মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যবর্তী ২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত কখনোই মানচিত্রের একটি সরল রেখা ছিল না। এটি দীর্ঘদিন ধরে বাস্তুচ্যুতি, চোরাচালান, উগ্রপন্থা ও জাতিগত সঙ্ঘাতের করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে ২০২৩ সালের শেষভাগ থেকে রাখাইন রাজ্যে যে ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন শুরু হয়, তা সীমান্ত সম্পর্কে বাংলাদেশের পুরনো ধারণা অচল করে দিয়েছে। নেপিডোর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার এখন আর বাংলাদেশের বিপরীত পাশের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করে না। সেখানে কার্যত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে জাতিগত রাখাইন সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি। ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত আরাকান আর্মি এবং এর রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান এখন আর সাধারণ গেরিলা সংগঠন নয়। তারা রাখাইনের অধিকাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্রসদৃশ কাঠামো গড়ে তুলছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের অপারেশন ১০২৭ শুরু হওয়ার পর এএ দ্রুত অগ্রসর হয়। রাখাইন রাজ্যের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টির নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পাশাপাশি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তারা কক্সবাজারের বিপরীতে অবস্থিত কৌশলগত সীমান্ত শহর মংডু দখল করে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের পুরো সীমান্ত কার্যত তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
ভূখণ্ড হারানোর পর মিয়ানমার জান্তা বিমান হামলা ও বোমাবর্ষণের ওপর ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এসব হামলা ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানি ঘটালেও হারানো এলাকা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হয়নি। অন্য দিকে এএ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করছে এবং সংগঠনটির প্রধান তোয়ান ম্রাত নাইং ২০২৭ সালের মধ্যে পুরো রাখাইন দখল করে ‘চূড়ান্ত বিজয়’ অর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। কয়েক বছর আগেও এ ধরনের ঘোষণা অবাস্তব মনে হলেও বর্তমানে তা একেবারে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। পরিস্থিতি আরো বিপজ্জনক করে তুলেছে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির উপস্থিতি। 
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সীমান্তে উচ্চ সতর্কতা জারি করে এবং অনুপ্রবেশের অভিযোগে আরসার ৫৩ জন সদস্যকে আটক করে। সীমান্তের ওপারে গোলাগুলি, মর্টার হামলা ও বোমাবর্ষণে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং কয়েকজন বাংলাদেশীও আহত হন। বিজিবিকে তাই একই সাথে আরসার অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ, এএ-র গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, জান্তার হামলার সম্ভাব্য সীমান্ত অতিক্রম মোকাবেলা এবং রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর নিরাপত্তা রক্ষা করতে হচ্ছে।
ঢাকার আনুষ্ঠানিক নীতি ছিল শুধু স্বীকৃত মিয়ানমার সরকারের সাথে যোগাযোগ রাখা। কিন্তু যে সরকার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করে না, তার সাথে এককভাবে সম্পর্ক রেখে সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরাও স্বীকার করেছেন, সীমান্তের বিপরীত পাশ এখন একটি রাষ্ট্র-বহির্ভূত শক্তির নিয়ন্ত্রণে এবং জাতীয় স্বার্থেই এএ-র সাথে যোগাযোগ রাখা প্রয়োজন। মংডু দখলের পর বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এএ-র সাথে যোগাযোগের কথা স্বীকার করে। পরবর্তী সময়ে এএ নেতৃত্ব বাংলাদেশের নতুন সরকারের প্রতি অভিনন্দন জানায় এবং ঢাকাও মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ও আরাকান আর্মির মধ্যে কার্যকর সংলাপ প্রতিষ্ঠার আগ্রহ প্রকাশ করে। এ অবস্থায় বাংলাদেশকে এক দিকে নেপিডোর সাথে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হচ্ছে, অন্য দিকে সীমান্তের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক এএ-র সাথে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ চালাতে হচ্ছে। এএ-কে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিলে মিয়ানমারের সার্বভৌমত্ব ও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়ার প্রশ্ন উঠবে; আবার তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করলে সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য, মানবিক সহায়তা ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের প্রভাব কমে যাবে।
