মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

গোলার আগুন এখনো সীমান্ত পেরোয়নি; কিন্তু তার অভিঘাত ও উত্তাপ ইতোমধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ার ঘরে ঘরে পৌঁছাতে শুরু করেছে। পশ্চিম এশিয়ার সঙ্ঘাতকে এত দিন দূরের এক ভূরাজনৈতিক অগ্নিগর্ভ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। ধারণা করা হয়েছিল, ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই মারমুখী অবস্থান আরব উপসাগর, লেভান্ত ও পারস্য উপসাগরের সীমানাতেই আবদ্ধ থাকবে। কিন্তু সেই ধারণা ক্রমেই পাল্টে যাচ্ছে। যুদ্ধের ক্ষেপণাস্ত্র বা গোলা এখনো দক্ষিণ এশিয়ায় আঘাত হানেনি; কিন্তু জ্বালানি সঙ্কট, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, বাণিজ্য স্থবিরতা, অভিবাসন ঝুঁকি, সীমান্ত উত্তেজনা ও কূটনৈতিক মেরুকরণের মাধ্যমে যুদ্ধের একটি প্রচ্ছন্ন ‘দ্বিতীয় ফ্রন্ট’ দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে বিস্তৃত হচ্ছে।
এখানে মূল প্রশ্ন তাই কেবল এটি নয় যে, যুদ্ধ কি দক্ষিণ এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে? বরং আরো গভীর প্রশ্ন হলো, দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল কি পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক ভুক্তভোগী অঞ্চলে পরিণত হতে যাচ্ছে? উত্তরে হয়তো এক কথায় ‘হ্যাঁ’ বলে দেয়া সমীচীন হবে না, তবে বিপদের লক্ষণ  স্পষ্ট।

Advertisement

হরমুজ এখন দক্ষিণ এশিয়ার জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন
এই সম্ভাব্য সঙ্কটের মূল কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের সবচেয়ে সংবেদনশীল এই ধমনি এখন চরম অনিশ্চয়তায়। প্রণালীটি সচল রাখা নিয়ে টানাপড়েন বাড়ছে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার জন্য চরম দুশ্চিন্তার কারণ। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের প্রতিটি অর্থনীতি আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেখা যাচ্ছে, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও ভারত পশ্চিম এশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে হরমুজ-সংক্রান্ত ঝুঁকি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ ভারত সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়েও এই যুদ্ধের অর্থনীতি ও সরবরাহ শৃঙ্খলের অপরিহার্য অংশ হয়ে পড়েছে।
পাকিস্তানের ঝুঁকি আরো মারাত্মক। দেশটির তেল ও গ্যাস আমদানির প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি সরাসরি হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণী সংস্থা ACLED-র তথ্য অনুযায়ী, এই প্রণালীতে সামান্যতম অস্থিতিশীলতাও পাকিস্তানে তীব্র জ্বালানি সঙ্কট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও চিত্রটি উদ্বেগের। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট আমদানিকৃত তেলের এক-পঞ্চমাংশের বেশি আসে হরমুজ প্রণালী দিয়ে। তদুপরি, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে অপরিশোধিত তেল আনার এটিই একমাত্র পথ। ফলত, হরমুজে অস্থিতিশীলতার প্রতিটি দিন দক্ষিণ এশিয়ায় মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার একেকটি নতুন ধাপ উন্মোচন করছে।

সাইরেন নয়, তেলের দামই যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র
আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে মারাত্মক অস্ত্র এখন আর কেবল ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন নয়; বরং তেলের বাজারে আকস্মিক দরপতন বা দরবৃদ্ধি।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই এই অর্থনৈতিক চাপের শিকার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে দেশের অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির ব্যয় বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ তার ব্যবহৃত পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-তৃতীয়াংশ আমদানি করে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এলএনজি (LNG) সরবরাহ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য, দেশের এলএনজি আমদানির প্রায় ৬৪ শতাংশ আসে কাতার থেকে এবং মধ্যপ্রাচ্যের জিসিসিভুক্ত (GCC) দেশগুলো বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪৬ শতাংশের উৎস।
ফলে পশ্চিম এশিয়ার এই সঙ্ঘাত বাংলাদেশের জন্য একই সাথে ট্রিপল-ঝুঁকি তৈরি করছে— জ্বালানি সঙ্কট, ডলার সঙ্কট এবং রেমিট্যান্স পতনের আশঙ্কা। একটি ক্ষেপণাস্ত্র ঢাকা বা চট্টগ্রামে না পড়েও কেবল জ্বালানি বাজারের অস্থিতিশীলতার মাধ্যমেই বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে।

