ময়মনসিংহের সড়কে ২১ মাসে নিহত ৩৭০ নেপথ্যে বেপরোয়া গতি ও আঁকাবাঁকা পথ

 মো: সাজ্জাতুল ইসলাম ময়মনসিংহ অফিস

Advertisement

ময়মনসিংহের সড়ক-মহাসড়কে যেন থামছেই না মৃত্যুর মিছিল। প্রশস্ত হচ্ছে সড়ক, বাড়ছে অবকাঠামোগত উন্নয়ন; কিন্তু কমছে না দুর্ঘটনা। বরং বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, চালকের অসতর্কতা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বিপজ্জনক বাঁক এবং মহাসড়কে নিষিদ্ধ থ্রি-হুইলারের অবাধ চলাচলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে প্রাণহানি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২১ মাসে ময়মনসিংহের সড়ক-মহাসড়কে ৩৭৪টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩৭০ জন। গুরুতর আহত হয়েছেন আরো ৪১০ জন। শুধু ২০২৬ সালের প্রথম ৯ মাসেই ১৫০টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৫১ জন, আহত ১৪২ জন। অর্থাৎ চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে গড়ে প্রায় প্রতি দুই দিনে একজন মানুষের প্রাণ গেছে সড়ক দুর্ঘটনায়। পরিসংখ্যানের এই ভয়াবহ চিত্রের মধ্যেই প্রশ্ন উঠছে-সড়ক নিরাপত্তায় এত উদ্যোগের পরও কেন থামছে না প্রাণহানি?
চার লেনেও নিরাপদ নয় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত হওয়ার পর যান চলাচলের সক্ষমতা বেড়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনার ঝুঁকি প্রত্যাশিতভাবে কমেনি। বরং স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশস্ত ও তুলনামূলক ভালো সড়ক পেয়ে অনেক যানবাহন অতিরিক্ত গতিতে চলাচল করছে। বিআরটিএর হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ত্রিশাল ও ভালুকা অংশে ৭০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর বড় কারণ হিসেবে অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং উল্টো পথে যান চলাচলের কথা বলছেন স্থানীয়রা।
ত্রিশালের বৈলর গ্রামের বাসিন্দা স্বপন মিয়া বলেন,  অনেক চালক বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালান। চালকের পাশে ডানে-বাঁয়ে যাত্রী বসানো, উল্টো পথে চলাচল এবং প্রতিযোগিতা করে ওভারটেকিংও দেখা যায়। পুলিশ ও সংশ্লিষ্টরা কঠোর হলে এসব অনিয়ম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ফুলপুর-তারাকান্দায় ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক
ময়মনসিংহ-হালুয়াঘাট আঞ্চলিক সড়কেও দুর্ঘটনার চিত্র উদ্বেগজনক। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ফুলপুর ও তারাকান্দা উপজেলা অংশে ৮০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
সম্প্রতি ওই সড়কের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলোতে সড়ক ও জনপথ বিভাগের সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড রয়েছে। তবে একাধিক ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক এখনো রয়ে গেছে। তারাকান্দার কাকনি ইউনিয়নের বাগুন্দা এলাকার বাঁকটি এর অন্যতম।
স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, ওই বাঁকে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। কিন্তু অনেক চালক দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানোর পাশাপাশি ঝুঁকি নিয়ে ওভারটেক করেন। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।
নিষেধাজ্ঞা কাগজে, মহাসড়কে থ্রি-হুইলারের দাপট
জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ময়মনসিংহের বিভিন্ন সড়কে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। প্রকাশ্যেই চলছে অটোরিকশা, ইজিবাইকসহ বিভিন্ন ধীরগতির যান। ফলে এক দিকে দ্রুতগতির বাস-ট্রাক, অন্য দিকে ধীরগতির থ্রি-হুইলার-দুই ধরনের যান একই সড়কে চলাচল করায় সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যাপ্ত লোকাল পরিবহন না থাকায় অনেক যাত্রীও বাধ্য হয়ে এসব যান ব্যবহার করছেন। নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের ময়মনসিংহের সভাপতি আবদুল কাদির চৌধুরী বলেন, জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে থ্রি-হুইলার নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না। অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, বিপজ্জনক বাঁক ও ট্রাফিক আইন না মানার সাথে থ্রি-হুইলারের অবাধ চলাচল যুক্ত হয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
