
শাহ আলম নূর
দেশের লুব্রিকেন্টের বাজার বাড়ছে, কিন্তু সেই বাড়তি বাজারের সুবিধা নিতে পারছে না শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি এমজেএল বাংলাদেশ পিএলসি; বরং সাম্প্রতিক আর্থিক ফলাফলে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে- বাজারের আকার বাড়লেও কোম্পানিটির বিক্রি ও মুনাফা কমেছে। মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় চাপ এবং অপেক্ষাকৃত কম দামের লুব্রিকেন্টের দিকে ক্রেতাদের ঝুঁকে পড়ায় এমজেএলের উচ্চমূল্যের পণ্যের চাহিদায় টান পড়েছে। একই সাথে দেশী-বিদেশী ব্র্যান্ডের প্রতিযোগিতা এবং শিল্প খাতে দুর্বল চাহিদাও কোম্পানিটির ব্যবসায় চাপ তৈরি করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন পরিস্থিতি সাময়িক নাকি বাজারকাঠামোয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত; তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ বাংলাদেশের লুব্রিকেন্টের বাজার আগামী কয়েক বছরেও বাড়বে বলে পূর্বাভাস রয়েছে; অথচ এই বাজারে এমজেএলের সর্বশেষ আর্থিক ফল বলছে, কোম্পানিটি সেই প্রবৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে এমজেএলের সমন্বিত রাজস্ব কমেছে প্রায় ৮ শতাংশ। জুলাই ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ সময়ে কোম্পানিটির রাজস্ব দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ১৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল তিন হাজার ২৬৩ কোটি টাকা। একই সময়ে নিট মুনাফা ২৫৬ কোটি ২১ লাখ টাকা থেকে কমে হয়েছে ১৮৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা; অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা কমেছে প্রায় ৬৯ কোটি টাকা বা ২৭ শতাংশ। শেয়ারপ্রতি আয়ও ৮ টাকা ৯ পয়সা থেকে কমে হয়েছে ৫ টাকা ৯১ পয়সা।
এর আগে জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে এমজেএলের সমন্বিত রাজস্ব ১৭ দশমিক ৫২ শতাংশ কমে দুই হাজার ১৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকায় নেমে আসে। ওই সময়ে নিট মুনাফা কমে দাঁড়ায় ১০০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২১৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা; অর্থাৎ মাত্র ছয় মাসে মুনাফা কমেছিল ৫৩ দশমিক ৬১ শতাংশ।
কোম্পানির নিজস্ব ব্যাখ্যায়ও বাজারের এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে। এমজেএলের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক চাপে ক্রেতারা ব্যয় কমাচ্ছেন এবং কম দামের পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন। এমজেএলের পণ্য তুলনামূলকভাবে উচ্চমানের হওয়ায় দামও কিছুটা বেশি। ফলে ক্রয়ক্ষমতার চাপে থাকা ক্রেতাদের একটি অংশ সস্তা বিকল্প বেছে নিচ্ছেন। এতে উচ্চমূল্যের ও বেশি মুনাফার পণ্যের বিক্রি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এখানেই এমজেএলের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। কারণ লুব্রিকেন্ট এমন একটি পণ্য, যেখানে ব্র্যান্ড ও মান গুরুত্বপূর্ণ হলেও মূল্য এখন ক্রেতার সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখছে। ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল, পরিবহন ব্যবসা থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা- সবখানেই পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। জ্বালানি, যন্ত্রাংশ, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহন ব্যয়ের চাপ সামলাতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা অনেক ক্ষেত্রেই রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছেন। এর প্রভাব পড়ছে লুব্রিকেন্টের বাজারেও।
অন্য দিকে দেশের লুব্রিকেন্টের বাজার কিন্তু সঙ্কুচিত হচ্ছে না। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান মর্ডর ইন্টেলিজেন্সের হিসাবে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের লুব্রিকেন্টের বাজারের আকার ছিল প্রায় ২১ কোটি ৮৭ লাখ লিটার। ২০২৬ সালে তা বেড়ে ২২ কোটি ৪৫ লাখ লিটারে দাঁড়াতে পারে। ২০৩১ সালে বাজারের আকার ২৫ কোটি ৫৮ লাখ লিটারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে; অর্থাৎ আগামী পাঁচ বছরেও বাজারে গড়ে প্রায় ২ দশমিক ৬৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমজেএল দীর্ঘদিন ধরে দেশের লুব্রিকেন্ট বাজারে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। ‘মোবিল’ ব্র্যান্ডের পরিচিতি, মান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং বিস্তৃত বিতরণব্যবস্থা কোম্পানিটির বড় শক্তি। কিন্তু বাজারে এখন একাধিক দেশী ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড সক্রিয়। একই সাথে কম দামের পণ্যের উপস্থিতিও বেড়েছে। ফলে বাজারের যে অংশটি আগে বড় ব্র্যান্ডগুলোর হাতে ছিল, সেখানে প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে।
