
বাংলাদেশ সরকার প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, সার ও বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে ভর্তুকি দেয়। এসব কর্মসূচির উদ্দেশ্য নিম্ন আয়ের মানুষকে সুরক্ষা দেয়া, কৃষির উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় রাখা। কিন্তু ভর্তুকির সুফল বণ্টনে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ, সার ও সামাজিক সুরক্ষায় সরকারি ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চলে যাচ্ছে তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারের কাছে। বিপরীতে সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত থাকছে।
বিশ্বব্যাংকের চলতি বছরের অক্টোবরে প্রকাশিত ডেভেলপমেন্ট আপডেটের একটি বিশেষ অংশে বাংলাদেশের ভর্তুকি ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে এ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমস্যাটি শুধু ভর্তুকি দেয়া বা না দেয়ার নয়; বরং কারা সুবিধা পাচ্ছে, কতটা পাচ্ছে এবং সরকারি অর্থের বিনিময়ে দারিদ্র্য কমানোর সুফল কতটা অর্জিত হচ্ছে, সেটিই মূল বিবেচ্য।
বিপুল ব্যয়, সীমিত সুফল : বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ জিডিপির প্রায় ৩.৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ১৭.৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে জ্বালানি ও সার ভর্তুকি এবং বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে। কিন্তু দুর্বল লক্ষ্য নির্ধারণ ও সুবিধাভোগী নির্বাচনের সীমাবদ্ধতার কারণে এ ব্যয়ের বড় অংশ প্রকৃত দরিদ্র পরিবারের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
২০২২ সালের তথ্যের ভিত্তিতে করা বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রত্যক্ষ কর ও নগদ হস্তান্তর দারিদ্র্য ও বৈষম্য কিছুটা কমায়। এ ব্যবস্থায় জিনি সহগ ৫২.৪ থেকে কমে ৫০.৭-এ নেমে আসে এবং দারিদ্র্যের হার ১৯.৬ শতাংশ থেকে ১৮.৮ শতাংশে নামে। কিন্তু পরোক্ষ করের বোঝা এ অর্জনের একটি বড় অংশ মুছে দেয়। সব মিলে জিনি সহগ দাঁড়ায় ৫১.৪ এবং দারিদ্র্যের হার বেড়ে হয় ২০.৬ শতাংশ; অর্থাৎ কর ও সহায়তা কর্মসূচি না থাকলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারত, কিন্তু বিদ্যমান ব্যবস্থায় দরিদ্র পরিবারগুলো করের মাধ্যমে সরকারকে যে অর্থ দেয়, নগদ সহায়তা ও ভর্তুকির মাধ্যমে তার তুলনায় কম সুবিধা ফেরত পায়।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো সেবার আর্থিক মূল্য বিবেচনায় নিলে দরিদ্র পরিবারের নিট সুবিধার চিত্র কিছুটা উন্নত হয়। তবে এসব সেবার মান ও প্রাপ্যতার সীমাবদ্ধতা থাকায় তার পূর্ণ সুফল তারা পায় না।
সমস্যাটি আরো প্রকট হচ্ছে রাজস্বের সীমাবদ্ধতার সময়ে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কর-জিডিপি অনুপাত ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে আটকে রয়েছে। অন্য দিকে ভর্তুকি ব্যয় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে জিডিপির ০.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২.২ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে সুদ পরিশোধের ব্যয় জিডিপির ২.৫ শতাংশে উঠে মোট সরকারি ব্যয়ের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ দখল করছে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের জন্য সরকারের হাতে থাকা অর্থের ওপর চাপ বাড়ছে।
