রাজনীতির মাঠে সহিংসতার ছায়া, দায় নিচ্ছে না কেউ

হারুন ইসলাম

Advertisement

রাজনীতি মানে মানুষের কাছে যাওয়া, সভা-সমাবেশ করা, পক্ষে-বিপক্ষে কথা বলা। কিন্তু দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বলছে, রাজনীতির মাঠে নামলে এখন নিরাপত্তার হিসাবও করতে হচ্ছে। হামলা, পাল্টা হামলা, গাড়ি ভাঙচুর, অবরুদ্ধ করে রাখা কিংবা থানায় গিয়ে মামলা করতে না পারা ইত্যাদি কারণে রাজনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে।
সর্বশেষ কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় লালন শাহের আখড়াবাড়িতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার অভিযোগ সেই প্রশ্ন আরো জোরালো করেছে। ৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় তার দিকে ডিম, ইটের টুকরা ও পাথর নিক্ষেপ এবং গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পুলিশ তাকে নিরাপদে সরিয়ে নিলে বড় ক্ষতি হয়নি। তবে ঘটনার পরদিনও মামলা হয়নি। এনসিপির অভিযোগ, নেতাকর্মীরা প্রায় চার ঘণ্টা থানায় অপেক্ষা করেও মামলা করতে পারেননি। পুলিশ বলেছে, লিখিত অভিযোগ না পাওয়ায় মামলা নেয়া সম্ভব হয়নি।  প্রশ্ন শুধু ‘কে হামলা করল’ এতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। হামলার পর রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া কত দ্রুত হচ্ছে, মামলা হচ্ছে কি না, গ্রেফতার হচ্ছে কি না এবং তদন্ত ও বিচার কতদূর এগোচ্ছে- এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ছয় মাসে কয়েক শ’ সংঘাত
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে অন্তত ৪০৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৩৭ জন নিহত এবং ২ হাজার ৩৯৫ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
মাসভিত্তিক হিসাবে, এপ্রিলে ৯৮টি ঘটনায় ছয়জন নিহত ও ৫৩৩ জন আহত, মে মাসে ৬৪টি ঘটনায় পাঁচজন নিহত ও ২৮৯ জন আহত, জুনে ৫৮টি ঘটনায় ৯ জন নিহত ও ৩৪৬ জন আহত, জুলাইয়ে ৪৫টি ঘটনায় ছয়জন নিহত ও ১৬৪ জন আহত, আগস্টে ৭০টি ঘটনায় সাতজন নিহত ও ৫৩৬ জনের বেশি আহত এবং সেপ্টেম্বরে ৬৮টি ঘটনায় চারজন নিহত ও ৫২৭ জন আহত হন।
অন্য দিকে আইন ও সালিস কেন্দ্র (আসক) জানুয়ারি-আগস্ট পর্যন্ত ৪৩২টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা, ৩ হাজার ১৮১ জন আহত ও ৮৮ জন নিহতের তথ্য নথিভুক্ত করেছে। এসব তথ্য জাতীয় দৈনিক ও অনলাইন সংবাদমাধ্যম এবং নিজস্ব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সংগ্রহ করা হয়েছে। দুই সংস্থার হিসাবে পার্থক্য থাকায় রাজনৈতিক সহিংসতার একটি একক জাতীয় ডেটাবেজের প্রয়োজনীয়তার প্রশ্ন তুলছে কেউ কেউ।
জেলা থেকে জেলা
গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক হামলার অভিযোগ এসেছে। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে নেত্রকোনায় জামায়াতের সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফার ব্যক্তিগত গাড়িতে হামলা ও তাকে অবরুদ্ধ করার ঘটনায় মামলা হয়। মামলায় ৬৩ জনের নাম উল্লেখ করে আরো ৬০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয় এবং পুলিশ ৯ জনকে গ্রেফতার করে। পরে বিএনপি ও ছাত্রদলের তিন নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
মে মাসে ঝিনাইদহে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় অন্তত ছয়জন আহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। পরের মাসে যশোরের বেনাপোলে তার গাড়িবহরে হামলার অভিযোগ ওঠে। এনসিপি চারজন আহত হওয়ার দাবি করে।
জুলাইয়ের শেষ দিকে হবিগঞ্জে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও সারজিস আলমের গাড়িবহরে হামলার অভিযোগ ওঠে। সারজিসকে একটি ব্যাংক ভবনে আশ্রয় নিতে হয় এবং পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। এতে নাসীরুদ্দীন, সারজিসসহ ৫০ জনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা, হামলা, ভাঙচুর ও ছিনতাইয়ের মামলা হয়। মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে ৪০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়।
সেপ্টেম্বরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় এনসিপির এক নেতার ওপর হামলার ঘটনায় বিএনপির ১৬ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার মামলা হয়। এজাহারে আরো ১০ থেকে ১২ জন অজ্ঞাত ব্যক্তির কথা বলা হয়।
