‘প্রাইজ পোস্টিং’ ভাঙতে লটারিতে ১৮ সাব-রেজিস্ট্রার

নিজস্ব প্রতিবেদক

Advertisement

ঢাকার ‘প্রাইজ পোস্টিং’ হিসেবে পরিচিত সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে পদায়নে স্বচ্ছতা আনতে লটারির আশ্রয় নিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। সারা দেশের ‘এ’ ক্যাটাগরির ১৩১ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে ১৮ জনকে ঢাকায় পদায়নের জন্য বাছাই করা হয়েছে। তবে লটারিতে নির্বাচিত হলেই নির্দিষ্ট কোনো অফিসে পদায়ন পাবেন না তারা। কাজের চাপ সামলানোর সক্ষমতা, দক্ষতা ও সংশ্লিষ্ট অফিসের প্রয়োজন বিবেচনা করে ঢাকার বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে তাদের পদায়ন করা হবে।
আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান বলেছেন, সাব-রেজিস্ট্রারদের পদায়ন নিয়ে দীর্ঘদিনের নেতিবাচক ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতেই এ উদ্যোগ। ঢাকার পোস্টিংকে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং যেসব জায়গায় দুর্নীতির শিকড় গজানোর অভিযোগ রয়েছে, পর্যায়ক্রমে সেসব জায়গাতেও রোটেশনের মাধ্যমে পদায়ন করা হবে।
গতকাল মঙ্গলবার আইন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে লটারির মাধ্যমে ১৮ জনকে বাছাই করা হয়। এ সময় আইনমন্ত্রী বলেন, রাতারাতি সবকিছু পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তবে কোনো না কোনো জায়গা থেকে পরিবর্তনের শুরু করতে হবে। লটারির মাধ্যমে ঢাকার পদায়ন সেই শুরুর একটি অংশ।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা লটারির মাধ্যমে যখন দিচ্ছি, এটা আমাদের একটা শুরু। এই প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। কোনো না কোনো জায়গা থেকে আমাদের শুরু করতে হয়, আমরা সেই শুরুটা করছি।’
সাব-রেজিস্ট্রারদের জন্য ঢাকার পদায়নকে কেন বিশেষভাবে দেখা হচ্ছে এমন প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, ঢাকার পোস্টিংকে সাধারণভাবে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই প্রথম ধাপে ঢাকা জেলার ক্ষেত্রেই লটারির মাধ্যমে স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বা ‘প্রাইজ পোস্টিং’-এর ক্ষেত্রেও এ ধরনের রোটেশন পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। যেসব জায়গাকে জনমনে দুর্নীতির আখড়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেখানে দীর্ঘদিনের কোনো সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেয়া হবে।
আইনমন্ত্রীর ভাষায়, ‘যে জায়গাটা আমরা মনে করছি পাবলিক পারসেপশনে দুর্নীতির আখড়া, সেই জায়গায় সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য আমাদের এই প্রক্রিয়া।’ তার মতে, একই ব্যক্তিকে দীর্ঘদিন একই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখার পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মকর্তাদের পুনর্বণ্টন করা হলে একটি ভারসাম্য তৈরি হবে। তবে এ প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য কাউকে হয়রানি করা বা কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া নয়।
লটারির মাধ্যমে ১৮ জনকে বাছাই করা হলেও তাদের ঢাকার কোন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দেওয়া হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও কাজের চাপ সামলানোর সক্ষমতা বিবেচনা করা হবে। আইনমন্ত্রী বলেন, ঢাকার সব সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কাজের চাপ এক নয়। কোনো কোনো অফিসে কাজের চাপ অনেক বেশি। ফলে শুধু লটারির ভিত্তিতে নির্দিষ্ট অফিসে পদায়ন করলে অফিসের কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।
তাই লটারিতে নির্বাচিত ১৮ জনের মধ্যে কে কোন ধরনের দায়িত্ব পালনে বেশি সক্ষম, তা বিবেচনা করে পরবর্তী পদায়ন করা হবে। অর্থাৎ লটারি হবে ঢাকায় আসার ক্ষেত্রে একটি নিরপেক্ষ বাছাই প্রক্রিয়া; নির্দিষ্ট কর্মস্থল নির্ধারণ হবে দক্ষতা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে। আইনমন্ত্রীর এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত হওয়া মানেই ঢাকার যেকোনো পছন্দের অফিসে পদায়নের নিশ্চয়তা নয়।
ঢাকায় নির্বাচিত ১৮ সাব-রেজিস্ট্রার কতদিন দায়িত্ব পালন করবেন এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, সার্ভিস রুল অনুযায়ী যত দিন দায়িত্ব পালনের সুযোগ থাকবে এবং তারা ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করবেন, তত দিন থাকতে পারবেন। তবে দায়িত্বে গিয়ে কেউ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়লে তাকে ওই পদে রাখা হবে না বলেও স্পষ্ট করেন তিনি।
