দেশের ৯২ শতাংশ মানসিক রোগীই চিকিৎসার বাইরে

নিজস্ব প্রতিবেদক

Advertisement

আজ ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। কোনো নির্দিষ্ট কারণে মানসিক সমস্যা হয় না। সাধারণত বংশগত কারণে, মস্তিষ্কের জৈবিক কারণে, সামাজিক ও পরিবেশগত নানা জটিল উপাদানের ঘাটতি কারণে সমস্যাটি হয়ে থাকে। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ১৮.৭ শতাংশ মানুষ মানসিক সমস্যা নিয়ে বেঁচে থাকে। এর মধ্যে ২১.৫ শতাংশ নারী ও ১৫.৭ শতাংশ পুরুষ। কিন্তু সেই তুলনায় বাংলাদেশে এই রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ৩০০ জনের বেশি নেই। ফলে মানসিক রোগীদের ৯২ শতাংশই চিকিৎসার  বাইরে থাকে। সেই হিসাবে প্রতি সাড়ে চার লাখ মানুষ চিকিৎসার জন্য একজন ডাক্তারকেও পায় না। মানসিক চিকিৎসার ব্যাপারেও বাংলাদেশে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। এর জন্য আধুনিক চিকিৎসা থাকলেও এবং আধুনিক চিকিৎসায় সুস্থ হলেও ঝার-ফুঁক, জিন-ভুতের আছর বলে ধরে নিয়ে প্রচলিত অপরিচিকিৎসায় কিছু মানসিক রোগী কখনো সুস্থ হয় না। বাংলাদেশে নেতিবাচক বিভিন্ন চিত্র ও চরিত্র থাকলেও মানসিক চিকিৎসকরা কাজ করে যাচ্ছেন।   
মানসিক চিকিৎসার কারণগুলো সম্বন্ধে চিকিৎসকরা বলেন, পরিবারে বাবা-মা বা রক্ত সম্পর্কিত কারো মানসিক রোগ থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তবে চিকিৎসকরা বলেন, নির্দিষ্ট কিছু জিনের ভিন্নতা বা ত্রুটির কারণে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা প্রভাবিত হতে পারে। এ ছাড়া নিউরো প্রোটিন ও রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়ে মস্কিষ্কের নিউরনগুলোর মধ্যে ভাববিনিময়কারী রাসায়নিক উপাদান বা নিউরোপ্রাটিনের (সেরোটিনিন, ডোপামিন) ভারসাম্য নষ্ট হলে উদ্বেগ, বিষণœতায় ভুগতে পারেন কেউ কেউ। আবার মস্তিষ্কে আঘাত লাগলে মৃগী রোগীদের মানসিক আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয়ের মনোরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা: মো: শামসুল আহসান বলেন, শৈশবের ট্রমা বা নেতিবাচক অভিজ্ঞতাও সুষম মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ছোটবেলায় কেউ যৌন নির্যাতন, শারীরিক মানসিক নির্যাতনের শিকার হলেও বড় হয়ে মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। অন্য দিকে পরিবারের ভাঙন বিশেষ করে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ বা শৈশবে খুব কাছের কাউকে হারিয়ে ফেললেও মানসিক ভারসাম্যহীনতার শিকার হতে পারে। সামাজিক ও পরিবেশগত কারণও মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। যেমন- কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাপ, বড় কোনো দুর্ঘটনা, ঋণগ্রস্ততা, দারিদ্র্য, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মানসিক বিকাশে প্রভাব ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত সহ্য করতে না পেরে মানসিক রোগে পরিণত হয়। অন্য দিকে দীর্ঘমেয়াদি রোগ যেমন ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের সমস্যাজনিত কারণে মানসিকভাবে অনেকেই ভেঙে পড়তে পারে। এ ছাড়া বেশি এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবেও মানসিক রোগী হয়ে যায় অনেকেই। 
ডা. শামসুল আহসান এ বিষয়ে বলেন, সরকার মানসিক রোগকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় নিয়ে যেতে চায়, আমরা সরকারের এ উদ্যোগকে সমর্থন করি। শুধু শহরে নয়, প্রান্তিক এলাকার মানুষও যাতে মানসিক সেবা পায় সেই প্রচেষ্টা চালাতে হবে। মানসিক রোগীদের নানা ধরনের সামাজিক বাধা পেরিয়ে চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। 
এ দিকে দিবসটি উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার ড্রিম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের (ডিআরডিএফ)  উদ্যোগে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসার লক্ষ্যে ‘মনোকথা কেয়ার কার্ড’ চালু করার ঘোষণা দিয়েছে। মানসিক চাপ, উদ্বেগ, একাকিত্ব ও আবেগজনিত নানা সমস্যা মোকাবেলায় নিয়মিত মানসিক যতœ এবং প্রয়োজনের সময় সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরিতে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।  ডিআরডিএফের সভাপতি ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মীর মোহাম্মদ আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র। উপস্থিত ছিলেন জ্ঞান সমিতির (বিপিএ) সভাপতি অধ্যাপক ড. মো: শামসুদ্দিন ইলিয়াস। মনোকথার কার্যক্রম, লক্ষ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন মনোবিজ্ঞানী ও গবেষক তানজীম জামান।