৩৭০ মৃত্যু-তবু কি শিক্ষা হয়নি?
২১ মাসে ৩৭০ প্রাণহানি নিছক কোনো পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, স্বজন হারানোর দীর্ঘশ্বাস এবং একটি পরিবারের আর্থিক-সামাজিক বিপর্যয়। অথচ দুর্ঘটনার কারণগুলো চিহ্নিত হওয়ার পরও সেগুলো প্রতিরোধে কার্যকর ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী খ. মো: শরীফুল আলম বলেন, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে গতিসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু অনেক চালক তা মানেন না। সড়ক ভালো হওয়ায় চালকরা অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালান।
ফায়ার সার্ভিস ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী বলেন, বেপরোয়া গতি, মহাসড়কে কম গতির যান চলাচল, সড়কের পাশে অকেজো যানবাহন রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। থ্রি-হুইলারও অনেক সময় ট্রাফিক নিয়ম না মানায় ঝুঁকি বাড়ছে। বিআরটিএর সহকারী পরিচালক আনিছুর রহমান বলেন, চালকদের অসতর্কতা ও বেপরোয়া গতির কারণে অনেক দুর্ঘটনা ঘটছে। দ্রুতগতির যানবাহনের পাশাপাশি মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল করলে ঝুঁকি আরো বেড়ে যায়।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, দুর্ঘটনার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বেপরোয়া গতি, চালকের অদক্ষতা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, সড়কের ত্রুটি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং ট্রাফিক আইন অমান্য-সবই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী হতে পারে। তিনি বলেন, বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, চালকদের প্রশিক্ষণ, সড়কের ত্রুটি সংশোধন এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
রাজিব পরিবহন নিয়ে ক্ষোভ
ময়মনসিংহের পাশাপাশি জামালপুর থেকে ঢাকায় চলাচলকারী রাজিব পরিবহনের বাস নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির বাসগুলো অতিরিক্ত গতিতে ও বেপরোয়া চলাচল করে। যত্রতত্র বাস থামানো, চালকদের দায়িত্বহীনতা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও যাত্রীদের সাথে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। সর্বশেষ ময়মনসিংহ নগরে রাজিব পরিবহনের বাসের সাথে ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর ক্ষোভ আরো প্রকাশ্য রূপ নেয়। জামালপুর শহরের ফৌজদারি এলাকায় রাজিব পরিবহনের ‘গায়েবানা জানাজা’ ও প্রতীকী লাশ নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন স্থানীয়রা। স্থানীয়দের অভিযোগ, জামালপুরের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে রাজিব পরিবহনের একক আধিপত্য রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ অনেক পথে অন্য পরিবহনের বাস চলাচলের সুযোগ সীমিত হওয়ায় যাত্রীদের বিকল্পও কম। ফলে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ থাকলেও কার্যকর প্রতিকার মিলছে না।
উন্নয়ন আছে, নিরাপত্তা কোথায়?
ময়মনসিংহ নগরের শম্ভুগঞ্জ থেকে ফুলপুর পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার সড়ক ৩৪ ফুট প্রশস্ত। ফুলপুর থেকে হালুয়াঘাট পর্যন্ত প্রায় ১৮ কিলোমিটার সড়ক ১৮ ফুট প্রশস্ত। এ সড়ক দিয়ে হালুয়াঘাট, ফুলপুর, তারাকান্দা, ধোবাউড়া ও শেরপুরের বিভিন্ন এলাকার যানবাহন চলাচল করে। সড়ক তুলনামূলক ভালো হওয়ায় অনেক চালক নির্ধারিত গতিসীমার চেয়ে বেশি গতিতে গাড়ি চালান বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। ফলে সরু অংশ ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু সড়ক প্রশস্ত করলেই নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত হবে না। প্রয়োজন কার্যকর গতিনিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ট্রাফিক নজরদারি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন উচ্ছেদ, প্রশিক্ষিত চালক, মহাসড়ক থেকে নিষিদ্ধ যান সরানো এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোতে বিজ্ঞানভিত্তিক নিরাপত্তাব্যবস্থা।