
সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু
দেশের জ্বালানি তেল আমদানি ব্যবস্থাকে সহজতর ও নিরাপদ করতে নির্মিত “সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) উইথ ডাবল পাইপ লাইন” প্রকল্পের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের (অপারেশনস অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) দায়িত্ব পেতে যাচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার প্রতিষ্ঠান ‘পিটি পার্টামিনা ট্রান্স কনটিনেন্টাল’। এই জন্য প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ বছরের জন্য প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা দিতে হবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব আজ বুধবার অনুষ্ঠিতব্য সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে উত্থাপন করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। ক্রয় কমিটির সভাপতি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বর্তমানে আমেরিকায় অবস্থান করায় তিনি সেখান থেকে জুম প্ল্যাটফর্মে বৈঠকে যোগদান করবেন বলে সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানিয়েছে।
জানা গেছে, দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি তেলের চাহিদা পূরণ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে এসপিএম প্রকল্পের আওতায় বঙ্গোপসাগরের নির্ধারিত স্থানে এসপিএম বয়া, পাইপলাইন ম্যানিফোল্ড, সম্পূর্ণ পাইপলাইন স্থাপন এবং মহেশখালীর পাম্পিং স্টেশন ও ট্যাংক ফার্ম (পিএসটিএফ) এলাকায় ছয়টি স্টোরেজ ট্যাংকসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্পের কমিশনিং কার্যক্রম সফলভাবে শেষ হওয়ায় এটি সচল রাখতে অভিজ্ঞ ঠিকাদার প্রয়োজন।
এর আগে গত বছরের ১৯ নভেম্বর জ্বালানি বিভাগ থেকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬’ এবং ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০২৫’-এর আওতায় এক ধাপ দুই খাম দরপত্র পদ্ধতিতে পুনঃদরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগের নির্দেশ দেয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ১৯ ডিসেম্বর দেশের চারটি জাতীয় দৈনিক, একটি স্থানীয় দৈনিক এবং ‘ডিজে মার্কেট’ ও বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) ওয়েবসাইটে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। পরে দরপত্র ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দরপত্র জমাদানের সময় ১৬ দিন বাড়িয়ে ১৩ জানুয়ারি সংশোধিত বিজ্ঞপ্তি (করিজেনডাম নোটিশ) প্রকাশ করা হয়।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মোট ১১টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র দলিল ক্রয় করলেও শেষ পর্যন্ত তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়- ইন্দোনেশিয়ার পিটি পার্টামিনা ট্রান্স কনটিনেন্টাল, চীনের চায়না পেট্রলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড এবং হংকংয়ের হাইলং মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দরদাতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে দরপত্র দলিলগুলো উন্মুক্ত করা হয়।
সাত সদস্যবিশিষ্ট দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি কারিগরি মূল্যায়নে সহায়তার জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইএলএফ কনসাল্টিং ইঞ্জিনিয়ার্স, আবুধাবির সহায়তা নেয়। এই প্রতিষ্ঠানটি আগেও এই প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছে। কারিগরি মূল্যায়নে তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হাইলং মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিংকে অনুত্তীর্ণ (নন-রেসপনসিভ) ঘোষণা করা হয়। কারণ দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির প্রাসঙ্গিক কাজে ন্যূনতম সাত বছরের অভিজ্ঞতা এবং অন্তত ৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের কাজ সম্পাদনের অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ করতে পারেনি কোম্পানিটি।
কারিগরিভাবে উত্তীর্ণ বাকি দুই প্রতিষ্ঠান পিটি পার্টামিনা ট্রান্স কনপিনেন্টাল এবং চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির আর্থিক প্রস্তাব গত ৬ জুলাই উন্মুক্ত করা হয়। এতে দেখা যায়, পিটি পার্টামিনা ট্রান্স কন্টিনেন্টাল ১২৮(১২ কোটি ৮০ লাখ ডলার) মিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রস্তাব দিয়ে সর্বনি¤œ দরদাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়, যা দাফতরিক প্রাক্কলিত ব্যয় ১৬৪ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ কম। অন্য দিকে চায়না পেট্রলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির প্রস্তাবিত দর ছিল প্রায় ১৮৮ দশমিক ৯৬ মিলিয়ন ডলার, যা প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি।
সূত্র জানায়, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইএলএফ তাদের প্রতিবেদনে পার্টামিনার প্রস্তাবের কিছু আইটেমের মূল্যে বেঞ্চমার্কের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্যের বিষয়টি চিহ্নিত করে এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা না চাওয়ায় কাজের পরিধি ও চাহিদা পুরোপুরি বোঝার ক্ষেত্রে পরিচালন ঝুঁকি থেকে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে। এরপর দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাখ্যা চাইলে পার্টামিনা জানায়, উল্লিখিত আইটেমগুলো তাদের সামগ্রিক চুক্তিমূল্যের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটি দরপত্রের সব শর্তাবলি, বিধান ও নীতিমালা পুরোপুরি মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দেয়।
এই ব্যাখ্যা পর্যালোচনার পর দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি কারিগরিভাবে উত্তীর্ণ ও আর্থিক মূল্যায়নে সর্বনি¤œ দরদাতা প্রতিষ্ঠান পিটি পার্টামিনা ট্রান্স কন্টিনেন্টালের সাথে চুক্তি সম্পাদন ও কার্যাদেশ প্রদানের সুপারিশ করে।
জ¦ালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পাঁচ বছর মেয়াদে এই কাজের জন্য ভ্যাট ও আয়করসহ মোট প্রায় ১৫ কোটি ৯১ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয় হবে, বাংলাদেশী মুদ্রায় যা প্রায় এক হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা। বিপিসি নিজস্ব অর্থায়নে এই কাজ বাস্তবায়ন করবে এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে ৫৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
আজকের সভায় প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে শিগগিরই এ বিষয়ে ইন্দোনেশিয়ার কোম্পানির সাথে চুক্তি করা হবে।








