মা টমের হাসি
মা টমের হাসি ।


সরকারি কোয়ার্টারের আঙিনায় একটি খুবই দয়ালু কুকুর বাস করত। সবাই তাকে ডাকত, ‘টম’ বলে। টম ছিল সবার প্রিয়। কেউ রুটি দিত, কেউ আবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিত। টমও লেজ নেড়ে সবাইকে অভিবাদন জানাত।
একদিন ভোরে টমের গোঙানি শুনে লোকজন এগিয়ে এলো। তারা দেখল- টম আটটি ছোট্ট, তুলতুলে বাচ্চা জন্ম দিয়েছে! আহা! কী সুন্দর তারা! কারো কান গোল, কারো চোখ আধখোলা, কেউ আবার টলটল করে মায়ের কাছে এসে পড়ে। টম সারাদিন ছানাদের পাশে শুয়ে থাকত। কখনো চেটে দিত, কখনো নাকে ঠেলে জাগিয়ে তুলত। এভাবে সারাদিন তাদের আদর, চাটাচুটি আর দুধ খাইয়ে সে ব্যস্ত থাকত। আর বাচ্চাগুলোও খুশিতে লেজ নেড়ে মায়ের কাছে গা এলিয়ে থাকত। মনে হতো- টম যেন পশুদের মধ্যে সবচেয়ে মমতাময়ী এক মা। 
একদিন সকালে দেখা গেল, টমের মন খুব খারাপ। সে এদিক-ওদিক হাঁটছে, কেউ ডাকলে সাড়া দিচ্ছে না। টম অস্থির হয়ে ছোটাছুটি করছে। তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। কুকুরটি এলাকার লোকজনের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে করুণ স্বরে কাঁদতে লাগল। কেউ বলল, ‘ছানাগুলোকে তো দেখা যাচ্ছে না!’ সবাই খুঁজল- গাছের নিচে, বারান্দায়, আঙিনায়। কিন্তু ছানাগুলো আর কোথাও পাওয়া গেল না। টম পাগলের মতোই ছানাগুলো খুঁজে বেড়াল। কখনো ঘাসের ঝোপে মুখ ঢোকাল, কখনো মানুষের পায়ের কাছে গা ঘেঁষে দাঁড়াল। মনে হচ্ছিল- সে যেন বলছে, ‘আমার ছোট্ট বাচ্চাগুলোকে কেউ দেখেছ?’ মা টম বাচ্চাদের হারিয়ে এতটাই কষ্ট পেয়েছিল যে খাবারও খেত না। সারাদিন শুধু খুঁজে বেড়াত আর ফুঁপিয়ে কাঁদত।
অবশেষে জানা গেল, কোনো একজন কুকুরছানাগুলো বস্তাবন্দী করে পুকুরে ফেলে দিয়েছে। স্থানীয় লোকজন ছুটে যায়। তাদের নজরে আসে একটি বস্তা পানিতে ভাসছে। তারা সেটি ডাঙায় তুলে মাটিতে ঢালে। তারা দেখে হতবাক! টমের সবগুলো বাচ্চা মারা গেছে! মা টম প্রতিটি বাচ্চা শুঁকে বেড়ায় আর চোখের জল ফেলে। সে বুঝতে পারে কোনো বাচ্চা বেঁচে নেই। 
টমের এ দৃশ্য দেখে এলাকার সবাই খুব দুঃখ পেল। একজন স্থানীয় মুরব্বি টমকে দেখে বলেন, ‘প্রাণীদেরও ভাষা আছে রে বাবা। আমরা শুধু বুঝতে পারি না। মায়ের বেদনা যে কত গভীর হয় তা টমকে দেখেই বোঝা যায়।’ এলাকাবাসী হত্যাকারীর বিচার দাবি করল। ঠিক তখনই এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কয়েকজন যুবক টমের কষ্টের খবর জানতে পারে। 
তারা লক্ষ্য করে- গত দুদিন ধরে সন্তান হারিয়ে পাগলের মতো দৌড়াচ্ছিল টম। আমরা ওর কষ্ট দেখে আর থাকতে পারিনি। অবশেষে আমরা দুটি ছোট্ট কুকুরছানা খুঁজে এনে ওর সামনে রাখি। 
টম প্রথমে অবাক হয়ে ছানাগুলোর দিকে তাকাল। কিছু মুহূর্ত পরই তাদের আলতোভাবে কাছে টেনে নেয়। তারপর নিজের গায়ে জড়িয়ে দুধ খাওয়াতে শুরু করল। কুকুরটি যেন বলছে, ‘এসো, তোমরাই এখন আমার সন্তান।’
এলাকাবাসী টমকে দেখে খুশি হয়। তাদের বিশ্বাস- নতুন ছানাগুলো মা টমের শোক কিছুটা হলেও কমিয়ে দেবে। কদিনের মধ্যেই সত্যি সত্যিই টম আবার আগের মতো হাসিখুশি থাকে। ছানাগুলোও লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে তার পাশে খেলতে থাকে। টম ছানাগুলো দেখে গর্ব করে।
এ ঘটনা থেকে এলাকাবাসী মূল্যবান শিক্ষা পায়। মানুষ বা প্রাণী যেই হোক না কেন- মায়ের ভালোবাসা খুব গভীর ও মূল্যবান। তাই কোনো প্রাণীকে কষ্ট দেওয়া যাবে না, তাদের প্রতি দয়া ও সহানুভূতি দেখাতে হবে। যে দয়া করতে জানে, সে-ই সত্যিকারের ভালো মানুষ। ম

Advertisement