যুক্তরাষ্ট্রের মানবপাচার প্রতিবেদনে সাত বছর একই অবস্থানে বাংলাদেশ

 নয়া দিগন্ত ডেস্ক

Advertisement

টানা সপ্তম বছরের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানবপাচারবিষয়ক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ টিয়ার-২-এ অবস্থান ধরে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের ট্রাফিকিং ইন পারসনস (টিআইপি) রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার মানবপাচার নির্মূলে ন্যূনতম মানদণ্ড পুরোপুরি পূরণ না করলেও তা পূরণে উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আগের বছরের তুলনায় সামগ্রিক প্রচেষ্টা বেড়েছে বলেই দেশটি টিয়ার-স্টেট ডিপার্টমেন্ট এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
বাংলাদেশের সাথে এই তালিকায় যারা আছে তারা হচ্ছে- আলবেনিয়া, গিনি, মালাউই, সৌদি  আরব অ্যাঙ্গোলা, এসোয়াতিনি, মালয়েশিয়া, সেনেগাল, অ্যান্টিগুয়া ও বার্বুডা, ইথিওপিয়া, মালি, সার্বিয়া, আর্মেনিয়া, গ্যাবন, মাল্টা, সেশেলস আরুবা, গাম্বিয়া, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ, সিয়েরা লিওন, আজারবাইজান, গ্রিস, মৌরিতানিয়া, স্লোভাকিয়া, গুয়াতেমালা, মরিশাস, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ বেলিজ, গিনি-বিসাউ, মেক্সিকো, শ্রীলঙ্কা, বেনিন, ভুটান, মাইক্রোনেশিয়া (ফেডারেটেড স্টেটস), সুইজারল্যান্ড, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, হন্ডুরাস, মলদোভা, তাজিকিস্তান, বতসোয়ানা, হাঙ্গেরি, মন্টিনিগ্রো, তানজানিয়া ব্রুনাই, ভারত, মরক্কো, থাইল্যান্ড বুলগেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মোজাম্বিক, তিমুর-লেস্তে, বুরকিনা ফাসো, ইরাক, নিউজিল্যান্ড, টোগো বুরুন্ডি, আয়ারল্যান্ড, নাইজার, টোঙ্গা কাবো ভার্দে, ইতালি, নাইজেরিয়া, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, ক্যামেরুন, জ্যামাইকা, উত্তর মেসিডোনিয়া, তিউনিসিয়া, কলম্বিয়া, জাপান, ওমান, তুরস্ক, কোস্টারিকা, জর্দান, পাকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আইভরি কোস্ট, কাজাখস্তান, পালাউ, উগান্ডা, ক্রোয়েশিয়া, কেনিয়া, পানামা, ইউক্রেন, কুয়েত, কসোভো, প্যারাগুয়ে, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জিবুতি, লাটভিয়া, পেরু, উরুগুয়ে ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, লেবানন, পর্তুগাল, উজবেকিস্তান, ইকুয়েডর, লেসোথো, কাতার, ভানুয়াতু, মিসর, লাইবেরিয়া, রোমানিয়া, ভিয়েতনাম, এল সালভাদর, মাদাগাস্কার, সেন্ট ভিনসেন্ট ও গ্রেনাডাইনস ও জাম্বিয়া।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মানবপাচার ও অভিবাসীপাচার প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ জারি, যেখানে শোষণের সংজ্ঞায় জোরপূর্বক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অধ্যাদেশের পর এপ্রিলে সংসদে বিল আকারে পাস হয়।
৯৬১টি মামলায় পাঁচ হাজার ২৬৩ জন সন্দেহভাজনকে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে, যা আগের বছরের ৮১১টি মামলার চেয়ে বেশি। এর মধ্যে ১৩৭টি যৌনপাচার, ৪৪৩টি শ্রমপাচার এবং ৩৮১টি অনির্দিষ্ট ধরনের পাচারের মামলা। এক হাজার ৭৯৫ জন সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়েছে, যা আগের বছরের ৪৫২ জনের তুলনায় অনেক বেশি। মানবপাচারের অপরাধ ও ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ নির্দেশিকা হালনাগাদ এবং ডিজিটাল ন্যাশনাল রেফারেল মেকানিজম পাইলট প্রকল্প চালু।
সৌদি আরব, ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সাথে নতুন শ্রমচুক্তি স্বাক্ষর এবং ২৭টি দেশে ৩০টি শ্রম উইং সক্রিয় রাখা।
ঘাটতির জায়গা প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। তার মধ্যে আছে আদালত ৭৬ জন পাচারকারীকে দোষী সাব্যস্ত করেছে, যা ২০২৪ সালে ১০৩ জন এবং ২০২৩ সালে ৪০৭ জন ছিল। অনেক ক্ষেত্রে কারাদণ্ডের পরিবর্তে শুধু জরিমানা দেয়ায় প্রতিরোধ দুর্বল হয়েছে।
এ বছর এক হাজার ১৩৫ জন ভুক্তভোগীকে শনাক্ত করা হয়েছে, আগের বছর যা ছিল এক হাজার ৪৬২ জন। এর মধ্যে ১৯৯ জন যৌনপাচার, ৫১০ জন শ্রমপাচার এবং ৪২৬ জন অনির্দিষ্ট পাচারের শিকার। সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে সেবা পেয়েছে মাত্র ১১১ জন, আগের বছর ছিল ৮৮৩ জন।
অভ্যন্তরীণ পাচার এখনো ব্যাপক। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাচারের মামলা পর্যাপ্ত তদন্ত হয়নি। ক্যাম্পে আইনি সহায়তা ডেস্ক থাকলেও পুলিশের প্রতি অবিশ্বাসের কারণে অনেকে অভিযোগ করতে চান না।
সরকারিভাবে ১৮টি দেশের জন্য ৮৫ হাজার থেকে দুই লাখ ৬২ হাজার টাকা পর্যন্ত বৈধ নিয়োগ ফি নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে শ্রমিকরা এর চেয়ে অনেক বেশি ফি দিচ্ছে। দালালদের মাধ্যমে ছয় থেকে আট মাসের বেতনের সমান ‘সার্ভিস ফি’ নেয়ার সুযোগ আইনে এখনো রয়েছে, যা শ্রমিকদের ঋণগ্রস্ত করে পাচারের ঝুঁকিতে ফেলছে।
পাচারে সরকারি কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে, তবে এ বছর কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে তদন্ত বা সাজা হয়নি। প্রায় ১০০টি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগে মামলা চলমান।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার পাচার প্রতিরোধে আট কোটি ৮৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে, যা আগের বছরের ৬২ কোটি ১৪ লাখ টাকার চেয়ে কম। অন্য দিকে ভুক্তভোগী সেবায় ২১ কোটি ২৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রামীণ, দরিদ্র, বাল্যবিবাহের শিকার, প্রতিবন্ধী, দলিত সম্প্রদায়, মৌসুমি শ্রমিক এবং কক্সবাজারের ৩৪টি ক্যাম্পে থাকা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। বাংলাদেশী পুরুষরা মধ্যপ্রাচ্যে নির্মাণ ও কৃষি খাতে, নারীরা গৃহকর্মী হিসেবে শ্রম ও যৌন শোষণের শিকার হন। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া চাকরির প্রলোভনে তরুণদের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অনলাইন প্রতারণা চক্রে জোরপূর্বক অপরাধমূলক কাজে ব্যবহারের প্রবণতাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।