
জিলানী মিলটন
- বছরের পর বছর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ
- পরিচালনা পর্ষদে একের পর এক পরিবর্তন
- হাজার কোটি টাকার অননুমোদিত লেনদেনের অভিযোগ
- ৬৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১২টি মামলার সিদ্ধান্ত দুদকের
গভীর আর্থিক ও প্রশাসনিক সঙ্কটে পড়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড। বছরের পর বছর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ, মূলধন ঘাটতি, আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা এবং পরিচালনা পর্ষদে একের পর এক পরিবর্তনের কারণে প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ও সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সর্বশেষ গত আগস্টে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ আবারো ভেঙে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সাথে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সাবেক পরিচালক মোস্তাকুর রহমানকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংক উত্তরা ফাইন্যান্সের পর্ষদ পুনর্গঠন করেছিল; কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ একাধিক পরিচালক পদত্যাগ করায় ফের হস্তক্ষেপ করতে হয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে।
সূত্র জানায়, ২০২২ সালের জুন থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত সময়ে উত্তরা ফাইন্যান্সের পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় একাধিক পরিবর্তন হলেও প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা এবং সুশাসন নিয়ে নানা অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, নতুন পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) দায়িত্ব নেয়ার পর নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ, তুলনামূলকভাবে উচ্চ বেতন ও অতিরিক্ত ভাতা-সুবিধা প্রদান, স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্তের প্রবণতা দেখা দেয়। চেয়ারম্যান ও এমডি- উভয় পক্ষের প্রভাব বলয়ে থাকা ব্যক্তিদের নিয়োগ ও সুবিধা দেয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন বিল, প্রশাসনিক ব্যয় ও ব্যবস্থাপনা খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব সিদ্ধান্তের জেরে একপর্যায়ে চেয়ারম্যান ও এমডির মধ্যে ঋণ এবং ক্রেডিট প্রস্তাব অনুমোদনসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ তীব্র হয়। কখনো চেয়ারম্যানের আনা প্রস্তাবে এমডির আপত্তি, আবার কখনো এমডির আনা প্রস্তাবে চেয়ারম্যানের অসম্মতির ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। ফলে তারা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি ছাড়া কোনো সফলতা আনতে পারেনি।
একই সময়ে, দীর্ঘদিন ধরে সততা, দক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করে আসা কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সরাসরি চাকরিচ্যুত করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এসব ক্ষেত্রে যথাযথ ও ন্যায্য প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও পছন্দের লোকজনকে প্রতিষ্ঠানে আনার উদ্দেশ্যে অভিজ্ঞ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমর্যাদার কর্মীদের অপসারণ করা হয়। এতে শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হননি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের পরিবার ও প্রতিষ্ঠান, আর্থিক এবং সামাজিকভাবে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে তাদের স্থলে ব্যবস্থাপনার ও চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হয়।
বছরের পর বছর আর্থিক প্রতিবেদন আটকা : উত্তরা ফাইন্যান্সের সঙ্কটের বড় একটি দিক হলো আর্থিক হিসাব চূড়ান্ত করতে দীর্ঘ বিলম্ব। তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি এখনো ২০২২, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে পারেনি। ফলে বিনিয়োগকারী ও অন্যান্য অংশীজনের কাছে প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ আর্থিক অবস্থার পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট নয়।
মূলধন পর্যাপ্ততায় বড় ঘাটতি : ২০২১ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী নিয়ে নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণেও উঠে এসেছে গুরুতর দুর্বলতার চিত্র। নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের মূলধন পর্যাপ্ততার হার যেখানে নিয়ন্ত্রক নীতিমালা অনুযায়ী ন্যূনতম ১০ শতাংশ থাকার কথা, সেখানে তা ঋণাত্মক ৫ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে যায়। একই সময়ে যোগ্য মূলধনও ঘাটতিতে ছিল।
