ফিলিস্তিন
এবার যুক্তরাষ্ট্রে বসে ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়বেন যে ফিলিস্তিনিরা। সংগৃহীত

নিউ ইয়র্কের আইনসভায় একজন ফিলিস্তিনি আমেরিকান সংগঠকের প্রবেশ, গাজায় আহত ফিলিস্তিনিদের চিকিৎসা দেওয়া একজন সার্জনের কংগ্রেসে যাত্রা এবং মিশিগানের একজন চিকিৎসকের মার্কিন সিনেটে নির্বাচিত হওয়া—৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ইসরাইলের প্রতি ওয়াশিংটনের অন্ধ সমর্থনের বিরুদ্ধে লড়াই করা প্রার্থীদের জন্য ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিজয় এনে দিয়েছে।

Advertisement

এই ফলাফলের মাধ্যমে ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্য স্তরের প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুন ফিলিস্তিন সমর্থকদের আগমন ঘটেছে; সাথে পুনর্বাচিত হয়েছেন সেইসব আইনপ্রণেতাও, যারা এতদিন গাজায় ইসরাইলের গণহত্যার জন্য জবাবদিহির দাবি তুলে আসছিলেন।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্য অনুযায়ী, এমন এক সময়ে এই বিজয়গুলো এলো যখন ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের (প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট) নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসন ও তার বৈদেশিক নীতির ওপর কঠোর নজরদারি চালানোর নতুন সুযোগ তৈরি হলো। তবে এই সুযোগের ফলে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ায় কোনো বাধা সৃষ্টি হবে কি না, তা নির্ভর করবে নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের অগ্রাধিকারের ওপর।

Advertisement

ফিলিস্তিনি আমেরিকানদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি

মিশিগানের ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে রাশিদা তলাইব আবার বিজয়ী হয়ে হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে ফিলিস্তিনি আমেরিকানদের জোরালো কণ্ঠস্বর বজায় রেখেছেন।

ওয়াশিংটনের বাইরেও ফিলিস্তিনি আমেরিকান প্রার্থীরা অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে নজরকাড়া জয় অর্জন করেছেন।

আবিয়ার কাওয়াস নিউ ইয়র্কের ১২তম স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্টে বিজয়ী হয়ে অঙ্গরাজ্য আইনসভায় প্রথম ফিলিস্তিনি আমেরিকান হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার ইতিহাস গড়েছেন।

জয়ের পর সোশ্যাল মিডিয়া 'এক্স'-এ কাওয়াস লেখেন, ‘আমরা ইতিহাস তৈরি করেছি।’ তার নির্বাচনী প্রচারণায় ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির পাশাপাশি সাশ্রয়ী আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং অভিবাসীদের অধিকারের বিষয়গুলো স্থান পেয়েছিল—যা তিনি তার মূল আইনসভার এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

কলোরাডোতে ইমান জোদাহ্ ২৯তম স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্টে এবং রুওয়া রমান জর্জিয়ার ৭ম স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্টে বিজয়ী হয়েছেন। অন্যদিকে ইলিনয় হাউসে আবদেলনাসের রশিদ  তার আসন ধরে রাখতে যাচ্ছেন বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

অঙ্গরাজ্য আইনসভার এই বিজয়গুলো বিভিন্ন অঞ্চলে ফিলিস্তিনি আমেরিকানদের প্রতিনিধিত্বকে বহুগুণ প্রসারিত করেছে, যেখানে এই জনপ্রতিনিধিরা দেশীয় আইন প্রণয়নের পাশাপাশি ফিলিস্তিন-সংক্রান্ত জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।

গাজার হাসপাতাল থেকে মার্কিন কংগ্রেসে

নিউ জার্সির ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে অ্যাডাম হামাভির বিজয় গাজার আহতদের সরাসরি চিকিৎসা দেয়ার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন চিকিৎসককে কংগ্রেসে নিয়ে এলো।

মিসরীয়-আমেরিকান সার্জন এবং মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রাক্তন এই চিকিৎসক ২০২৪ সালে গাজায় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে সেবা দিয়েছিলেন। আনাদোলু অ্যাজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি ইসরাইলে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের পক্ষে জোরালো প্রচারণা চালিয়েছিলেন।

তার নির্বাচনের ফলে গাজার ভেঙে পড়া চিকিৎসা ব্যবস্থার ভেতর থেকে যিনি ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেছেন, তিনি নিজে কংগ্রেসে সামরিক সহায়তা-সংক্রান্ত বিতর্কে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলেন।

নিউ ইয়র্কে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গাজা ব্লকেড ও তাবু আন্দোলনের মাধ্যমে সংহতি আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে পরিচিতি পাওয়া দরিয়ালিজা অ্যাভিলা শেভালিয়ার ১৩তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়লাভ করেছেন।

পাশের ৭ম ডিস্ট্রিক্ট থেকে বিজয়ী হয়েছেন ক্লেয়ার ভালদেজ। ‘দ্য নিউ আরব’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, উভয়েই ফিলিস্তিনিদের অধিকার সমর্থনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রচারণা চালিয়েছিলেন।