জ্বালানি থেকে খাদ্য নিরাপত্তা : সার সঙ্কটের অশনিসঙ্কেত
জ্বালানি সঙ্কটের পরই যে বড় বিপর্যয়টি আছড়ে পড়ছে, তা হলো খাদ্য নিরাপত্তা।
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে সার সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটার উপক্রম হয়েছে। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) সতর্ক করে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা সার বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করে বিশ্বজুড়ে কৃষি উৎপাদন হুমকিতে ফেলবে।
বাংলাদেশ এর স্পষ্ট আলামত পেয়েছে। আমন ও বোরো মৌসুমের আগে ইউরিয়া সার পাওয়া নিয়ে কৃষক ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছিল। কারণ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার হলো বাংলাদেশের ইউরিয়া সারের প্রধান উৎস। সামুদ্রিক রুটগুলোতে যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়ায় আন্তর্জাতিক দরপত্রে সরবরাহকারীদের অনাগ্রহ দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব পাম্পের পেট্রল বা বিদ্যুৎ বিলে থেমে থাকবে না; তা সোজাসুজি চালের দাম, কৃষি উৎপাদন খরচ এবং দেশের নিম্নআয়ের মানুষের থালা পর্যন্ত পৌঁছাবে।

পাকিস্তান-আফগানিস্তান : পশ্চিম ও দক্ষিণ এশিয়ার বিপজ্জনক সেতু
পশ্চিম এশিয়ার সঙ্ঘাত দক্ষিণ এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার সবচেয়ে স্পর্শকাতর ভূরাজনৈতিক রুট হলো পাকিস্তান। ইরানের প্রতিবেশী হিসেবে পাকিস্তান একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে, অন্য দিকে আফগানিস্তানের সাথে তার নিজস্ব সীমান্তে রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাত তীব্র হচ্ছে। পাক-আফগান সীমান্তে সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপ, বিমান হামলা ও পাল্টাপাল্টি গোলাবর্ষণ পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে।
এখানে তিনটি ভিন্ন সঙ্ঘাতের বিপজ্জনক সংযোগ ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে :
১. ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার মূল সঙ্ঘাত,
২. পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত যুদ্ধ, এবং
৩. পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা।
পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশটির পশ্চিম সীমান্তে অস্থিতিশীলতা বাড়লে সামরিক বাহিনীর শক্তি ও মনোযোগ বিভক্ত হয়ে পড়বে। একই সময়ে ভারত-পাকিস্তান ঐতিহাসিক বৈরিতা, কাশ্মির সঙ্কট কিংবা সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে স্নায়ুযুদ্ধ বহাল রয়েছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন কোনো আঞ্চলিক সঙ্কট তৈরি হলে তা আর বিচ্ছিন্ন দ্বিপক্ষীয় বিষয় থাকবে না, তা সরাসরি পশ্চিম এশিয়ার বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক দাবাখেলার সাথে যুক্ত হয়ে যাবে।

ভারতের জটিল ভারসাম্য ও কৌশলগত দ্বিধা
এই বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সঙ্কটে ভারত সবচেয়ে জটিল সমীকরণের মুখোমুখি। একদিকে ওয়াশিংটনের সাথে দিল্লির কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব এখন নতুন উচ্চতায়। অন্য দিকে ইরান ভারতের ঐতিহাসিক বন্ধু এবং মধ্য এশিয়ায় প্রবেশের ক্ষেত্রে ‘চাবাহার বন্দর’ দিল্লির অন্যতম প্রধান কৌশলগত প্রকল্প। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত চাবাহার বন্দর এবং ভারত-ইরান যৌথ কানেক্টিভিটি পরিকল্পনাকে চরম অনিশ্চিত করে তুলেছে। 
ভারতকে একই সাথে কয়েকটি বিপরীতমুখী উপাদান সামলাতে হচ্ছে : রাশিয়ার কাছ থেকে ছাড়কৃত মূল্যে অপরিশোধিত তেল কেনা, আরব উপসাগরের জ্বালানি নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা, ইরানের সাথে চাবাহার প্রকল্প টিকিয়ে রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দোপ্যাসিফিক কৌশলগত জোটে ভারসাম্য রাখা। দিল্লির কাছে এখন প্রশ্নটি কেবল ‘কার পক্ষে অবস্থান নেবে’ তা নয়; বরং কিভাবে এই বহুমুখী ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে নিজের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা অক্ষত রাখবে।

