রামেবির ভিসিকে ঘিরে উত্তেজনার নতুন মোড়, গ্রেফতার আরো ২
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির কক্ষের তালা ভাঙা হয় : নয়া দিগন্ত।

 রাজশাহী ব্যুরো 

Advertisement

রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) ভিসি অধ্যাপক ডা: মো: জাওয়াদুল হককে ঘিরে মঙ্গলবারের ঘটনার পর গতকাল বৃহস্পতিবার পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে। এক দিকে ভিসিকে তার উপশহরের বাসা থেকে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী ক্যাম্পাসে নিয়ে আসেন; অন্য দিকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে তার কক্ষের তালা কেটে খুলে দেয়া হয়। একই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় আরো দু’জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এর আগে ঘটনার দিন রাতে এক বিএনপি নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। এ নিয়ে মামলায় মোট তিনজন গ্রেফতার হলেন।
গতকাল বেলা সোয়া ১১টার দিকে রামেবির অস্থায়ী ক্যাম্পাসে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ভিসির কক্ষের তালা খোলা হয়। পরে কক্ষটি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হলে তিনি সেখানে গিয়ে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করেন।
জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো: আরিফ হোসেন বলেন, বহিরাগত কেউ ভিসির কক্ষে তালা দিয়েছিল। তালা খুলে কক্ষটি তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলেও জানান তিনি। এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে ভিসি অধ্যাপক ডা. মো: জাওয়াদুল হককে তার উপশহরের বাসা থেকে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে নিয়ে আসেন বিএনপি ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
এ সময় মহানগর বিএনপির সহসভাপতি জয়নাল আবেদিন শিবলী, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান জনি, যুবদলের মহানগর আহ্বায়ক মো: শরিফুল ইসলাম জনি, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আকবর আলী জ্যাকি, সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক লিমন, সিনিয়র সহসভাপতি মো: আবিরসহ অন্য নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
ভিসিকে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসার বিষয়ে মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মো: শরিফুল ইসলাম জনি বলেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্দেশনা এবং মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন অর রশিদ ও সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটনের নির্দেশনায় তারা ভিসিকে বাসা থেকে নিয়ে এসেছেন। বিএনপি ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন কোনো ধরনের দখল বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেয় না দাবি করে তিনি বলেন, এ ঘটনায় দলের কোনো নেতাকর্মী জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ দিকে রামেবির ভিসি ও এক কর্মকর্তাকে হেনস্তার অভিযোগে করা মামলায় বৃহস্পতিবার সকালে আরো দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন- নগরীর বহরমপুর এলাকার আবদুল হান্নানের ছেলে মো: আলী আকবর হোসাইন (৩০) এবং একই এলাকার আলীমুদ্দীন শেখের ছেলে মো: দেলোয়ার হোসেন (৫৫)। তবে গ্রেফতার এই দু’জনের রাজনৈতিক পরিচয় বিকেল পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
রাজপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, এ ঘটনায় এর আগে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। নতুন দু’জনকে নিয়ে মোট তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার ভিডিও ও ছবি বিশ্লেষণ করে আরো কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে।
এ দিকে ঘটনার পর বৃহস্পতিবার সকালে রামেবির উপাচার্যের কার্যালয় পরিদর্শন করেন চিকিৎসক নেতারাসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। চিকিৎসক নেতা অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, অধ্যাপক ডা. এম মোর্শেদ জামান মিয়া, অধ্যাপক ডা. এ এস এম আব্দুল্লাহ এবং নার্স নেতা আবু তাহেরসহ অনেকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা ঘটনার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান। এর আগে বুধবার রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের সামনে চিকিৎসকদের উদ্যোগে মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
গত মঙ্গলবার রামেবির উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো: জাওয়াদুল হককে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করার অভিযোগ ওঠে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। উপাচার্যের ভাষ্য, তাকে কাগজটি পড়তে দেয়া হয়নি। লাঞ্ছিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে তিনি তাতে স্বাক্ষর করেন। পরে তাকে কার্যালয় থেকে বের করে দেয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ঘটনার দিন বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুরের মধ্যে ‘রাজশাহীর আপামর ছাত্র-জনতা’ লেখা ব্যানার নিয়ে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি দল রামেবির অস্থায়ী কার্যালয়ে প্রবেশ করে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। পরে দলটি উপাচার্যের কক্ষে গিয়ে তাকে পদত্যাগের জন্য চাপ দেয়। একপর্যায়ে আগে থেকে প্রস্তুত করা একটি পদত্যাগপত্র তার সামনে দেয়া হয় এবং তাতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয় বলে উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের অভিযোগ। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ওই দলে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের বেশ কিছু নেতাকর্মীও ছিলেন। তাদের মধ্যে মহানগর কৃষক দলের আহ্বায়ক শরফুজ্জামান শামীম, রাজপাড়া থানা বিএনপির সহসভাপতি আব্দুস সালাম ও সাংগঠনিক সম্পাদক হারুনুর রশিদের নাম প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে এসেছে। তবে ঘটনার সময় তাদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা কী ছিল এবং দলীয় পরিচয়ে তারা সেখানে গিয়েছিলেন কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ওই ঘটনায় ৫০ থেকে ৬০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে রাজপাড়া থানায় মামলা করা হয়েছে। মামলার তদন্তে পুলিশ ইতোমধ্যে কয়েকজনকে শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে।