বর্জ্য থেকে পরিবেশবান্ধব সাশ্রয়ী ডিজেল উৎপাদন

কুয়েট প্রতিনিধি
ক্ষতিকর বর্জ্য থেকে পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী জ্বালানি উৎপাদনে সফলতার দাবি করেছেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) একদল গবেষক। কুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে পরিচালিত এ গবেষণায় প্রধানত মানববর্জ্যরে সাথে কৃষিজ অবশিষ্টাংশ, যেমন ধানের তুষ ও কাঠের গুঁড়া মিশিয়ে বায়ো-ক্রুড উৎপাদন করা হচ্ছে। গবেষকরা জানান, তাদের উদ্ভাবিত বায়ো-ক্রুড উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিবেশের ক্ষতি করবে না; বরং পুরো প্রক্রিয়াটিই পরিবেশবান্ধব। এ প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে দেশের আমদানিকৃত ডিজেলের প্রায় ৩০ শতাংশ বর্জ্য থেকে উৎপাদন করা সম্ভব। ফলে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমার পাশাপাশি বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে।
পরিবেশের ক্ষতি বা দূষণের সম্ভাবনা শূন্য
বায়ো-ক্রুড উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বর্জ্য ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশের ক্ষতি বা দূষণের সম্ভাবনা একদম শূন্য দাবি করে ড. খালেকুজ্জামান বলেন, এ প্রক্রিয়ায় বর্জ্য থেকে কিছুই পরিবেশে উন্মুক্ত করছি না। তেল উৎপাদনের পর যে অবশিষ্টাংশ থাকে, সেটি লিগনাইট মানের কয়লা। এটি সরাসরি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ অন্যান্য জায়গায় ব্যবহার করা যাবে। তেল উৎপাদনের সময় তেলের সাথে মিশ্রিত পানি নাইট্রোজেনসমৃদ্ধ। এটি ব্যবহার করে ইউরিয়ার মতো নাইট্রোজেনসমৃদ্ধ সার তৈরি করা সম্ভব।
ডিজেলের ৩০ শতাংশ উৎপাদনের দাবি
বাংলাদেশ প্রতিবছর জ্বালানি আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে। আমদানিকৃত জ্বালানির একটি বড় অংশ ডিজেল। অধ্যাপক ড. মো: খালেকুজ্জামানের দাবি, কুয়েটের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে দেশের আমদানিকৃত ডিজেলের প্রায় ৩০ শতাংশ বর্জ্য থেকে উৎপাদন করা সম্ভব। তাদের দাবি অনুসারে এক টন মানববর্জ্য থেকে ৬০-৭০ লিটার তেল এবং ৪৫-৫০ কেজি কয়লা উৎপাদন করা সম্ভব। গবেষকের দাবি, বছরে ছয় হাজার ৫০০ থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব। একই সাথে উৎপাদিত ডিজেল, অকটেনসহ অন্যান্য জ্বালানি ১০০ টাকা বা তার কম দামে উৎপাদন করা সম্ভব, যা প্রচলিত বাজারমূল্যের তুলনায় কম।
হাইড্রোথার্মাল লিকুইফ্যাকশনে উৎপাদন
প্রায় ১০ বছর আগে ক্ষতিকর বর্জ্য নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বর্জ্য থেকে তেল উৎপাদনের বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেন কুয়েটের গবেষকরা। হাইড্রোথার্মাল লিক্যিফিকেশন পদ্ধতিতে প্রধানত মানববর্জ্যরে সাথে কৃষিজ অবশিষ্টাংশ, যেমন ধানের তুষ ও কাঠের গুঁড়া মিশিয়ে তেল উৎপাদন করা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় বর্জ্য শুকানোর প্রয়োজন হয় না। উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপে সরাসরি বর্জ্য থেকে অপরিশোধিত তেল বা বায়ো-ক্রুড উৎপাদন করা হয় বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। অধ্যাপক খালেকুজ্জামান জানান, এ প্রযুক্তি ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এ বিষয়ে পরিচালিত গবেষণাগুলো উচ্চ প্রভাবসম্পন্ন কিউ-১ জার্নাল ঊহবৎমু ঈড়হাবৎংরড়হ ধহফ গধহধমবসবহঃ-এ প্রকাশিত হয়েছে।
বাণিজ্যিক উৎপাদনে সরকারি সহযোগিতা চান গবেষকরা
এ প্রযুক্তিতে সরকার বিনিয়োগ করলে এক দিকে পরিবেশদূষণ রোধে ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে, অন্য দিকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো যাবে। একই সাথে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং বাংলাদেশী প্রযুক্তিতে বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জন করা সম্ভব হবে। গবেষণার এ পর্যায়ে এসে ল্যাবরেটরির গণ্ডি পেরিয়ে বাণিজ্যিক পর্যায়ে বায়ো-ক্রুড উৎপাদনে যেতে ১-৩ টনের প্ল্যান্ট তৈরিতে ১০০-১২০ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন গবেষকরা। এ ব্যাপারে তারা সরকারের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছেন।

Advertisement