
শেরপুর (বগুড়া) সংবাদদাতা
অভাব-অনটনের সংসারে একটু সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্নে ভিটামাটি বিক্রি করে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন রফিকুল ইসলাম (৪৫)। কিন্তু ভাগ্যের চাকা ঘোরা তো দূরের কথা, প্রতারক দালালের খপ্পরে পড়ে একে একে হারিয়েছেন শেষ সম্বলটুকু। শেষ পর্যন্ত বিদেশে নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে দেশে ফিরতে টিকিট কেটেছিলেন। কিন্তু ফিরলেন লাশ হয়ে। গতকাল সকাল ৯টায় যখন রফিকুলের লাশ জন্মমাটি বগুড়ার শেরপুর উপজেলার খামারকান্দি ফারাজী পাড়া গ্রামে এসে পৌঁছায়, তখন কান্নায় পুরো এলাকার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। রেখে যাওয়া এক ছেলে, এক মেয়েকে নিয়ে এখন অথৈ সাগরে পড়েছেন স্ত্রী-স্বপ্না খাতুন। মৃত রফিকুল ইসলাম খামারকান্দি ইউনিয়নের ফারাজী পাড়া গ্রামের মৃত ইউসুফ আলীর ছেলে।
নিহতের ছেলে শাহরিয়ার নাফিসসহ পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সংসারের দারিদ্র্য ঘোরাতে জমি বিক্রি ও চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রফিকুল। একই গ্রামের দালাল নাসিমা খাতুন, তার স্বামী সাইফুল ইসলাম, মেয়ে সোনিয়া আক্তার ও মেয়ের জামাই মুসা তাকে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখান। তবে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর পর রফিকুল জানতে পারেন, তাকে আকামা বা ওয়ার্ক পারমিট নয়, বরং তিন মাসের ট্যুরিস্ট ভিসায় পাঠানো হয়েছে।
ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর রফিকুল মালয়েশিয়ায় পুলিশের ভয়ে দিনের পর দিন পালিয়ে বেড়াতে থাকেন। এ বিষয়ে অভিযুক্ত দালাল নাসিমা খাতুন ও তার জামাই মুসার সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা চাকরি দেয়ার কথা বলে রফিকুলের পরিবারের কাছ থেকে আরো এক লাখ ২০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়।
টাকা নেয়ার পরও রফিকুলকে কোনো চাকরি দেয়া হয়নি। উল্টো তার পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কেড়ে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। দিনের পর দিন এই অমানবিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে দেশে ফেরার জন্য কেটেছিলেন বিমানের টিকিট। এ জন্য ধার-দেনা করে টাকা সংগ্রহ করে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হলে তিনি দেশে ফেরার জন্য বিমানের টিকিট কেটেছিলেন। ১৮ সেপ্টেম্বর তার দেশে ফেরার কথা ছিল, কিন্তু গত ১৭ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ায় ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে তাকে দেশটির ঝঁহমধর ইঁষড়য ঐড়ংঢ়রঃধষ-এ ভর্তি করা হয়। ২১ সেপ্টেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মালয়েশিয়াতেই মারা যান রফিকুল ইসলাম।
শুক্রবার সকালে রফিকুলের লাশ গ্রামে পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়লে অভিযুক্ত দালাল পরিবার বাড়ি তালাবদ্ধ করে পালিয়ে যায়।
রফিকুলের স্ত্রী স্বপ্না খাতুন বলেন, আমগোর শেষ সম্বল জমিটুকু বেইচা আর ঋণ কইরা টাকা দিছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমার জামাইটারে দালালরা মিছা কথা বইলা নিয়া মাইরা ফেললো। এখন আমি এই দুইডা এতিম ছাওয়াল-মিয়া নিয়া কোনহানে দাঁড়ামু?
এ বিষয়ে স্থানীয়দের ক্ষোভ তুঙ্গে। তারা অবিলম্বে অভিযুক্ত প্রতারক চক্র নাসিমা খাতুন, সাইফুল ইসলাম, সোনিয়া ও মুসাকে দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্তদের বাড়িতে গেলে সাংবাদিকের সাথে কথা বলতে রাজি হয়নি কেউ। শেরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ এস এম মঈনুদ্দীন বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








