
পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি জনপদে সশস্ত্র তৎপরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। সাধারণ আগ্নেয়াস্ত্রের গণ্ডি পেরিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে অত্যাধুনিক রাইফেল, স্নাইপার, মর্টার শেল, নাইট ভিশন সরঞ্জামসহ যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত বিভিন্ন অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুদের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। পাহাড়ের গভীর জঙ্গল ও উঁচু চূড়াকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে এসব অস্ত্রের মহড়া, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগও রয়েছে। এতে শুধু নিরাপত্তা বাহিনী নয়, সাধারণ পাহাড়ি-বাঙালি জনগোষ্ঠী এবং পর্যটনশিল্পের নিরাপত্তাও নতুন করে উদ্বেগের মুখে পড়েছে।
খাগড়াছড়ির একটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় গিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীর আস্তানায় অত্যাধুনিক অস্ত্র দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন আকরামুল করীম (ছদ্মনাম) নামে এক যুবক। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে গহিন পাহাড় অতিক্রম করে তিনি সেখানে পৌঁছান। ইউপিডিএফের (মূল) একজন কমান্ডারের অনুমতি নিয়ে আস্তানায় প্রবেশের পর একটি জুমঘরে তাকে ও তার সাথে থাকা অন্য দু’জনকে মোবাইল ফোন জমা দিতে হয়।
নয়া দিগন্তকে আকরামুল বলেন, সেখানে গিয়ে সশস্ত্র সদস্যদের হাতে যেসব আগ্নেয়াস্ত্র দেখেছেন, তা দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছেন। সবুজে ঘেরা দুর্গম পাহাড়ের ভেতরে এত আধুনিক ও প্রাণঘাতী অস্ত্র কিভাবে পৌঁছাল, সেটিই তার কাছে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার বর্ণনা অনুযায়ী, অন্তত ১০ জন সশস্ত্র সদস্যের কাছে একে-৪৭, মর্টার শেল এবং নাইট ভিশন সুবিধাযুক্ত স্নাইপার রাইফেলের মতো অস্ত্র ছিল। এসব অস্ত্র সাধারণ সংঘর্ষের চেয়ে অনেক বেশি বিধ্বংসী পরিস্থিতি তৈরি করতে সক্ষম।
আকরামুলের দাবি, শুধু ইউপিডিএফ নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছেও বিভিন্ন ধরনের আধুনিক অস্ত্র রয়েছে। তার ভাষায়, পাহাড় এখন আর আগের মতো নিরাপদ নেই। এর পেছনে প্রতিবেশী দেশগুলোর স্বার্থসংশ্লিষ্টতা, সীমান্তের ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং আঞ্চলিক জাতিগত রাজনীতির জটিল সম্পর্ক রয়েছে। দুর্গম ও অরক্ষিত সীমান্তপথ ব্যবহার করে মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চল এবং ভারতের মিজোরামসহ আশপাশের এলাকা থেকে অস্ত্র প্রবেশের আশঙ্কাও রয়েছে।
তিনি বলেন, এর আগে আরাকান আর্মি, কুকি-চিন, ইউপিডিএফ ও জেএসএসের সদস্যদের সাথে তার দেখা হয়েছে। তবে স্নাইপার রাইফেল এবারই প্রথম দেখেছেন। তার ধারণা, পাহাড়ের উঁচু চূড়া থেকে দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য এসব অস্ত্র মজুদ করা হচ্ছে। অন্ধকারে অভিযান পরিচালনার সুবিধার্থে অস্ত্রের সাথে নাইট ভিশন ক্যামেরা বা বিশেষ অপটিক্যাল সরঞ্জাম ব্যবহারের ব্যবস্থাও রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
স্নাইপার ও ভারী অস্ত্রের নতুন উদ্বেগ
পার্বত্য অঞ্চলে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্রভাণ্ডারে একে-৪৭, এম-৪ কার্বাইন, জি-৩ রাইফেল, এসএলআর, এসএমজি, চায়না রাইফেল, নাইন এমএম পিস্তল, লাইট মেশিনগান, হেভি মেশিনগান, গ্রেনেড, ৪০ এমএম গ্রেনেড লঞ্চার, রকেট লঞ্চার, মর্টার শেল এবং বিমানবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া রিমোট কন্ট্রোল বোমা ও বিভিন্ন ধরনের বিস্ফোরক ব্যবহারের তথ্যও সামনে এসেছে।
খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানের বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় জেএসএস (মূল), জেএসএস (সংস্কার), ইউপিডিএফ (মূল), ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এবং কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টসহ (কেএনএফ) বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠনের তৎপরতা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এসব সংগঠনের অস্ত্রভাণ্ডার এখন আর দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র বা সাধারণ পিস্তলে সীমাবদ্ধ নেই।
সম্প্রতি দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর আস্তানা থেকে স্নাইপার রাইফেল এবং এর আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম উদ্ধারের তথ্যও পাওয়া গেছে। নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, স্নাইপার রাইফেলের মতো অস্ত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে পৌঁছানো পাহাড়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলতে পারে। কারণ, প্রশিক্ষিত ব্যবহারকারীর হাতে এ ধরনের অস্ত্র থাকলে অনেক দূর থেকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা সম্ভব। পাহাড়ের উঁচু অবস্থান, ঘন জঙ্গল ও দুর্গম ভূপ্রকৃতি এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে আক্রমণকারীদের বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, স্নাইপার রাইফেল পরিচালনায় বিশেষ প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা প্রয়োজন। ফলে শুধু অস্ত্র উদ্ধারই নয়, এসব অস্ত্র ব্যবহারের জন্য প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও নিরাপত্তা বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অস্ত্রের মহড়ায় অশান্ত পাহাড়