বিদ্যুৎ ভর্তুকি : ধনীরা পান বেশি, দরিদ্রদের প্রয়োজন বেশি : বিদ্যুৎ ও গ্যাসে ভর্তুকির পরিমাণ ২০১৩-১৪ অর্থবছরের আট হাজার ৫৮০ কোটি টাকা (জিডিপির ০.৫ শতাংশ) থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর ৭০ থেকে ৯০ শতাংশই বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুতের গড় খুচরা বিক্রয়মূল্য ১০.৬৩ টাকা, যেখানে ব্যয়-উদ্ধারকারী মূল্য ১৫.১৬ টাকা; অর্থাৎ প্রতি ইউনিটে ৪.৫৩ টাকার ব্যবধান রয়েছে। এই ব্যবধান পূরণ করতে গিয়ে সরকারকে বিপুল ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
কিন্তু এই ভর্তুকির সুবিধা সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবার মোট বিদ্যুৎ ভর্তুকির প্রায় ৩৩ শতাংশ পায়। বিপরীতে সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবার পায় মাত্র ১৫.৪ শতাংশ। নিচের ৪০ শতাংশ পরিবারের সম্মিলিত অংশ প্রায় ৩০ শতাংশ। শহরের সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবার একাই বিদ্যুৎ ভর্তুকির প্রায় অর্ধেক পায় বলে প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে উল্লেখ রয়েছে।
তবে আয়ের অনুপাতে হিসাব করলে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সুবিধা মিলিয়ে বিদ্যুৎ ভর্তুকি সবচেয়ে দরিদ্র পঞ্চমাংশের আয়ের ১৮.১ শতাংশের সমান, যেখানে ধনী পরিবারের ক্ষেত্রে তা ২.৩ শতাংশ; অর্থাৎ দরিদ্র পরিবার তুলনামূলকভাবে বেশি উপকৃত হলেও মোট ভর্তুকির বড় অংশ তাদের কাছে পৌঁছায় না।
বিশ্বব্যাংকের সিমুলেশন অনুযায়ী, বিদ্যমান ভর্তুকি পুরোপুরি তুলে নিলে দারিদ্র্যের হার ২.৮ শতাংশ পয়েন্ট বাড়তে পারে। নতুন করে প্রায় ৪৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে এবং জিনি সহগ ১.৬ পয়েন্ট বাড়তে পারে।
অন্য দিকে ভর্তুকি প্রত্যাহার করলে সরকারের সাশ্রয় হতে পারে জিডিপির ১.৯ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ। কিন্তু এই সাশ্রয়ের বিপরীতে নিচের ৪০ শতাংশ পরিবারের সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দেয়া হলেও জিডিপির প্রায় ০.৬ শতাংশ সমপরিমাণ নিট সাশ্রয় থাকতে পারে। মূল বাধা হলো, বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি দিয়ে নিচের দুই-পঞ্চমাংশ পরিবারের অর্ধেকেরও বেশি মানুষের কাছে কার্যকর সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।
বিদ্যুতের লাইফলাইন সীমা ৭৫ ইউনিট করার সুপারিশ
বর্তমানে দরিদ্র পরিবারের জন্য বিদ্যুতের একটি প্রধান সুরক্ষা হলো ‘লাইফলাইন’ ট্যারিফ। এ ব্যবস্থায় মাসে ৫০ কিলোওয়াট ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য তুলনামূলক কম দর প্রযোজ্য। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মাত্র ৩৬.৪ শতাংশ দরিদ্র পরিবার এ সীমার মধ্যে থাকে। দরিদ্র পরিবারের গড় মাসিক বিদ্যুৎ ব্যবহার ৬০.৮ কিলোওয়াট ঘণ্টা। অন্য দিকে ৭৫.৭ শতাংশ দরিদ্র পরিবার মাসে ৭৫ ইউনিটের নিচে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে।
আরেকটি সমস্যা হলো, ৫০ ইউনিট অতিক্রম করলেই পুরো ব্যবহারের ওপর উচ্চতর দর প্রযোজ্য হওয়ার মতো কাঠামো থাকলে সামান্য অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে বিদ্যুৎ বিল হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। ফলে দরিদ্র পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়।
