খতিবের বক্তব্য ঘিরে বায়তুল মোকাররমে উত্তেজনা

খালিদ সাইফুল্লাহ

Advertisement

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম- যেখানে প্রতিদিন হাজারো ধর্মপ্রাণ মুসলমান একত্রিত হন এক আল্লাহর ইবাদতে, সেই বায়তুল মোকাররমকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মনস্তাত্ত্বিক উত্তেজনা। খতিব মুফতি আব্দুল মালেকের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়া ও রাজনৈতিক অঙ্গনে যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে, তার জের ধরে উঠেছে নানা প্রশ্ন। খতিব অপসারণ, বিক্ষোভের গুঞ্জন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মুখোমুখি অবস্থান- সব মিলিয়ে জাতীয় মসজিদের পবিত্র পরিবেশ ও সার্বিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কোন দিকে যাচ্ছে? আর এই পুরো ঘটনার পেছনে কার লাভ, আর কার ক্ষতি- তা নিয়ে শুরু হয়েছে বিশ্লেষণ।
বিতর্কের সূচনা : খতিবের বক্তব্য ও অতীত প্রসঙ্গ
বিতর্কের সূত্রপাত বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা আব্দুল মালেকের দু’টি ভিন্ন সময়কালের রাজনৈতিক মতামত ও ধর্মীয় বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। গত জাতীয় নির্বাচনের আগে তিনি একটি বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীকে ভোট না দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সম্প্রতি বিষয়টি আবার নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন তিনি একটি ধর্মীয় আলোচনায় মন্তব্য করেন- কওমি আলেম বা মাদরাসার শিক্ষার্থীরা যদি সবাই মিলে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেয়, তবুও সেই ধারাকে তিনি ‘গোমরাহি’ বা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত বলেই গণ্য করবেন। কওমির সাথে জামায়াতের মধ্যকার ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় চিন্তাগত মতপার্থক্য নতুন কিছু নয়, তবে জাতীয় মসজিদের   খতিবের আসন থেকে এমন মন্তব্য আসার পর রাজনৈতিক ময়দানে তা তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
গুজবের জোয়ার এবং জুমার নামাজের নিরাপত্তা প্রস্তুতি
খতিবের এই বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্যের বন্যা বয়ে যায়। গুঞ্জন ছড়ানো হয় যে, শুক্রবারের জুমার নামাজে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা খতিবের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়ে বায়তুল মোকাররমে হট্টগোল করবে এবং তাকে মিম্বর থেকে অপসারণের চেষ্টা চালাবে।
এই গুজব মুহূর্তের মধ্যেই কওমিপন্থী বিভিন্ন দল ও অন্যান্য রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ে। গুজব প্রতিরোধের নামে এবং খতিবের সুরক্ষার অজুহাতে বিএনপি সমর্থিত জাতীয়তাবাদী ওলামা দল, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ গতকাল মসজিদ প্রাঙ্গণে তাদের উপস্থিতি বহুগুণ বৃদ্ধি করে। এমনকি তারা খতিবের সমর্থনে মিছিল ও পাহারার ব্যবস্থা করে। ঘটনাস্থলে এক থমথমে পরিবেশের সৃষ্টি হলেও বাস্তবে তেমন কোনো বিশৃঙ্খলা ঘটেনি। তবে গুজবের ওপর ভিত্তি করে একটি বড় ধরনের মুখোমুখি অবস্থা তৈরির উপক্রম হয়।
জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান : নীরবতা বনাম গুজব
সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, বায়তুল মোকাররমের খতিব কিংবা তার অপসারণের বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় কোনো নেতার পক্ষ থেকে কখনোই কোনো আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়া হয়নি। তবে সমর্থকদের কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খতিবের বক্তব্যের সমালোচনা করে পোস্ট করেছেন। দলটির পক্ষ থেকে খতিবের বক্তব্যকে তার নিজস্ব মতামত হিসেবে দেখানোর ইঙ্গিত থাকলেও, গুজব রটনাকারীরা জামায়াতকেই এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড় করায়।
জামায়াতের নেতাকর্মী ও শুভাকাক্সক্ষীদের দাবি- দলের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ করতে এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভ্রান্তি ও বিভাজন সৃষ্টি করতেই এই গুজব পরিকল্পিতভাবে রটানো হয়েছে। কোনো ঘোষণা বা কর্মসূচি না থাকা সত্ত্বেও একটি রাজনৈতিক দলকে বায়তুল মোকাররমের মতো সংবেদনশীল স্থানে বিশৃঙ্খলাকারী হিসেবে চিহ্নিত করার এই চেষ্টা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছেন তারা।
কার লাভ, কার ক্ষতি?
বায়তুল মোকাররমকেন্দ্রিক এই সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ গভীর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এতে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের একচেটিয়া লাভ না হলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশ ও ইসলামপন্থী রাজনীতির বড় ধরনের ক্ষতি সাধিত হচ্ছে।