পাহাড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা সম্পর্কে চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা তিন পার্বত্য জেলায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে তৎপর। অতীতে বিভিন্ন অভিযানে তাদের কাছ থেকে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। অস্ত্র নিয়ে তাদের এই তৎপরতা পার্বত্য জেলাগুলোকে অশান্ত করে তুলছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ বিষয়ে সবসময় সতর্ক রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়।
তিন পার্বত্য জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের মতো অপরাধে এসব অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা সঙ্ঘাতকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। বিপুল অস্ত্রের মজুদ ও অবৈধ অর্থের প্রবাহের কারণে কোনো কোনো গোষ্ঠীর মধ্যে পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত আকাঙ্ক্ষা তৈরির আশঙ্কাও করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ প্রসঙ্গে স্বাধীন জুমল্যান্ড প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার কথাও বিভিন্ন নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট সূত্র উল্লেখ করেছে। তবে এ ধরনের রাজনৈতিক লক্ষ্য ও পরিকল্পনার বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য থাকা জরুরি।
সম্প্রতি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেককে ঘিরে ইউপিডিএফ ও জেএসএসের সশস্ত্র সদস্যদের মধ্যে উত্তেজনা ও গোলাগুলির ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, টানা দুই দিন দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা করে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয় এবং পর্যটকদের আনাগোনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পাহাড়ের অর্থনীতিতে পর্যটন একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হওয়ায় এ ধরনের সঙ্ঘাত স্থানীয় ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদেরও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
চাঁদাবাজির অর্থে অস্ত্র কেনার অভিযোগ
পার্বত্য অঞ্চলে কাজ করা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দাবি, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন এলাকায় ভয়ভীতি প্রদর্শন ও অস্ত্রের হুমকি দিয়ে বিপুল অঙ্কের চাঁদা আদায় করে। এই অবৈধ অর্থের একটি অংশ অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহে ব্যয় করা হয়। তাদের দাবি, বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। তবে এই অঙ্কের স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য হিসাব ও উৎস প্রকাশ করা প্রয়োজন।
গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেএসএসের (সন্তু) সশস্ত্র দল ১৯টি অস্ত্র, দুই হাজার ৫৮০ রাউন্ড গুলি এবং ২০টি হ্যান্ড গ্রেনেড সংগ্রহ করে। একই সময়ে ইউপিডিএফের (প্রসীত) সশস্ত্র দল ৬০টি অস্ত্র, আট হাজার ৮৫০ রাউন্ড গুলি এবং ১০টি হ্যান্ড গ্রেনেড সংগ্রহ করেছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রগুলোর দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো প্রতিবেশী দেশগুলোর বিভিন্ন সীমান্তপথ ব্যবহার করে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করে থাকে। এসব অস্ত্র ব্যবহার করে গত এক বছরে ৫২টি হত্যাকাণ্ড, ১০৩টির বেশি অপহরণ এবং বিভিন্ন ধরনের সশস্ত্র কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এসব পরিসংখ্যানের পূর্ণাঙ্গ সময়কাল, সংগঠনভিত্তিক বিভাজন এবং ঘটনার শ্রেণিবিন্যাস প্রকাশ করা গেলে পাহাড়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র আরো স্পষ্ট হবে।
সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
সরজমিনে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। পাহাড়ি ও বাঙালি— উভয় জনগোষ্ঠীর একাংশের অভিযোগ, চাঁদাবাজি, অপহরণ, অস্ত্রের মহড়া এবং সঙ্ঘাতের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। তারা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, সীমান্তের ওপার থেকে অস্ত্র ও অর্থের জোগান আসার কারণে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো শক্তিশালী হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট উৎস, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।
তাদের মতে, অতীতে পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা চৌকি প্রত্যাহার বা কমিয়ে দেয়ার পর কোনো কোনো এলাকায় সশস্ত্র তৎপরতা বেড়েছে। বিষয়টি নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সাথে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে মিশে চলাফেরা করায় তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ অনেক সময় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।
রাজনৈতিক উদ্যোগ ছাড়া স্থায়ী শান্তি কঠিন
গত সোমবার রাঙ্গামাটি রিজিয়নের বিদায়ী অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ নাজমুল বলেন, পাহাড়ের সমস্যাগুলো শুধু সামরিক বা প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। এ জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, পাহাড়ের যুবসমাজকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার জন্য কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তরুণদের সামনে বিকল্প জীবিকার পথ খুলে দিতে পারলে তাদের অস্ত্র ও সঙ্ঘাতের পথ থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ নাজমুল বলেন, বিভিন্ন সময়ে পাহাড়ে ইউপিডিএফসহ আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর চাঁদাবাজি ও অস্ত্রের মহড়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব কর্মকাণ্ড থেকে তাদের ফিরিয়ে এনে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তার মতে, পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভর করলে চলবে না; স্থানীয় সাধারণ মানুষকেও ঐক্যবদ্ধভাবে সন্ত্রাস ও সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।
