বাংলাদেশের প্রথম কমিউনিটিভিত্তিক এগ্রো টুরিজম প্রকল্প ‘সুখের খামার এগ্রো ভিলেজ, বগুড়া’-এর নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন
বাংলাদেশের প্রথম কমিউনিটিভিত্তিক এগ্রো টুরিজম প্রকল্প ‘সুখের খামার এগ্রো ভিলেজ, বগুড়া’-এর নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। সংগৃহীত

বাংলাদেশের প্রথম কমিউনিটিভিত্তিক এগ্রো টুরিজম প্রকল্প ‘সুখের খামার এগ্রো ভিলেজ, বগুড়া’-এর নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

Advertisement

শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে বগুড়ার কাহালু উপজেলার বাগইল গ্রামে বাঁকাদিঘীর পাড় এলাকায় প্রকল্পের নির্ধারিত স্থানে এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটির উদ্বোধন করা হয়। 

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, বগুড়ার মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো: আব্দুল মজিদ প্রামানিক। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কাহালু উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোছা: মনিয়া খানম, কাহালু থানার অফিসার ইনচার্জ মো: শফিকুল ইসলাম, উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা: মো: আব্দুল মালেক এবং উপজেলা কৃষি অফিসার মোছা: জান্নাতুল ফেরদৌস।

অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন সুখের খামার এগ্রো লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো: তাসদীখ হাবীব এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক জোবায়ের ইসলাম। এছাড়া স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, প্রকল্পের সম্মানিত শেয়ারহোল্ডার, শুভাকাঙ্ক্ষী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে প্রকল্পের লক্ষ্য ও সম্ভাবনা তুলে ধরে সুখের খামার এগ্রো লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো: তাসদীখ হাবীব বলেন, ‘বাংলাদেশের কৃষি খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা। এগ্রো ট্যুরিজম এ ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। এখানে কৃষক শুধু ফসল বিক্রি করেন না, বরং কৃষির সাথে সম্পৃক্ত অভিজ্ঞতাকেও পর্যটকদের কাছে তুলে ধরতে পারেন। স্মার্ট কৃষিই হতে পারে বাংলাদেশের কৃষি খাতের পরবর্তী অগ্রযাত্রার অন্যতম ভিত্তি, আর ‘সুখের খামার’ সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার একটি উদ্যোগ।’

প্রকল্পের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে ব্যবস্থাপনা পরিচালক জোবায়ের ইসলাম বলেন, ‘এক বছর আগে আমরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, আজ তার বাস্তব প্রতিফলন তুলে ধরছি। খামারের কার্যক্রম চলছে, ইতোমধ্যে দুই হাজারের বেশি অতিথি ঘুরে গেছেন এবং আমাদের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে একটি গ্রামে এক কোটি টাকার নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হয়েছে। আমরা মাটি থেকে শুধু ফসল নয়, ভবিষ্যৎও ফলাতে চাই। ‘সুখের খামার এগ্রো ভিলেজ’-এর পরিকল্পনা সেই ভবিষ্যতেরই একটি প্রতিচ্ছবি। গ্রামীণ পর্যটনের প্রসারেও প্রকল্পটি ভূমিকা রাখতে পারে।’

উল্লেখ্য, চলতি বছরের গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (ICCB) ত্রয়োদশ Asian Tourism Fair 2026-এর মঞ্চে সুখের খামার এগ্রো লিমিটেড-এর পরিকল্পিত নকশা উন্মোচন করা হয়। অনুষ্ঠানে দেড় শতাধিক অংশীদারের হাতে দলিলও বুঝিয়ে দেয়া হয়।

