
বিশেষ সংবাদদাতা
আওয়ামী লীগ আমলে রাজনৈতিক আক্রোশে স্বীকার হওয়া ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের অনেকেই এখন ঘুরে দাঁড়াতে চান ব্যবসায়। এই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের অনেকেই ব্যাংকঋণ খেলাপি হওয়ায় অগ্রসর হতে পারছে না। ফ্যাসিবাদী সরকারের আক্রোশের স্বীকার হওয়া অনেক ব্যবসায়ী বলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিসহায়তা থাকলেও বিভিন্ন সার্কুলারের ধারা-উপধারার জটিলতা ও সীমাবদ্ধতার কারণে খেলাপি ঋণকে সাধ্যের মধ্যে নিয়মিত করা এবং ব্যবসায় নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা করেও দাঁড়াতে পারছেন না।
দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যবসা-বাণিজ্যের অঙ্গনে নতুন এক বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ফ্যাসিবাদীদের মতাদর্শের না হওয়ায় যেসব ব্যবসায়ী নানা ধরনের চাপ, হামলা-মামলা, জেল-জুলুম, হয়রানির স্বীকার হয়ে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা আর্থিক সঙ্কটে পড়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের একটি বড় অংশ এখনো ব্যবসায় ফিরতে পারছেন না। ক্ষতিগ্রস্ত এই ব্যবসায়ীদের অভিযোগ- তারা বাণিজ্যিক ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন ঋণকে বাস্তবতার আলোকে নিয়মিত করার জন্য। কিন্তু বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিসহায়তার ধারা-উপধারার নির্দেশনায় বা সার্কুলারের সীমাবদ্ধতায় কোনো ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকের সক্ষমতানুযায়ী ঋণ পরিশোধের বাস্তবতার আলোকে সুযোগ দিতে পারছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে সঙ্কটে থাকা ব্যবসায় ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলের জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মুদ্রানীতি পর্যালোচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের জন্য বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধা দেয়া হয়েছে; কিছু ক্ষেত্রে শ্রেণিকৃত ঋণ দীর্ঘমেয়াদে পুনঃতফসিল করার সুযোগ এবং সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ডের ব্যবস্থা ও এককালীন অথবা তিন-চার বছরের কিস্তিতে এক্সিট সুবিধা রেখেছে। পাশাপাশি যোগ্য ব্যবসাগুলোর ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলের জন্য বিশেষ নীতিসহায়তা ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল।
কিন্তু সমস্যার জায়গাটি অন্যত্র। ঋণ পুনঃতফসিল করলেই একটি বন্ধ ব্যবসা চালু হয় না। ব্যবসা চালুর জন্য দরকার নতুন কার্যকর মূলধন, কাঁচামাল, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল, আমদানি ব্যয় এবং বাজারে পুনঃপ্রবেশের সক্ষমতা। অর্থাৎ পুরনো ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন অর্থের জোগান না থাকলে অনেক উদ্যোক্তার কাছে নীতিসহায়তা কাগজে থাকা সুবিধা হয়েই থেকে যেতে পারে।
রাজনৈতিক পরিচয়ের মূল্য কি ব্যবসাকে দিতে হবে?
গত দেড় দশকের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে নানা অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের সাথে যুক্ত কিংবা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে থাকা ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ হয়রানি, মামলা, প্রশাসনিক চাপ, ব্যবসা বন্ধ করে দেয়া, ঋণ সুবিধা না পাওয়া বা বিভিন্ন ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছেন- এমন অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে এসেছে।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের একটি অংশ যে পুনরায় ব্যবসায় ফিরতে আগ্রহী, সেটি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বড় বিষয়।
কারণ ব্যবসা বন্ধ হওয়ার ক্ষতি শুধু একজন উদ্যোক্তার নয়। একটি কারখানা বন্ধ হলে শ্রমিকের আয় বন্ধ হয়। একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে সরবরাহকারী, পরিবেশক, পরিবহন ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সেবাদাতার আয় কমে। ব্যাংকের ঋণ অনাদায়ী হলে ব্যাংকের সম্পদের মান খারাপ হয়। কর আদায় কমে। নতুন বিনিয়োগের সুযোগও সঙ্কুচিত হয়। অর্থাৎ একটি ব্যবসা রাজনৈতিক বা অন্য কোনো কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার অর্থ হলো অর্থনীতির একটি অংশ নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকা। এখন যদি সেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করার বাস্তব সম্ভাবনা থাকে, তাহলে তাকে একেবারে নতুন উদ্যোক্তার মতো নয় বরং পুনর্বাসনযোগ্য ব্যবসা হিসেবে বিবেচনা করা যায় কি না সেটিই নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হবে।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জের প্রধান নির্বাহী এম মাশরুর রিয়াজ গতকাল এ বিষয়ে নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, প্রকৃতপক্ষেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী তাদের কেস টু কেস ভিত্তিতে পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। সেটা সুদ মওকুফই হোক, নতুন করে তহবিল জোগান দেয়াই হোক। একইসাথে দেখতে হবে, তার ঋণ ফেরত দেয়ার সক্ষমতা। এজন্য কী কারণে তার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হলো তা যাচাই করা। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হলে আর ওই ব্যক্তি যদি আন্তরিকভাবেই ব্যবসায় ফিরতে চান এক্ষেত্রে কেস টু কেস ভিত্তিতে বিশেষ নীতিসহায়তা দেয়া যেতে পারে। তবে ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার ঘাটতির কারণে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সে ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