সীমান্তে নজরদারি ও যৌথ অভিযান প্রয়োজন
পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব:) ফজলে এলাহী আকবর নয়া দিগন্তকে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত কার্যত সব দিক থেকেই উন্মুক্ত। এই সীমান্তপথ ব্যবহার করে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের আসা-যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, ভারত ও মিয়ানমার— দুই দেশের সীমান্তসংলগ্ন হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তার মতে, সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া, সীমান্ত সড়ক, বর্ডার আউটপোস্ট (বিওপি) এবং আধুনিক ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। ক্যামেরা ও অন্যান্য প্রযুক্তির মাধ্যমে সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা গেলে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও অস্ত্র পাচার প্রতিরোধ সহজ হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের আশপাশে ভারত ও মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। এ বাস্তবতায় সীমান্ত নিরাপত্তাব্যবস্থায় শিথিলতার সুযোগ নেই। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির পর একধরনের আত্মতুষ্টি তৈরি হয়েছে বলেও তিনি মনে করেন।
ফজলে এলাহী আকবরের মতে, শান্তিচুক্তির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবায়নও এখনো পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। চুক্তির পরও পাহাড়ে অস্ত্রের উপস্থিতি এবং সশস্ত্র তৎপরতা অব্যাহত থাকা উদ্বেগজনক।
নিরাপত্তা ও সীমান্তবিষয়ক গবেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত জটিল। দুর্গম পাহাড় ও ঘন জঙ্গলের সুযোগ নিয়ে সীমান্তের ওপার থেকে অস্ত্র প্রবেশের গোপন তৎপরতা থাকতে পারে। এসব মোকাবেলায় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যৌথবাহিনীর সমন্বিত ও লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান প্রয়োজন।
তিনি বলেন, পাহাড়ি তরুণেরা কেন উগ্রবাদী বা বিদেশী সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে, সেটিও গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে হবে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সদস্য সংগ্রহ বা রিক্রুটমেন্টের প্রক্রিয়া বন্ধ করা না গেলে শুধু অস্ত্র উদ্ধার করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে না। এ ক্ষেত্রে তরুণদের কর্মসংস্থান, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
তার মতে, বিষয়টি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার সাথেও জড়িত।
রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) মোহাম্মদ আবদুল হক বলেন, পর্যটন মৌসুমে সেনাবাহিনীর নির্মিত সড়ক অবরোধ এবং পর্যটক অপহরণের মতো ঘটনা দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক। তার অভিযোগ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরির উদ্দেশ্যে ইউপিডিএফ এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। তিনি এসব তৎপরতার পেছনে ফ্যাসিস্ট শক্তির পরোক্ষ সমর্থন, ডিপ স্টেটের অর্থায়ন এবং ভারত-মিয়ানমারের ভূমিকা রয়েছে বলেও দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ করা প্রয়োজন।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) আবদুল হক সীমান্তে অস্ত্র চলাচল বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ, জোরালো পররাষ্ট্রনীতি এবং সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সমাধান কোথায়
পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, সমস্যাটি কেবল সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে অস্ত্র থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে সীমান্ত নিরাপত্তা, অবৈধ অর্থের প্রবাহ, চাঁদাবাজি, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাহীনতা, তরুণদের কর্মসংস্থানের সঙ্কট, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং শান্তিচুক্তির বাস্তবায়নসংক্রান্ত প্রশ্ন।
অত্যাধুনিক অস্ত্রের উপস্থিতি নিরাপত্তাঝুঁকিকে বাড়িয়ে তুললেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য অস্ত্র উদ্ধার ও অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি অস্ত্রের উৎস, অর্থায়নের পথ এবং প্রশিক্ষণ ও সদস্য সংগ্রহের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা জরুরি। একই সাথে সীমান্ত নজরদারি জোরদার, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পাহাড়ের সাধারণ মানুষকে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব বা ভয়ের মধ্যে না রেখে তাদের নিরাপত্তা, অধিকার ও অর্থনৈতিক সুযোগ নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক সংলাপ, শান্তিচুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন এবং পাহাড়ি-বাঙালি সব জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন ছাড়া স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন। অন্যথায় অস্ত্র উদ্ধার ও অভিযান সাময়িক স্বস্তি দিলেও পাহাড়ে সঙ্ঘাতের মূল কারণগুলো অমীমাংসিতই থেকে যাবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