শিক্ষাঙ্গনও বাইরে নয়
রাজনৈতিক সহিংসতার প্রভাব শিক্ষাঙ্গনেও পড়ছে। গত ২৩ এপ্রিল শাহবাগ থানার ভেতরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তদন্ত কমিটি পাঁচ মাসের বেশি সময় পর প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে ছাত্রদলের পাঁচ নেতাকর্মীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়ার কথা প্রকাশিত হয়েছে। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হলেও তা জমা দিতে কয়েক মাস সময় লাগে। এতে হামলার পাশাপাশি তদন্ত ও জবাবদিহির গতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
দলীয় কোন্দলও বড় কারণ
সব রাজনৈতিক সহিংসতা এক দল বনাম আরেক দলের নয়। একই দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলও বড় কারণ হয়ে উঠেছে। এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ৪০টি ঘটনায় ২৪৭ জন আহত ও চারজন নিহত হন। মে মাসে ১৮টি ঘটনায় ১১৪ জন আহত, জুনে ২১টি ঘটনায় ১৪৬ জন আহত ও তিনজন নিহত, জুলাইয়ে ১৪টি ঘটনায় ৪৮ জন আহত ও দুইজন নিহত এবং আগস্টে ২০টি ঘটনায় ১৫২ জন আহত ও পাঁচজন নিহত হন।
অধিকারের এপ্রিল-জুনের হিসাবে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৪১ জন নিহত ও ৯৭০ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘাতের ৫৭টি ঘটনায় চারজন নিহত ও ৪০০ জন আহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে সংস্থাটি।
স্থানীয় আধিপত্য, কমিটি, চাঁদাবাজি, দখল, প্রভাব বিস্তার কিংবা পদ-পদবি নিয়েও সংঘাত তৈরি হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নটি শুধু দলীয় প্রতিপক্ষের সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
মামলা হচ্ছে, কিন্তু এরপর?
এইচআরএসএসের জানুয়ারি-জুনের হিসাবে রাজনৈতিক ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ১৪৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৩ হাজার ২৬৮ জনের নাম উল্লেখ করে আরো ২৪ হাজার ৫১৮ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। একই সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অন্তত তিন হাজার ৬৭ জন নেতাকর্মী গ্রেফতার হন।
জুলাইয়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৪১টির বেশি মামলা হয়; ৮৮৭ জনের নাম এবং প্রায় ৫ হাজার ১৯ জন অজ্ঞাত আসামি করা হয়। আগস্টে ৬২টির বেশি রাজনৈতিক মামলা হয়; এক হাজার ১২৫ জনের নামের পাশাপাশি প্রায় দুই হাজার ২০৯ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়।
কিন্তু এসব মামলার কতটিতে তদন্ত শেষ হয়েছে, কতটিতে চার্জশিট হয়েছে, কতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হয়েছে কিংবা কতগুলো মামলায় দণ্ড হয়েছে- তার পূর্ণাঙ্গ জাতীয় চিত্র নেই। ফলে ‘মামলা হয়েছে’ এই তথ্যটিই অনেক সময় বিচারপ্রাপ্তির সূচক হয়ে থাকে।
রাজনৈতিক সহিংসতার প্রকৃত চিত্র ও বিচারপ্রক্রিয়া বুঝতে একটি জাতীয় ‘রাজনৈতিক সহিংসতা ট্র্যাকার’ তৈরি করা যেতে পারে। এতে ঘটনার জেলা, তারিখ, নিহত-আহত, হামলার ধরন, অভিযুক্তদের রাজনৈতিক পরিচয়, মামলা, গ্রেফতার, জামিন, চার্জশিট, অভিযোগ গঠন ও রায়ের তথ্য রাখা সম্ভব।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ্য করে ‘ট্যাগ’ বা লেবেল ব্যবহারের সংস্কৃতি জনজীবনকে বিষাক্ত করছে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যেন সহিংসতা ও প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে দেখার সংস্কৃতিতে না গড়ায়, সে জন্য দলীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি জরুরি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালকও দলগুলোর নিজস্ব সংগঠন ও অঙ্গসংগঠন নিয়ন্ত্রণ, সহিংসতার প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ এবং অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
কারণ কয়েকজনকে গ্রেফতার করলেই রাজনৈতিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয় না। নিরাপত্তা তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন হামলা করলে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে পার পাওয়া যাবে না এবং ভুক্তভোগীও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবেন না।