অর্থনীতিবিদরা বলেন, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ আদায়ের বিষয়ে বাস্তবতার নিরীখে ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে কেস টু কেস বিবেচনা করতে পারে। শুধু এৎধপব চবৎরড়ফ বা গড়হঃবৎরস চবৎরড়ফ দেয়াটাই সর্বক্ষেত্রে সমাধান নাও হতে পারে, যদি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেলুলিন সিস্টেমে অর্থাৎ ছোট থেকে বড় ওহংঃধষষসবহঃ-এর সুযোগ প্রদান করা হয়, হয়তোবা ক্ষতিগ্রস্ত ঋণ গ্রহীতা প্রতিষ্ঠান তাহলে ব্যবসায় সুযোগের মাধ্যমে ঋণ পরিশোধ পূর্বক ব্যাংকের ঋণ আদায় হতে পারে।
যেহেতু খেলাপি ঋণ দেশের অর্থনৈতিক ও ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় নজিরবিহীন বিশাল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই যেই সমস্ত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ঋণ পরিশোধের জন্য এগিয়ে আসছেন, ওই সব ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীকে তাদের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে ঋণের টাকা ব্যাংকে ফিরিয়ে আনার জন্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়মকানুনের শিথিলতার মাধ্যমেও ব্যাংক-কাস্টমার বেসিস চেষ্টা করা যেতে পারে।
খেলাপি ঋণের ফাঁদ থেকে ফিরে আসার স্বপ্ন
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের অনেকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা ঋণ। একজন উদ্যোক্তা যদি কয়েক বছর ব্যবসা চালাতে না পারেন, তাহলে ব্যাংকের ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করা কঠিন। ব্যবসার আয় না থাকলেও সুদ ও অন্যান্য আর্থিক দায় জমতে থাকে। একপর্যায়ে ঋণ শ্রেণিকৃত হয়। তখন নতুন ঋণ পাওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে যায়। ফলে উদ্যোক্তার সামনে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। পুরনো ব্যবসা চালু করতে নতুন অর্থ দরকার, কিন্তু পুরনো ঋণ অনিয়মিত হওয়ায় নতুন অর্থ পাওয়া কঠিন। এই চক্র ভাঙার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সঙ্কটে থাকা ঋণগ্রহীতাদের জন্য বিশেষ পুনঃতফসিল নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি কিস্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করতে হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ও ব্যবসায়িক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা এক ব্যক্তি নন।
কোনো ব্যবসায়ী যদি জেনেশুনে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ করেন, অর্থ পাচার করেন বা সম্পদ লুকিয়ে ঋণ পরিশোধ না করেন, তাকে পুনর্বাসনের নামে নতুন ঋণ দেয়া মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান যদি রাজনৈতিক চাপ, প্রশাসনিক বাধা, বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা অন্য কোনো প্রমাণযোগ্য কারণে ব্যবসা হারিয়ে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে থাকেন এবং প্রতিষ্ঠানটির মৌলিক ব্যবসায়িক সক্ষমতা এখনো থাকে, তাহলে তার জন্য ভিন্ন মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে।
বন্ধ শিল্প পুনরায় চালুর উদ্যোগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলোর মধ্যে বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতের জন্য প্রি-ফাইন্যান্স ব্যবস্থা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলার তালিকায় ২০২৬ সালের জুন, জুলাই ও সেপ্টেম্বর মাসে বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতকে সহায়তার জন্য একাধিক নির্দেশনার উল্লেখ রয়েছে। এ ধরনের ব্যবস্থা সফল হলে এর অর্থ দাঁড়ায়, শুধু পুরনো ঋণ আদায় নয়, উৎপাদন ক্ষমতা ফিরিয়ে আনার বিষয়টিকেও আর্থিক নীতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কারণ একটি বন্ধ কারখানা থেকে ব্যাংক কোনো আয় পায় না, সরকার কর পায় না, শ্রমিক মজুরি পায় না এবং বাজারও উৎপাদন পায় না। কিন্তু সেটি চালু হলে একই প্রতিষ্ঠান আবার ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে পারে, শ্রমিক নিয়োগ করতে পারে, কর দিতে পারে এবং অর্থনৈতিক চাকা আরো সচল হতে পারে। তবে প্রি-ফাইন্যান্সের সুবিধা পেতে হলে যোগ্যতা, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও অর্থের ব্যবহার কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
একটি সম্ভাব্য প্যাকেজে থাকতে পারে পুরনো ঋণের বাস্তবসম্মত পুনর্গঠন; নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গ্রেস পিরিয়ড; ক্ষেত্রবিশেষে বেলুলিন সিস্টেমে ইনস্টলমেন্ট, ব্যবসা পুনরায় চালুর জন্য সীমিত কার্যকর মূলধন; উৎপাদনমুখী খাতে পুনঃঅর্থায়ন; নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সাথে অর্থায়নকে যুক্ত করা; বন্ধ কারখানা বা প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রপাতি পুনরায় ব্যবহারে বিশেষ অর্থায়ন; ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ক্রেডিট গ্যারান্টি; ব্যাংক ও উদ্যোক্তার মধ্যে দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ সেল। তবে লক্ষ্য হওয়া উচিত ব্যবসা পুনরুজ্জীবিত করা এবং নতুন ব্যবসায় সুযোগ প্রদান, পুরনো ঋণের টাকা আদায়ে সচেষ্ট হওয়া।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতার পুনর্গঠন, পুনঃঅর্থায়ন এবং বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতের জন্য প্রি-ফাইন্যান্সসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই নীতিগুলোকে আরো লক্ষ্যভিত্তিক করা এবং নীতিসহায়তার নির্দেশনা বাস্তবতার আলোকে বিবেচনায় রাখা।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








