
কোথাও ফলনের উল্লম্ফন, কোথাও উৎপাদনে ভাটা। আমন ধান, পেঁয়াজ ও সয়াবিনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও আলু, গম, আখ ও কয়েকটি ডালশস্যের উৎপাদন কমেছে। বিশেষ করে পেঁয়াজ ও সয়াবিনে উৎপাদন বৃদ্ধির বিপরীতে আলুতে পতন দেশের কৃষি উৎপাদনের পরিবর্তিত চিত্র সামনে এনেছে। একই সাথে কৃষিশ্রমিকের মজুরি বাড়লেও নারী ও পুরুষের পারিশ্রমিকের ব্যবধান রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কৃষি উইংয়ের প্রকাশিত হালনাগাদ এপ্রিল-জুন ২০২৬-এর ফসল উৎপাদন প্রাক্কলনে ২০২৪-২৫ সালের তুলনায় ২০২৫-২৬ সালে ফসলভেদে এই পরিবর্তন দেখা গেছে। বেড়েছে আমনের আবাদি জমির পরিমাণ। আর এক বছরে আলুর আবাদি জমির পরিমাণ ৬.০৪ শতাংশ।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন তথ্যানুযায়ী, আমন ধানের উৎপাদন ৫.১১ শতাংশ বেড়ে এক কোটি ৭৩ লাখ ৫৮ হাজার ৯৮০ টনে দাঁড়িয়েছে। আগের বছর উৎপাদন ছিল এক কোটি ৬৫ লাখ ১৪ হাজার ৪৫০ টন। আমনের আবাদি জমিও বেড়েছে ২.১৯ শতাংশ। শীতকালীন ভুট্টার উৎপাদন ৩.৬০ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৫০ লাখ ৪৮ হাজার ৩৪৭ টন। তবে গমের উৎপাদন ১.১৮ শতাংশ কমে ১০ লাখ ২৮ হাজার ৭৮১ টনে নেমেছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা আলুতে। এক বছরে আলুর আবাদি জমি কমেছে ৬.০৪ শতাংশ।
উৎপাদনও ২.৬১ শতাংশ কমে এক কোটি ১২ লাখ ৭২ হাজার ১৪ টনে দাঁড়িয়েছে। আগের বছর উৎপাদন ছিল এক কোটি ১৫ লাখ ৭৩ হাজার ৬১৫ টন। বিপরীতে বেগুন, শিম, টমেটো, সজনা ও মিষ্টি আলুর উৎপাদন বেড়েছে।
মসলা জাতীয় ফসলের মধ্যে পেঁয়াজে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। উৎপাদন ১৮.৫৭ শতাংশ বেড়ে ৩৮ লাখ ১৯ হাজার ৫৩০ টনে পৌঁছেছে। আবাদি জমি বেড়েছে ৬.৩৮ শতাংশ। রসুনের উৎপাদন ৭.০৩ শতাংশ এবং শীতকালীন মরিচের ৯.৭৯ শতাংশ বেড়েছে। তেলবীজের মধ্যে সয়াবিনের উৎপাদন বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি। এক বছরে উৎপাদন ২৫.৫৪ শতাংশ বেড়ে এক লাখ ৩৬ হাজার ১৮৩ টনে দাঁড়িয়েছে। আবাদি জমি বেড়েছে ১৯.৮৪ শতাংশ। চায়ের উৎপাদনও ১২.৯৯ শতাংশ বেড়ে এক লাখ তিন হাজার ৭৮ টনে পৌঁছেছে।
ফল উৎপাদনেও ইতিবাচক প্রবণতা রয়েছে। কলার উৎপাদন ১৪.৩৮ শতাংশ বেড়েছে, যদিও আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় অপরিবর্তিত। তরমুজের উৎপাদন বেড়েছে ৫.১৮ শতাংশ, পেঁপের ৯.৩৩ শতাংশ এবং লিচুর ৬.৪৩ শতাংশ। স্ট্রবেরির উৎপাদন ৪৩৫ টন থেকে বেড়ে এক হাজার ৫০৬ টন হয়েছে। শীতকালীন পশুখাদ্যের উৎপাদনও বেড়েছে ৩৭.১৩ শতাংশ। তবে ডালশস্যে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। মসুরের উৎপাদন সামান্য বেড়েছে, ফেলনের বেড়েছে ৯.৮৮ শতাংশ। বিপরীতে মুগের উৎপাদন কমেছে ২.৩৮ শতাংশ এবং ছোলার ৪.৯৪ শতাংশ। আখের উৎপাদন কমেছে ০.৭১ শতাংশ। শীতকালীন তুলার উৎপাদনও কমেছে ৬.৬৫ শতাংশ।
কৃষি শ্রমবাবাজারে বৈষম্য : কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি শ্রমবাজারেও বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে বিবিএসের প্রতিবেদনে। খাবার ছাড়া দৈনিক কৃষিমজুরি মার্চে পুরুষের ৬২৮ টাকা ও নারীর ৪৬১ টাকা ছিল। মে মাসে তা বেড়ে যথাক্রমে ৭২০ ও ৫১০ টাকা হয়। অর্থাৎ পুরুষের মজুরি বেড়েছে ১৪.৬৫ শতাংশ, নারীর ১০.৬৩ শতাংশ। জুনে মজুরি কমে পুরুষের ৬৪৮ এবং নারীর ৪৭৮ টাকায় দাঁড়ায়। চার মাসের তথ্যেই নারী কৃষিশ্রমিকের মজুরি পুরুষের তুলনায় প্রায় ৭১ থেকে ৭৪ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।
বিবিএস বলছে : বাংলাদেশ মূলত কৃষিপ্রধান দেশ। উর্বর জমি ও অনুকূল জলবায়ুর কারণে এখানে প্রচুর ফসল উৎপাদিত হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষি খাত দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রায় ১০.৯৪ শতাংশ অবদান রেখেছে। শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুসারে, দেশের কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪৪.৬৮ শতাংশ কৃষিকাজে নিয়োজিত।
এ দিকে সব মিলিয়ে আমন, পেঁয়াজ ও সয়াবিনে উৎপাদন বৃদ্ধি কৃষিতে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও আলু ও গমের উৎপাদন হ্রাস নতুন করে নজর দেয়ার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