বার্মা ফ্রন্ট ও বঙ্গোপসাগরের নতুন সমীকরণ
পশ্চিমের সঙ্ঘাতের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার পূর্ব সীমান্তে আরেকটি গুরুতর সঙ্কট ঘনীভূত হচ্ছে— যা ‘বার্মা ফ্রন্ট’ নামে পরিচিত। এটি এখন আর মিয়ানমার সামরিক জান্তার ভেতরের গৃহযুদ্ধ বা সীমান্ত গোলযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (AA) রাখাইন রাজ্যের প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কার্যত একটি সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। গবেষণাপত্র ও পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, রাখাইনের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টিরও বেশি এখন আরাকান আর্মির হাতে, যার ভৌগোলিক অবস্থান সরাসরি বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেঁষে।
একই সাথে ভারতের উচ্চাভিলাষী কালাদান মাল্টিমোডাল প্রকল্প এবং চীনের গভীর সমুদ্রবন্দর ও গ্যাস পাইপলাইনের মতো মেগা-অবকাঠামোও এই বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে গেছে। ফলে পশ্চিমের ইরান-হরমুজ-পাকিস্তান অক্ষের মতো পূর্বে মিয়ানমার-রাখাইন-বঙ্গোপসাগর অঞ্চল ভূরাজনীতিতে সমান্তরাল গুরুত্ব ধারণ করছে।

বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তে নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতা
বাংলাদেশের জন্য রাখাইনের পরিস্থিতি একটি মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। মিয়ানমার নামক সার্বভৌম রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী বা বিজিপি ছিল, যাদের সাথে কূটনৈতিকভাবে আলোচনার সুযোগ থাকত। এখন সীমান্তের ওপারে অবস্থান করছে এক শক্তিশালী অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী (Non-state armed actor)।
এর ফলে বাংলাদেশের প্রচলিত ‘নেপিডোকেন্দ্রিক’ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কৌশল কার্যকারিতা হারাচ্ছে। মিয়ানমার সীমান্ত থেকে বারবার আকাশসীমা লঙ্ঘন ও গোলাবর্ষণের ঘটনায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। সীমান্তে কার্যকর ‘রেড লাইন’ ও প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
দ্বিতীয় বড় বিপদ হলো, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সাথে আরাকান আর্মির সংঘর্ষ। উত্তর মংডুসহ সীমান্ত এলাকায় আরাকান আর্মি এবং আরএসওর মতো বিভিন্ন সশস্ত্র দলের মধ্যে সঙ্ঘাতের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক এক চক্র তৈরি করছে :
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির>সশস্ত্র দলে রিক্রুটমেন্ট>সীমান্তে অনুপ্রবেশ ও লড়াই>আরাকান আর্মির পাল্টা সামরিক অভিযান>সীমান্ত অস্থিতিশীলতা>নতুন করে মানবিক ও শরণার্থী বিপর্যয়।
এই চক্র সামাল দেয়া না গেলে কক্সবাজারের শরণার্থী আশ্রয়কেন্দ্রগুলো কেবল মানবিক সঙ্কটের স্থান থাকবে না, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের কাছে এটি একটি আঞ্চলিক ‘কনফ্লিক্ট ইকোসিস্টেম’ (Conflict Ecosystem) হিসেবে চিহ্নিত হবে।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে মিয়ানমার জান্তার বিমান হামলা। রাখাইনে জান্তার বিমান হামলায় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটছে। এই হামলাগুলো দূরবর্তী টাউনশিপে হলেও সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় গোলা, ড্রোন বা পালিয়ে আসা বাস্তুচ্যুত মানুষের চাপ বাড়ছে। 