তারা বলছেন, এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কম দামের পণ্য শুধু নিম্নআয়ের ক্রেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোরও পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। ফলে বড় বহর পরিচালনাকারী পরিবহন কোম্পানি, কারখানা কিংবা ছোট ব্যবসায়ী- অনেকেই লুব্রিকেন্ট কেনার সময় ব্র্যান্ডের পাশাপাশি দামের হিসাব করছেন। বড় পরিমাণে ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতি লিটারে সামান্য দামের পার্থক্যও মোট ব্যয়ে বড় পার্থক্য তৈরি করে।
শিল্প খাতের দুর্বলতাও এমজেএলের জন্য বড় সমস্যা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানির সমন্বিত রাজস্ব ২১ শতাংশ কমে ৯৮৯ কোটি টাকায় নেমেছিল এবং নিট মুনাফা কমেছিল ১৫ শতাংশ। কোম্পানির কর্মকর্তারা তখন বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্প খাতে লুব্রিকেন্টের দুর্বল চাহিদাকে ব্যবসায়িক ফল খারাপ হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
তথ্যে দেখা যায়, জানুয়ারি-মার্চ সময়ে কোম্পানিটির রাজস্ব এক হাজার ১৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এবং নিট মুনাফা ৬৫ কোটি দুই লাখ টাকা হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে এ সময়ে রাজস্ব ও মুনাফা বেড়েছে। ফলে কোম্পানির ব্যবসা পুরোপুরি সঙ্কটে পড়ে গেছে- এমন সিদ্ধান্ত এখনই টানা যায় না; বরং প্রথম ছয় মাসের ধাক্কার পর তৃতীয় প্রান্তিকে কিছুটা পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা গেছে।
তবে ৯ মাসের সামগ্রিক হিসাব উদ্বেগজনক। কারণ ৯ মাসে বিক্রি কমেছে, রাজস্ব কমেছে এবং মুনাফা এক-চতুর্থাংশের বেশি কমেছে; অর্থাৎ তৃতীয় প্রান্তিকের উন্নতি এখনো আগের দুই প্রান্তিকের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারেনি। এর সাথে যুক্ত হয়েছে করব্যবস্থার পরিবর্তন। কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ন্যূনতম করের হার শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১ শতাংশ হয়েছে। পাশাপাশি তেলবাহী জাহাজ ব্যবসার একটি কর-সুবিধা প্রত্যাহারের প্রভাবও পড়েছে। ফলে রাজস্ব কমার পাশাপাশি করের চাপ বেড়ে যাওয়ায় নিট মুনাফায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে করের চাপকে পুরো পরিস্থিতির দায় দেয়া যাবে না; কারণ কর পরিবর্তনের আগেই কোম্পানির বিক্রিতে দুর্বলতা দেখা দিয়েছিল। ছয় মাসের ফলাফলে ক্রেতাদের সস্তা পণ্যের দিকে সরে যাওয়ার বিষয়টি কোম্পানি নিজেই স্বীকার করেছে। ফলে বাজার হারানোর প্রশ্নটি কেবল কর বা সাময়িক অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভোক্তার পছন্দে পরিবর্তন ঘটছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটির রাজস্ব প্রায় চার হাজার ১৭৯ কোটি টাকা এবং নিট মুনাফা প্রায় ৩৬০ কোটি টাকা ছিল। ওই বছর শেয়ারপ্রতি আয় ১১ টাকা ৩৬ পয়সায় পৌঁছেছিল; অর্থাৎ মাত্র এক বছর আগেও কোম্পানি শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির অবস্থানে ছিল। এ কারণে বর্তমান পরিস্থিতিকে বাজার নেতৃত্ব হারানোর চূড়ান্ত প্রমাণের চেয়ে বরং একটি সতর্ক সঙ্কেত হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত। কিন্তু সতর্ক সঙ্কেতটি হালকা নয়। কারণ বাজারের মোট আকার বাড়ার মধ্যেই যদি একটি শীর্ষ কোম্পানির বিক্রি কমে, তাহলে ধরে নিতে হয় বাজারের প্রবৃদ্ধির একটি অংশ অন্য প্রতিযোগীদের হাতে যাচ্ছে।
এমজেএলের কর্মকর্তারা বলছেন, এমজেএলের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ‘মানসম্মত কিন্তু বেশি দামের পণ্য’- এই অবস্থান থেকে বের হয়ে বাজারের বিভিন্ন স্তরের ক্রেতার জন্য কার্যকর মূল্য কৌশল তৈরি করা। একই সাথে নকল ও নিম্নমানের লুব্রিকেন্টের বিরুদ্ধে বাজার তদারকি জোরদার করাও জরুরি। কারণ বৈধ ও মানসম্মত পণ্য যদি কর ও আনুষ্ঠানিক ব্যবসার কারণে বেশি দামে বিক্রি হয়, অথচ নিম্নমানের পণ্য কম দামে বাজার দখল করে, তাহলে বড় ব্র্যান্ডগুলো দীর্ঘমেয়াদে চাপের মুখে পড়বে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