সিনেটে লড়াই নিয়ে যাচ্ছেন আল-সাইয়েদ

মিশিগানে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে প্রথম মুসলিম আমেরিকান হিসেবে মার্কিন সেনেটে নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছেন আবদুল আল-সাইয়েদ।

মিশরীয়-আমেরিকান এই চিকিৎসক ও প্রাক্তন জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা স্বাস্থ্যসেবা, পারিবারিক খরচ বৃদ্ধি এবং কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার পাশাপাশি ইসরাইলকে দেওয়া মার্কিন সামরিক সহায়তার প্রকাশ্য বিরোধিতা করে প্রচারণা চালান।

নির্বাচনের পরও তার এই অবস্থান অটুট রয়েছে। ৪ নভেম্বর এনপিআর-এর ' মর্নিং এডিশন'-এ দেওয়া সাক্ষাৎকারে এল-সাইয়েদ ওয়াশিংটনকে ‘গণহত্যা ও বর্ণবাদ’সহ মানবাধিকার লঙ্ঘনে ব্যবহৃত অস্ত্র বিক্রি অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানান।

এনপিআর জানায়, তার এই সমালোচনা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সরকারের কাছে অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল, যেখানে তিনি বিদেশের মাটিতে সামরিক ব্যয় না করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা মেটানোর ওপর জোর দেন। তার এই জয়ের মাধ্যমে অস্ত্র বিক্রি ও বৈদেশিক নীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলার মতো ক্ষমতাযুক্ত উচ্চকক্ষে এই দাবিটি উত্থাপিত হতে যাচ্ছে।

মেইনে সাবেক স্টেট সিনেট প্রেসিডেন্ট ট্রয় জ্যাকসন দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সকে পরাজিত করেছেন। আনাদোলুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্যাকসন গাজায় গণহত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং ইসরাইলে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবি তুলেছেন।

সামরিক সহায়তার বিরুদ্ধে নতুন চ্যালেঞ্জ

প্রতিনিধি পরিষদে আসা অন্য নতুন সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন কলোরাডোর ১ নম্বর ডিস্ট্রিক্টের মেলাট কিরোস, মিশিগানের ১৩ নম্বর ডিস্ট্রিক্টের ডোনাভান ম্যাককিনি এবং পেনসিলভেনিয়ার ৩ নম্বর ডিস্ট্রিক্টের ক্রিস্টোফার র‍্যাব।

ম্যাককিনি 'ব্লক দ্য বোম্বস অ্যাক্ট' সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা কার্যকর হলে ইসরাইলে নির্দিষ্ট কিছু প্রাণঘাতী অস্ত্র হস্তান্তর নিষিদ্ধ হবে।

টেক্সাসের ৩০ নম্বর ডিস্ট্রিক্ট থেকে ফ্রেডরিক ডি. হেইনস ৩য় বিজয়ী হয়েছেন এবং নিউ জার্সির ১১ নম্বর ডিস্ট্রিক্টে আগে বিশেষ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর এবার পূর্ণ মেয়াদের জন্য জয় নিশ্চিত করেছেন এনালিলিয়া মেজিয়া। আনাদোলুর তথ্যমতে, উভয়েই গাজায় গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা রেখেছেন।

ক্যালিফোর্নিয়ার ৩৪তম ডিস্ট্রিক্টে অ্যাঞ্জেলা গঞ্জালেস-তোরেস বর্তমান আইনপ্রণেতা জিমি গোমেজকে পরাজিত করেছেন।

তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে ছিল অবিলম্বে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা, মানবিক সহায়তা প্রদান এবং ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার রক্ষা করা। সেই সাথে তিনি 'ব্লক দ্য বোম্বস অ্যাক্ট' সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধকে এক আইনি অঙ্গীকারে পরিণত করেছেন।

'দ্য ​​নিউ আরব' আরো জানিয়েছে, ক্যালিফোর্নিয়ার ২২তম ডিস্ট্রিক্টে র‍্যান্ডি ভিলেগাস—যিনি ইসরাইলে সামরিক সহায়তার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছিলেন—এবং মিশিগানের ৭ম ডিস্ট্রিক্টে উইলিয়াম লরেন্স—যিনি ইসরাইলপন্থী লবিং গ্রুপ 'এআইপিএসি'-এর কোনো অর্থায়ন নেননি—বিজয়ী হয়েছেন।

ফিলিস্তিনি অধিকার কর্মীদের জন্য এই ঐতিহাসিক বিজয়ের পরবর্তী মাপকাঠি হবে নতুন নতুন আইন প্রণয়ন করা : আইনপ্রণেতারা কোন কোন অস্ত্র সরবরাহের বিরোধিতা করেন, কোন বিধিনিষেধগুলো সমর্থন করেন এবং কংগ্রেসে তাদের এই শক্তিশালী উপস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে তারা শীর্ষ নেতাদের ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করতে পারেন। মধ্যবর্তী নির্বাচন সেই দাবিগুলোর পক্ষে অনেক নতুন নির্বাচিত প্রতিনিধি এনে দিয়েছে। এবার নতুন কংগ্রেসই ঠিক করবে এই প্রতিনিধিরা বাস্তবে কতটা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন।

সূত্র : প্যালেস্টাইন ক্রনিকল