কার লাভ?
ষড়যন্ত্রকারী ও বিভাজন সৃষ্টিকারীদের লাভ : যেসব গোষ্ঠী বাংলাদেশে ইসলামপন্থী শক্তিগুলোর মধ্যে ঐক্য দেখতে চায় না, এই জাতীয় বিতর্ক তাদের জন্য বড় অস্ত্র। কওমি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার পুরনো মতপার্থক্যকে উসকে দিয়ে আলেমসমাজকে বিভক্ত রাখতে পারাটা এক শ্রেণীর রাজনৈতিক চক্রান্তকারীর সবচেয়ে বড় সাফল্য। 
২. মিডিয়া ট্র্যাকিং ও সেনসেশনালিস্টদের লাভ : সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়া খবর ছড়িয়ে ভিউ ও রাজনৈতিক ফায়দা লোটা গোষ্ঠীগুলো এই ধরনের জাতীয় সংবেদনশীল ঘটনা থেকে তাৎক্ষণিক সুবিধা আদায় করে নেয়। 
৩. তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভ : জামায়াতবিরোধী কিছু ইসলামপন্থী দল নিজেদের আলেমসমাজের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরার এবং মাঠ দখলের একটি সুযোগ পেয়েছে।
কার ক্ষতি?
১. জাতীয় মসজিদ ও খতিবের পদের মর্যাদা ক্ষুণœ: বায়তুল মোকাররমের মিম্বর মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক। খতিবের বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কাদা ছোড়াছুড়ি এবং পাহারা বসানোর সংস্কৃতির কারণে জাতীয় মসজিদের সর্বজনীনতা ও মর্যাদা চরমভাবে ক্ষুণœ হচ্ছে। 
২. জামায়াতে ইসলামীর ভাবমর্যাদার সঙ্কট :  কোনো কর্মসূচি বা বক্তব্য না দেয়া সত্ত্বেও গুজবের শিকার হয়ে জামায়াতকে সাধারণ মানুষের কাছে ‘মসজিদে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী’ হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যা তাদের কৌশলগত রাজনৈতিক ভাবমর্যাদার ক্ষতি করে। 
৩. কওমি-আলিয়া ও সাধারণ মুসল্লিদের মানসিক দূরত্ব : সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ যারা বায়তুল মোকাররমে ইবাদত করতে আসেন, তারা রাজনৈতিক দলগুলোর মুখোমুখি অবস্থানের কারণে আতঙ্কের মধ্যে পড়েন। আলেমদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নষ্ট হওয়ায় সাধারণ মানুষের মনে আলেম সমাজ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। 
৪. জাতীয় ঐক্যের ক্ষতি: দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যখন সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চা ও ঐক্যের প্রয়োজন, তখন এ জাতীয় ভিত্তিহীন গুজব দলগুলোর মধ্যে অহেতুক সন্দেহ, বিদ্বেষ ও সঙ্ঘাতের জন্ম দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতামত ও করণীয়
রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, বায়তুল মোকাররম কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের কার্যালয় বা মঞ্চ নয়। এটি লাখো মানুষের ইবাদতখানা। খতিব মাওলানা আব্দুল মালেক একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলেম, তবে জাতীয় মসজিদের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় যেকোনো বক্তব্য দেয়ার ক্ষেত্রে উম্মাহর ঐক্য ও সংবেদনশীলতার কথা মাথায় রাখা আবশ্যক। একইভাবে, রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। কেবল সোশ্যাল মিডিয়ার গুজবে কান দিয়ে রাস্তায় নেমে পড়া বা বিক্ষোভ মিছিল করা কোনো সচেতন রাজনীতির পরিচয় হতে পারে না। জামায়াতে ইসলামীর স্পষ্ট অবস্থান না থাকা সত্ত্বেও তাদের জড়িয়ে যে গুঞ্জন ছড়ানো হলো, তা থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর শিক্ষা নেয়া উচিত- যাতে তারা কোনো তৃতীয় পক্ষের দাবার ঘুঁটি না হয়ে ওঠে।
এ প্রসঙ্গে ইমাম উলামা পরিষদ বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ হোসাইন আকন্দ বলেন, মরহুম আল্লামা উবায়দুল হক কওমি-জামায়াত সবার কাছেই গ্রহণযোগ্য আলেম ছিলেন। আল্লামা মুফতি আব্দুল মালেককে কওমি-জামায়াতে ইসলামীর পরামর্শেই খতিব নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি এখন বিএনপির সমর্থনে ও জামায়াতের বিরোধী কথা বলছেন। জামায়াতে ইসলামী দলীয়ভাবে চুপচাপ থাকলেও তাদের সমর্থকরা লেখালেখির মাধ্যমে সমালোচনা করছেন। কিন্তু জামায়াতবিদ্বেষী কিছু দলীয় লোকজন অহেতুক কৌতুক রঙ্গ সৃষ্টি করছে। যা ইসলামী মুল্যবোধের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণ মনে করি। তিনি বলেন, আলোচনা-সমালোচনা থাকতে পারে। কিন্তু প্রতিবাদ সমাবেশ-সেমিনার করা কাম্য নয়। 
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক মুফতি মহিবব্বুল্লাহ হিল বাকি নয়া দিগন্তকে বলেন, এ ধরনের ঘটনা কারো জন্যই ভালো হবে না। বরং এতে তৃতীয় পক্ষ সুযোগ নিতে পারে।