আইনমন্ত্রীর বক্তব্য, কর্মকর্তার ভালো কর্মসম্পাদন ও সার্ভিস রুলই হবে পদায়ন বহাল রাখার মূল ভিত্তি। ফলে ঢাকায় পদায়নকে কোনো স্থায়ী বা নিশ্চিত সুবিধা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
লটারির মাধ্যমে পদায়নের ফলে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দুর্নীতি কমবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, তিনি এ বিষয়ে আশাবাদী। তবে শুধু পদায়ন বদল করলেই দুর্নীতি পুরোপুরি বন্ধ হবে না। এর সাথে সংশ্লিষ্ট সবার মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন। তিনি বলেন, মানুষের মানসিকতা পরিবর্তন শুধু আইন মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব রয়েছে। এক পক্ষ পরিবর্তিত হলে অন্য পক্ষ একই অবস্থায় থাকলে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবে না।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু আমি পরিবর্তিত হলাম, আপনি হলেন না তাহলে তো এটা কার্যকর হবে না।’
সাব-রেজিস্ট্রারদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গেও কঠোর অবস্থানের কথা জানান আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অযথা হয়রানি করা হবে না, আবার প্রমাণ পাওয়া গেলে কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। তিনি বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কাউকে যেমন হয়রানি করব না, কিন্তু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তাকে ছাড়ও দেয়া হবে না।’
আইনমন্ত্রী জানান, সাব-রেজিস্ট্রারদের ক্ষেত্রে এরই মধ্যে প্রায় ১০ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তিনি সাংবাদিকদেরও সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ দুর্নীতির অভিযোগ দেয়ার আহ্বান জানান। কোনো সাব-রেজিস্ট্রারের সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট সম্পদের তথ্য, কোথায় কী সম্পদ রয়েছে কিংবা কার কাছ থেকে কিভাবে অর্থ নেয়া হয়েছে এসব সুনির্দিষ্ট তথ্য দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি।
একই সাথে সাব-রেজিস্ট্রারদের কাছ থেকে সাংবাদিকদের একটি অংশের চাঁদা বা মাসোহারা চাওয়ার অভিযোগ পাওয়ার কথাও উল্লেখ করেন আইনমন্ত্রী। তার মতে, এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ প্রয়োজন।
আইন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে ৩৭২ জন সাব-রেজিস্ট্রার কর্মরত রয়েছেন। এর বাইরে প্রায় ১৩৯টি পদ শূন্য রয়েছে। এসব পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হবে।
সারাদেশে এ ক্যাটাগরির সাব-রেজিস্ট্রারের সংখ্যা ১৩১ জন। তাদের মধ্য থেকেই লটারির মাধ্যমে ঢাকার জন্য ১৮ জনকে বাছাই করা হয়েছে। আইনমন্ত্রী জানান, এ উদ্যোগ শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ও ‘প্রাইজ পোস্টিং’ হিসেব পরিচিত জায়গাগুলোতেও রোটেশনের মাধ্যমে পদায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে।
লটারিতে ঢাকার জন্য মনোনীত ১৮ জন
লটারিতে ঢাকায় পদায়নের জন্য মনোনীত ১৮ জন হলেন- মো: গোলাম মোর্তজা (রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ), অমায়িক বাবু (সদর, সাতক্ষীরা), ফরিদা আক্তার (চিতোষী, চাঁদপুর), অজয় কুমার সাহা (সদর, চুয়াডাঙ্গা), অমিত মঙ্গল চাকমা (সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম), মো: রাসেল মল্লিক (সদর, কুষ্টিয়া), গোবিন্দ সাহা (মনোহরদী, নরসিংদী), মো: মাসুম (নাজিরপুর, পিরোজপুর), এস এম আবু মুসা (নবীনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া), নাজনিন জাহান (শ্যামনগর, সাতক্ষীরা), মোহাম্মদ হানিফ (দাউদকান্দি, কুমিল্লা), মনীষা রায় (পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও), সিং মং থোয়াই (গাছবাড়িয়া, চট্টগ্রাম), রাজিব মজুমদার গোপালপুর, টাঙ্গাইল), আলী আজগর (সদর, মুন্সিগঞ্জ), শর্মিলা আহমেদ শম্পা (ঘিওর, মানিকগঞ্জ), আমিনা বেগম (সদর, যশোর) ও টিনু চাকমা (ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম)।
লটারিতে নির্বাচিত ১৮ জনের পদায়ন এক সপ্তাহের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী।
আইনমন্ত্রীর মতে, এ উদ্যোগের ফলাফল পরবর্তী সময়ে মূল্যায়ন করা হবে। বিশেষ করে পদায়নের এই পদ্ধতিতে দুর্নীতি কমছে কি না, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়ছে কি না এবং গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিংকে ঘিরে দীর্ঘদিনের অনিয়মের অভিযোগ কতটা কমছে এসব বিষয় পর্যবেক্ষণে রাখা হবে।