এএ-র কর্তৃত্ব সবচেয়ে সরাসরি অনুভব করছেন নাফ নদী ও সেন্ট মার্টিনের আশপাশের বাংলাদেশী মৎস্যজীবীরা। মাছ ধরার সময় তাদের আটক, অপহরণ ও গুলি করার অভিযোগ রয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতে দুই বছরের বেশি সময় ধরে আটক ৭৩ জন বাংলাদেশী মৎস্যজীবীকে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় বিজিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়। এই মুক্তিকে তাদের সদিচ্ছার প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। মৎস্যজীবীদের হয়রানি, সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর কমিশন দাবি এবং জলসীমায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে এক ধরনের শুল্ক-সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশের উদ্বেগ আরো বেড়েছে কথিত ‘গ্রেটার রাখাইন’ মানচিত্রকে কেন্দ্র করে, যেখানে চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু এলাকা অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়। এটি সংগঠনটির রাখাইন জাতীয়তাবাদী আদর্শ সম্পর্কে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। ‘ওয়ে অব রাখিতা’ এবং আরাকানের অতীত গৌরব পুনরুদ্ধারের ধারণার মধ্যে ঐতিহাসিক ভূখণ্ডের স্মৃতি রয়েছে। ফলে আজকের আলোচনার সহযোগী ভবিষ্যতে ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক চাপের উৎসে পরিণত হবে না এমন নিশ্চয়তা নেই। এএ-র উত্থানের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ওপর। ২০২৬ সালের জানুয়ারি নাগাদ বাংলাদেশে ১১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছিলেন, যাদের মধ্যে এক লাখ ৪৩ হাজারের বেশি নতুন আগমনকারী। তাদের ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সহায়তার জন্য ২০২৫-২৬ যৌথ প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনার প্রথম বছরেই ৯৩৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমতে থাকায় এই বোঝা বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর ক্রমেই গুরুতর চাপ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশ ছয় দফায় আট লাখ ২৯ হাজারের বেশি রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমারকে দিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় তিন লাখ ৯৩ হাজারের যাচাই সম্পন্ন হয়েছে এবং দুই লাখ ৮৩ হাজারের বেশি মানুষকে মিয়ানমারে আগে বসবাসকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, চলাচলের স্বাধীনতা ও জীবিকার নিশ্চয়তা না থাকলে এসব যাচাইকরণ অর্থহীন। এএ-র বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা হত্যা, বাস্তুচ্যুতি, জোরপূর্বক নিয়োগ, গ্রাম পোড়ানো, মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত করা, নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে। তাই শুধু এএ-র সাথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করলেই নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে— এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। তারপরও বাংলাদেশ ও রাখাইনের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার শক্তিশালী যুক্তি আছে। জান্তার অবরোধে বিচ্ছিন্ন রাখাইনের জন্য বাংলাদেশ জ্বালানি, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের নিকটতম উৎস। অন্য দিকে স্থিতিশীল রাখাইন বাংলাদেশের নির্মাণসামগ্রী, কৃষিপণ্য, প্রযুক্তি ও ওষুধের সম্ভাবনাময় বাজার হতে পারে। মংডু বাণিজ্যকেন্দ্রসহ পুরনো বৈধ বাণিজ্যপথ পুনরায় চালু করা হলে উভয় পক্ষ লাভবান হবে এবং মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের অবৈধ নেটওয়ার্ক দুর্বল করা সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার, বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্প এবং রাখাইনে বিনিয়োগ রক্ষার স্বার্থে চীন সেখানে যে শক্তিই কর্তৃত্ব করুক না কেন, তার সাথে যোগাযোগ রাখবে। এএ-ও চীনা বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছে। ফলে সংগঠনটি আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকবে বলে ধরে নেয়া ভুল হবে। বাংলাদেশকে নিজের নিরাপত্তা ও সংযোগস্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
ঢাকার নীতি হওয়া উচিত সতর্ক, বাস্তববাদী ও দ্বিমুখী। মিয়ানমারের সাথে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেই এএ-র সাথে সীমিত ও শর্তাধীন কার্যকর যোগাযোগ রাখতে হবে। সীমান্তে হটলাইন, মৎস্যজীবী আটক ও মুক্তির নির্দিষ্ট প্রটোকল, গুলিবর্ষণ বন্ধ, অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ, জলসীমার প্রতি সম্মান এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। একই সাথে এএ নেতৃত্বকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, সেন্টমার্টিন, নাফ নদীর অধিকার এবং সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে জাতিসঙ্ঘ, চীন ও অন্যান্য প্রভাবশালী পক্ষকে সম্পৃক্ত করে এএ, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশকে নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত কাঠামো গড়তে হবে। প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও আন্তর্জাতিকভাবে পর্যবেক্ষিত। নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না করে কাউকে ফেরত পাঠানো নতুন মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এমন এক যুগে প্রবেশ করেছে যার কোনো সুস্পষ্ট পূর্বদৃষ্টান্ত নেই। বাংলাদেশ যে রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক প্রতিবেশী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, সে রাষ্ট্র আর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করে না; আর যে সংগঠন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করে, সেটি একই সাথে সম্ভাব্য সহযোগী, নিরাপত্তা-ঝুঁকি, জাতিগত-জাতীয়তাবাদী শক্তি এবং স্বীকৃতিপ্রত্যাশী একটি প্রকৃত কর্তৃপক্ষ। কিন্তু স্থায়ী স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন সংলাপ, শক্তিশালী সীমান্ত প্রতিরক্ষা, সুস্পষ্ট রেডলাইন এবং বেসামরিক মানুষের সুরক্ষার প্রতি দৃঢ়অঙ্গীকার। সীমান্ত বদলে গেছে; এখন বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াই আগামী এক প্রজন্মের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করবে।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক
hrmrokan@hotmail.com

Advertisement