চীন ও ভারতের ভূরাজনৈতিক চাল এবং বঙ্গোপসাগর
রাখাইন তথা বার্মা ফ্রন্টের বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে সরাসরি যুক্ত রয়েছে এশিয়ার দুই পরাশক্তি চীন ও ভারত। বেইজিংয়ের কাছে রাখাইনের কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর এবং পাইপলাইন বঙ্গোপসাগরে সরাসরি প্রবেশের প্রধান পথ। অন্য দিকে দিল্লির কাছে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর সাগরে প্রবেশের মাধ্যম হলো কালাদান প্রকল্প। প্রকল্পগুলো আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রিত এলাকার মধ্য দিয়ে বিস্তৃত, তাই দিল্লি ও বেইজিং— দুই পক্ষকেই বাধ্য হয়ে এই অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর সাথে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ বা সমীকরণ গড়ে তুলতে হচ্ছে।
ঠিক এই জায়গাতেই পশ্চিম এশিয়ার সঙ্ঘাতের সাথে মিয়ানমার ফ্রন্টের একটি প্রচ্ছন্ন কৌশলগত যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে :
১. সামুদ্রিক নিরাপত্তা : হরমুজ প্রণালী ঝুঁকিপূর্ণ হলে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরের বিকল্প সামুদ্রিক পথ, বন্দর ও সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যাবে।
২. ভারতের মনোযোগ বণ্টন : দিল্লিকে যদি একই সাথে পশ্চিমে পাকিস্তান-ইরান সঙ্কট এবং পূর্বে মিয়ানমার-রাখাইন সঙ্ঘাত সামলাতে হয়, তবে দেশটির সামরিক ও কূটনৈতিক মনোযোগ দ্বিমুখী চাপে পড়বে।
৩. চীনের প্রভাব বিস্তার : মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের সামরিক মনোযোগ বৃদ্ধি পেলে, চীন তার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরীয় করিডোরে নিজের অবস্থান আরো শক্ত করার চেষ্টা করবে।

‘দুই ফ্রন্টের দেশ’ বাংলাদেশ ও দূরদর্শী কূটনীতির তাগিদ
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এখন এক অদ্ভুত ঐতিহাসিক সংযোগস্থলে। পশ্চিমে ভারত, পূর্বে অশান্ত মিয়ানমার এবং দক্ষিণে কৌশলগত বঙ্গোপসাগর।
পশ্চিম এশিয়ার দীর্ঘায়িত যুদ্ধ যদি তেলের বাজার ও রেমিট্যান্সে ধস নামায়, আর পূর্বে যদি রাখাইন সঙ্কট আরো ঘনীভূত হয়, তবে বাংলাদেশ কার্যত একটি ‘দ্বিমুখী নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চাপের’ (Two-front challenge) মধ্যে পড়বে। পশ্চিম থেকে : জ্বালানি সঙ্কট, রেমিট্যান্সের ধাক্কা, বাণিজ্যে মন্দা ও খাদ্য মূল্যস্ফীতি। পূর্ব থেকে : রোহিঙ্গা সঙ্কট, সীমান্ত সংঘর্ষ, অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর উত্থান, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ঘটনা ঘটার পর প্রতিক্রিয়া জানানো (Reactive nation)। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তার সংজ্ঞা শুধু সীমান্ত পাহারা দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আজ হরমুজের ঘটনাই টেকনাফের বাজারে চালের দাম নির্ধারণ করে, আবার রাখাইনের গোলাগুলি আমাদের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিতে ফেলে।
আজকের বাস্তবতায় বাংলাদেশকে তার নিরাপত্তা মানচিত্র নতুন করে আঁকতে হবে। হরমুজ প্রণালী, পারস্য উপসাগর, পাকিস্তান, ভারত মহাসাগর, বঙ্গোপসাগর এবং রাখাইন— এই পুরো অঞ্চলকে একটি সমন্বিত ‘নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক শৃঙ্খল’ হিসেবে বিবেচনা করে জাতীয় কৌশল প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। জ্বালানি মজুদ বৃদ্ধি, খাদ্যশস্যের বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষা এবং সক্রিয় ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিই বাংলাদেশকে ভবিষ্যতের যেকোনো ভূরাজনৈতিক ঝড় থেকে রক্ষা করতে পারে।
যুদ্ধ হয়তো এখনো সীমান্ত অতিক্রম করেনি; কিন্তু যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ছায়া ইতোমধ্যেই আমাদের দরজায়। এখন দেখার বিষয়, এই সম্ভাব্য বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুতি নিতে পারে। 
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
mrkmmb@gmail.com