সুখের খামারের উন্মোচিত এই নকশায় রয়েছে ১০০ রুমের এগ্রো রিসোর্টে রেস্টুরেন্ট, কনভেনশন হল, সুইমিং পুল, বোটিং সুবিধাসহ নানান সুবিধা। রিসোর্টের পাশেই একই আঙিনায় থাকছে সমন্বিত কৃষি খামার, ৪০০ গরুর খামার, বটম ক্লিন পদ্ধতির মাছের খামার, ছাগল ও দুম্বার খামার, ১ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস প্লান্ট এবং একটি জামে মসজিদ ও হাফিজিয়া এতিমখানা মাদরাসা। প্রকল্পের মাটি ভরাট ও সড়ক নির্মাণ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং চলতি অক্টোবর মাস থেকে পুরোদমে নির্মাণকাজ শুরু হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রকল্পের নির্ধারিত স্থানে এ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা। 

প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে শরীয়াহভিত্তিক মুশারাকা মডেলে। ইতোমধ্যে ২১টি দেশ ও ৪২টি জেলার এক হাজারের বেশি মানুষ প্রকল্পটির অংশীদার হয়েছেন এবং প্রত্যেক অংশীদারের নামে জমি রেজিস্ট্রেশন করে ২৫ জুলাই ২০২৬ ফাউন্ডার নাইট নামের এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই দলিল হস্তান্তর করা হয়।  

এগ্রো টুরিজম : বিশ্ববাজার ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা

এগ্রো টুরিজম বা কৃষি পর্যটন হলো এমন পর্যটন, যেখানে দর্শনার্থীরা খামারে থাকেন, ফসল তোলা বা পশুপালনে অংশ নেন এবং গ্রামীণ জীবন অভিজ্ঞতা হিসেবে উপভোগ করেন। ইতালি, জাপান, থাইল্যান্ড ও ভারতের কেরালায় এটি এখন প্রতিষ্ঠিত শিল্প।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান IMARC Group-এর হিসাবে বৈশ্বিক এগ্রো টুরিজম বাজারের আকার ২০২৫ সালে ছিল ৮১ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা বছরে প্রায় ১১ শতাংশ হারে বেড়ে ২০৩৪ সালে ২০৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।

ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড টুরিজম কাউন্সিলের (WTTC) হিসাবে বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ২০২৩ সালে ছিল প্রায় এক লাখ দুই হাজার কোটি টাকা।

প্রতিবেশী ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে জিডিপিতে পর্যটনের অবদান পাঁচ থেকে ছয় শতাংশ, যেখানে বাংলাদেশে তা এখনো অনেক কম। সরকার এই অবদান ছয় থেকে সাত শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। 
কৃষিনির্ভর ও গ্রামপ্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ৬৪ জেলার প্রতিটিতেই এগ্রো টুরিজমের সম্ভাবনা রয়েছে, যা একইসাথে কৃষকের আয়, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং জিডিপিতে পর্যটনের অবদান বাড়াতে পারে।

সুখের খামার এগ্রো ভিলেজ ইতোমধ্যে বাগইল গ্রামে ৪১ জনের সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি করেছে, ২০ জন নারী উদ্যোক্তাকে স্বাবলম্বী করেছে। 

প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের আটটি বিভাগে আটটি সুখের খামার এগ্রো ভিলেজ গড়ে তোলা।

সুখের খামার এগ্রো ভিলেজ কী?

সুখের খামার এগ্রো ভিলেজ বাংলাদেশের প্রথম কমিউনিটি ভিত্তিক এগ্রো টুরিজম প্রজেক্ট। এখানে সাধারণ মানুষ শেয়ারের মাধ্যমে জমিসহ প্রকল্পের মালিক হন, প্রকল্পের ১৫টি উৎস থেকে অর্জিত প্রকৃত লাভের অংশ পান এবং প্রতি বছর পরিবারসহ রিসোর্টে বিনামূল্যে থাকার সুযোগ পান এবং উৎপাদিত প্রতিটি পণ্য সাশ্রয় মূল্যে মধ্যে কেনার সুযোগ পান। 

প্রকল্পটি পরিচালনা করে সুখের খামার এগ্রো লিমিটেড, একটি নিবন্ধিত কোম্পানি। 

অবস্থান : গ্রাম–বাগইল, ইউনিয়ন– পাইকড়, পোস্ট– আড়োলা, উপজেলা– কাহালু, জেলা– বগুড়া। বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার, ঢাকা থেকে সড়কপথে প্রায় ৪ ঘণ্টা।