে যায়।
রাজধানী ঢাকাসহ সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের স্বল্প চাপ নিয়ে উদ্যোক্তাদের অভিযোগ নতুন নয়। অনেক কারখানার উৎপাদনপ্রক্রিয়া সচল রাখতে ১০ থেকে ১৫ পিএসআই চাপ প্রয়োজন হলেও সঙ্কটের সময়ে কোথাও চাপ ২ থেকে ৩ পিএসআইয়ে নেমে আসে। এ অবস্থায় বয়লার, ডাইং ইউনিট ও তাপ-নির্ভর যন্ত্রপাতি কাক্সিক্ষত গতিতে চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। গ্যাসের চাপ কিছু সময়ের জন্য বাড়লেও তা সারা দিন স্থিতিশীল না থাকলে উৎপাদন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায় না।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান নয়া দিগন্তকে বলেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে উৎপাদন পরিকল্পনা ও ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে। বিগত সেপ্টেম্বর মাসে জ্বালানি পরিস্থিতির টেকসই সমাধানে গ্যাস সরবরাহ ও এলএনজি সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়নে গুরুত্ব দেয় সরকার। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান হচ্ছে না। শিল্পের উৎপাদন সচল রাখতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সমস্যার ব্যাপ্তি বোঝার জন্য শিল্পাঞ্চলভিত্তিক চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর মাসে তিতাস গ্যাসের দৈনিক প্রাপ্তি ছিল গড়ে ৮৮৩ দশমিক ২০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে, সরবরাহ পাওয়ার কথা ছিল ৯৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ দৈনিক গড়ে ৯৬ দশমিক ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট কম গ্যাস পাওয়া যায়। এই ব্যবধানের অর্থ, বরাদ্দ বা প্রত্যাশিত সরবরাহ থাকলেও বাস্তবে শিল্পাঞ্চলে প্রয়োজনীয় গ্যাস পৌঁছানো নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তবে ওই হিসাব একটি নির্দিষ্ট সময়ের; বর্তমান দৈনিক ঘাটতি নির্ধারণে নতুন তথ্য প্রয়োজন।
তথ্যে দেখা যায়, গাজীপুর জেলায় দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট, বিপরীতে সরবরাহ ছিল প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সে হিসাবে ঘাটতি দাঁড়ায় ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট, যা চাহিদার প্রায় ৪৫ শতাংশ। একই প্রতিবেদনে গ্যাস সঙ্কটের কারণে ওই সময় জেলার প্রায় ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ কারখানা তিন দিনের জন্য বন্ধ ছিল। এটি নির্দিষ্ট সময় ও এলাকার হিসাব, সারা দেশের বর্তমান কারখানা বন্ধের পরিসংখ্যান নয়।
এ দিকে রফতানির ক্ষেত্রেও ঝুঁঁকি সৃষ্টি হচ্ছে উৎপাদন ব্যবস্থার পারস্পরিক নির্ভরতার কারণে। সুতা উৎপাদন, কাপড় তৈরি, ডাইং ও পোশাক প্রস্তুতের প্রতিটি ধাপের সাথে পরবর্তী ধাপের সময়সূচি যুক্ত। একটি পর্যায়ে উৎপাদন পিছিয়ে গেলে পুরো সরবরাহশৃঙ্খলে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। রফতনিকারককে তখন অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় দিয়ে অর্ডার শেষের চেষ্টা করতে হয়। নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠানো সম্ভব না হলে ক্রেতার সাথে সম্পর্ক, ভবিষ্যৎ অর্ডার এবং বাজারে নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা থাকে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, শিল্পাঞ্চলভেদে চাপের পার্থক্য এবং বিভিন্ন খাতে গ্যাস বণ্টনের সিদ্ধান্ত- এসব বিষয় পর্যালোচনা না করলে শুধু আমদানি বাড়িয়ে শিল্পের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। তবে সঙ্কটের কোন কারণটি কতটা দায়ী, তা নির্ধারণে পেট্রোবাংলা ও বিতরণ সংস্থার তথ্যের সাথে স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নও প্রয়োজন। এ জন্য পেট্রোবাংলা ও গ্যাস সরবরাহ কোম্পানিগুলোর উচিত শিল্পাঞ্চলভিত্তিক দৈনিক চাহিদা, বরাদ্দ, প্রকৃত সরবরাহ ও গ্যাসের চাপের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা। পাশাপাশি কতটি কারখানা উৎপাদন কমিয়েছে, কতটি সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে, বিকল্প জ্বালানিতে ব্যয় কতটা বেড়েছে এবং শ্রমিকদের কর্মঘণ্টায় কী পরিবর্তন এসেছে- এসব বিষয়ে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর কাছ থেকে সমন্বিত তথ্য নেয়া প্রয়োজন। 
বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল নয়া দিগন্তকে বলেন, জ্বালানি সঙ্কটে গত মাসে প্রায় ৬০০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। তবে এসব কারখানার কতটি শুধু গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কটে বন্ধ ছিল, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব দেয়া কঠিন। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ আরো বাড়তে পারে।
এ দিকে পেট্রোবাংলা চলতি অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে ১৯টি এলএনজি কার্গো আসার কথা জানিয়ে এ সময়ে এলএনজি সরবরাহে ঘাটতির আশঙ্কা নেই বলে উল্লেখ করেছে।