
নিজস্ব প্রতিবেদক
* জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
* মানবতাবিরোধী অপরাধ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ দিয়েছেন মোহাম্মদ নবী হোসেন সজীব। তিনি দাবি করেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মেরুল বাড্ডার ১৫ নম্বর সড়কে আন্দোলনে অংশ নেয়ার সময় পুলিশ, র্যাব, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের লোকজন আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। ওই গুলিতে তিনি আহত হন। তার শরীরে এখনো প্রায় ১৫০টি পিলেট রয়ে গেছে বলে ট্রাইব্যুনালকে জানান তিনি।
গতকাল মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ট্রাইব্যুনাল-১-এ রাষ্ট্রপক্ষের তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দেয়ার সময় নবী হোসেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও সাবেক খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামকে ওই ঘটনার জন্য সরাসরি দায়ী করেন। একই সাথে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও দায়ী করেন তিনি।
তবে সাক্ষীর এসব বক্তব্য অভিযোগ ও সাক্ষ্য হিসেবে বিচারাধীন। এসব অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবে ট্রাইব্যুনাল।
৫ আগস্টের সেই ঘটনা
পেশায় গ্রিলমিস্ত্রি নবী হোসেন বলেন, সরকার প্রকাশিত জুলাই যোদ্ধাদের গেজেটে তার নাম ‘সি’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তিনি মেরুল বাড্ডার ১৫ নম্বর সড়কে আন্দোলনে অংশ নেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, দুপুরের দিকে শিক্ষার্থীরা মূল সড়কে যেতে চাইলে পুলিশ সড়কটি ঘিরে রাখে। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা মূল সড়কে উঠে গেলে তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। এতে নবী হোসেন গুলিবিদ্ধ হন।
জবানবন্দীর সময় তিনি তার শরীরে থাকা গুলির চিহ্ন ট্রাইব্যুনালকে দেখান। তার দাবি, শরীরে এখনো প্রায় ১৫০টি পিলেট রয়েছে। এ কারণে ওই ঘটনার শারীরিক ক্ষত এখনো তার শরীরে বহন করতে হচ্ছে বলে সাক্ষ্যে জানান তিনি।
১৯ জুলাইয়ের বাড্ডা
এর আগে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বাড্ডা এলাকায় সংঘটিত সহিংসতার বিবরণও দেন নবী হোসেন। তিনি বলেন, ওই দিন উত্তর বাড্ডায় একজন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে একজন এবং মধ্য বাড্ডায় আরো একজন নিহত হন। আহত হন বহু মানুষ।
তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের সাথে তিনি আহত ও গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিদের রিকশা ও ভ্যানে করে হাসপাতালে পাঠানোর কাজে যুক্ত ছিলেন। রাস্তায় বিপুল রক্ত দেখে একপর্যায়ে অসুস্থ বোধ করায় তিনি বাসায় ফিরে যান।
মেনন ও কামরুলের বিরুদ্ধে চলমান মামলায় বাড্ডা ও আশপাশের এলাকায় আন্দোলনকারীদের হত্যার বিষয়টি অন্যতম প্রধান অভিযোগ।
মামলার প্রেক্ষাপট
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর বাড্ডা ও আশপাশের এলাকায় ২৩ জন আন্দোলনকারী নিহত হওয়ার ঘটনায় মেনন ও কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রসিকিউশনের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকার ও ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষপর্যায়ের নেতা হিসেবে তারা নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি কারফিউ জারির পক্ষে প্ররোচনা দিয়েছিলেন। তাদের কথিত নির্দেশনা ও ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো হয় বলে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করছে। গত ৩ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনালে তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। পরে ৩০ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেয়া হয়।
এরপর ২৩ জুন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। মামলার প্রথম সাক্ষী হিসেবে জুলাই আন্দোলনকারী মো: সাকিব আহম্মেদ জবানবন্দী দেন। তার সাক্ষ্যে রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় একজন আন্দোলনকারী নিহত হওয়ার ঘটনার বর্ণনা উঠে আসে।
প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দীতে কারফিউর প্রসঙ্গ
প্রথম সাক্ষী সাকিব আহম্মেদের আগে জবানবন্দীতে দাবি করেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই গণভবনের একটি সভায় শেখ হাসিনা, রাশেদ খান মেনন ও কামরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন এবং তাদের পরামর্শে কারফিউ জারি করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যাপক গুলিবর্ষণ ও হতাহতের ঘটনা ঘটে।
তবে ওই সাক্ষ্যের জেরায় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ও সামনে আসে। আসামিপক্ষের আইনজীবীর প্রশ্নের জবাবে সাকিব আহম্মেদ বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের সময় রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের সাথে কামরুল ইসলাম জড়িত নন। অর্থাৎ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণে আসামিপক্ষের জেরায় রাষ্ট্রপক্ষের বয়ানের কিছু অংশ নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে।
তৃতীয় সাক্ষীর বক্তব্যে নতুন বিবরণ
মঙ্গলবারের সাক্ষ্য গ্রহণে নবী হোসেনের বর্ণনায় মূলত মেরুল বাড্ডায় ৫ আগস্টের ঘটনাটি সামনে আসে। তার বক্তব্যে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি, তার নিজের আহত হওয়া এবং শরীরে দীর্ঘদিন ধরে পিলেট বহনের বিষয়টি উঠে আসে।
রাষ্ট্রপক্ষের তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে তার জবানবন্দী গ্রহণ করছেন ট্রাইব্যুনাল। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করছেন প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ। মঙ্গলবার মেনন ও কামরুল ইসলামকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
তিনটি অভিযোগের কাঠামো
মামলাটিতে আসামিদের বিরুদ্ধে মোট তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে বলে আদালত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে বাড্ডা ও আশপাশের এলাকায় আন্দোলনকারীদের হত্যা, আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারে প্ররোচনা এবং কারফিউ জারির সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য হলো, তৎকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থানে থাকা দুই নেতা আন্দোলন দমনে সরকারের পদক্ষেপকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থন ও উৎসাহ দিয়েছেন। অন্য দিকে আসামিপক্ষ শুরু থেকেই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। অভিযোগ গঠনের সময় মেনন নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচারের আবেদন করেন এবং কামরুল ইসলাম অভিযোগগুলোকে মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবি করেন।
গ্রেফতার ও বর্তমান অবস্থান
সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট রাশেদ খান মেননকে গ্রেফতার করা হয়। সাবেক খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামকে একই বছরের ১৮ নভেম্বর রাজধানীর উত্তরা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এর পর থেকে তারা কারাগারে রয়েছেন। মামলাটির বিচার এখনো চলমান। ফলে নবী হোসেনসহ রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের বক্তব্য, আসামিপক্ষের জেরা, অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া শেষে আদালতের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে অভিযোগগুলোর বিচারিক পরিণতি।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিভিন্ন মামলায় প্রত্যক্ষদর্শী ও আহত ব্যক্তিদের সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে ঘটনাগুলোর পৃথক স্থান, সময় ও দায় নির্ধারণের চেষ্টা চলছে। মেনন-কামরুল মামলায়ও বাড্ডা-রামপুরা এলাকার ঘটনাপ্রবাহকে কেন্দ্র করে একাধিক সাক্ষীর বক্তব্য পর্যায়ক্রমে আদালতের নথিতে যুক্ত হচ্ছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