হাজার কোটি টাকার অননুমোদিত লেনদেনের অভিযোগ : উত্তরা ফাইন্যান্সের আর্থিক সঙ্কটের পেছনে অননুমোদিত লেনদেনের অভিযোগও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ করা বহিরাগত নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে ২০২০ সালের আর্থিক বিবরণী পর্যালোচনায় প্রায় এক হাজার ৩৭৩ কোটি টাকার অননুমোদিত লেনদেন শনাক্ত হওয়ার কথা প্রকাশিত হয়েছে।
নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব লেনদেনে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া, ঋণগ্রহীতার যথাযথ যাচাই এবং লেনদেন অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ, দায়, ঋণ আদায় এবং প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আরো জোরালো হয়েছে।
দুদকের মামলার সিদ্ধান্ত : এর মধ্যেই উত্তরা ফাইন্যান্সের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একাধিক মামলার উদ্যোগ নিয়েছে। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও জামানত ছাড়াই ঋণ দেয়ার মাধ্যমে উত্তরা ফাইন্যান্সের প্রায় ৬৮ কোটি ৮০ লাখ ৪৬ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১২টি মামলা দায়ের করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
দুদকের নথিতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ঋণগুলো অনেক ক্ষেত্রে বোর্ডে উপস্থাপন বা অনুমোদন ছাড়াই দেয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার, অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণার বিষয়ও রয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেও উত্তরা ফাইন্যান্সের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল দুদক।
প্রশাসনিক সঙ্কট আরো গভীর : আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কাঠামোতেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে পর্ষদ গঠন করলেও আগস্টে চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং আরো কয়েকজন পরিচালক পদত্যাগ করেন। পর্ষদে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক আবারো পর্ষদ বিলুপ্ত করে প্রশাসক নিয়োগ দেয়।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে- নতুন প্রশাসকের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক হিসাব স্বচ্ছভাবে পুনর্গঠন, অনিয়মের দায় নির্ধারণ, খেলাপি ও অনাদায়ী অর্থ উদ্ধার এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা কতটা সম্ভব হবে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ : এ ব্যাপারে উত্তরা ফাইন্যান্সের বর্তমান প্রশাসক মো: মোস্তাকুর রহমান বলেন, উত্তরা ফাইন্যান্সের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে- প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাব দ্রুত চূড়ান্ত করা, অনিয়মের প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ, সংশ্লিষ্ট অর্থ উদ্ধারের ব্যবস্থা করা।
তিনি বলেন, এই প্রতিষ্ঠানের শেষ অডিট রিপোর্ট হয়েছে ২০২১ সালে। এর পরে আর কোনো অডিট রিপোর্ট নেই। এটি একটি পাবলিক কোম্পানি। অডিট রিপোর্ট না থাকলে বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারাবে। শেয়ারহোল্ডারদের আস্থা হারাবে। ডিপোজিটররা আস্থা হারাবে। সে ক্ষেত্রে আমাদের মূল দায়িত্ব হচ্ছে অ্যাকাউন্টস ফাইনাল করা। ইতোমধ্যে আমরা কার্যক্রম শুরু করেছি। বেশ কিছু পরিকল্পনা নিয়েছি। আমাদের মূল পরিকল্পনা হচ্ছে, ছয় থেকে সাত মাসের মধ্যে অ্যাকাউন্টস ফাইনাল করা। তিনি বলেন, এই যুগে এসেও এত সুন্দর একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কোন সিবিএস কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার ছিল না। আমরা আসার পর সফটওয়্যারের কাজও শুরু করেছি। এটা শেষ করেই আমরা অডিট ফাইনাল করব বলে আশা করি। প্রাথমিক কাজগুলো সম্পন্ন করার পর আমরা পরবর্তী ধাপে এগোব।
উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের সাবেক পরিচালক মো: মাহবুব আলম বলেন, বিগত ২২ সাল থেকে দুইটি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। একটি বোর্ড তিন বছর মেয়াদ পূর্ণ করেছে। আরেকটি বোর্ড ছয় মাস পূর্ণ করেছে। তিন বছরে দু’টি বোর্ডেই শুধু অ্যাকাউন্টসের আপডেট ছাড়া আর কিছুই হয়নি। কোনো বিজনেস হয়নি। তিনি বলেন, আমরা যদি আবার কাজ করার সুযোগ পাই বা বোর্ড ফিরে পাই আমরা চেষ্টা করব প্রতিষ্ঠানটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে। যেহেতু আমরা ২০১৯ সাল পর্যন্ত পরিচালনা বোর্ডে ছিলাম প্রয়োজনে আমরা আবারো অর্থ বিনিয়োগ করে প্রতিষ্ঠানটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনব।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