এ পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংক লাইফলাইন সীমা ৭৫ ইউনিটে উন্নীত করা, প্রতিটি ট্যারিফ স্তরে সংশ্লিষ্ট স্তরের ইউনিটের ওপর নির্ধারিত দর প্রয়োগ করা এবং মাসে ১৫০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভর্তুকি বন্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের একটি উদাহরণভিত্তিক সিমুলেশনে দেখা গেছে, এ ধরনের কাঠামোতে দারিদ্র্যের হার প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে, বৈষম্য কিছুটা কমতে পারে এবং ভর্তুকি ব্যয় জিডিপির প্রায় ০.৪ শতাংশ কমতে পারে। এ ব্যবস্থার সুবিধা হলো, বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হতে না পারা দরিদ্র পরিবারও বিদ্যুৎ ট্যারিফের মাধ্যমে কিছুটা সুরক্ষা পেতে পারে। তবে মাসে ৭৫ ইউনিটের নিচে বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী অদরিদ্র পরিবারের হারও ৪৪.৭ শতাংশ হওয়ায় সীমা বাড়ালে কিছু সচ্ছল পরিবারও সুবিধা পাবে। তাই শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ নয়; আয় ও পরিবারের আর্থিক সক্ষমতাও বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।
গ্যাস খাতে আর্থিক চাপ
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি এখন বাংলাদেশের গ্যাস চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ পূরণ করছে। অথচ ২০১৭ সালে দেশীয় গ্যাস দিয়ে প্রায় পুরো চাহিদা মেটানো সম্ভব ছিল।
এলএনজি দেশীয় গ্যাসের তুলনায় ব্যয়বহুল হলেও অন্যান্য তরল জ্বালানির তুলনায় সাশ্রয়ী বিকল্প। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গ্যাস সরবরাহের গড় ব্যয় ছিল প্রতি এমএমবিটিইউ ৫.৭৯ ডলার, বিপরীতে গড় বিক্রয়মূল্য ছিল ৫.৪৭ ডলার; অর্থাৎ প্রতি ইউনিটে ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধানের কারণে আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার বাণিজ্যিক অর্থায়নের সুযোগ সীমিত এবং প্রতিষ্ঠানটি সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানির দাম বাড়লে এ চাপ আরো তীব্র হতে পারে।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, গ্যাসসহ অন্যান্য ভর্তুকি ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপির ০.১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আনুমানিক ০.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো গেলে বিদ্যুতের চাহিদা ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হতে পারে। ফলে শুধু ভর্তুকি কমানো নয়, জ্বালানির অপচয় কমানো ও দক্ষতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।
সার ভর্তুকি : সুবিধা বেশি বড় জমির মালিকের
সার ভর্তুকি কৃষকদের আন্তর্জাতিক বাজারে সারের মূল্যবৃদ্ধি ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের অভিঘাত থেকে সুরক্ষা দিয়ে আসছে। বাংলাদেশের দারিদ্র্য হ্রাসে কৃষির অবদানও উল্লেখযোগ্য। ২০০৫ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে দারিদ্র্য কমার প্রায় ৬৯ শতাংশ কৃষি প্রবৃদ্ধির সাথে সম্পর্কিত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু সার ভর্তুকির ব্যয় দ্রুত বেড়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় ছিল সাত হাজার ২০০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ০.২ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ২৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা জিডিপির ০.৫ শতাংশের সমান। দেশের ব্যবহৃত সারের ৮৫ শতাংশেরও বেশি আমদানি করতে হয়।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পরিমাণভিত্তিক সর্বজনীন ভর্তুকির কারণে বেশি জমির মালিকরা বেশি সুবিধা পান। সবচেয়ে বড় ২০ শতাংশ ভূমি মালিক মোট সার ভর্তুকির প্রায় ৫০ শতাংশ পান। বিপরীতে ক্ষুদ্রতম ৪০ শতাংশ ভূমি মালিক পান মাত্র ১৩ শতাংশ।
কৃষি পরিবারের নিচের ৪০ শতাংশের মধ্যে সুবিধাভোগীর সংখ্যা মোট সুবিধাভোগীর প্রায় অর্ধেক হলেও তারা প্রত্যক্ষ ভর্তুকির মাত্র ৩৬.৫ শতাংশ পান। অন্য দিকে সবচেয়ে ধনী পঞ্চমাংশের অংশ ২৮.১ শতাংশ। আয়ের অনুপাতে হিসাব করলে সবচেয়ে দরিদ্র পঞ্চমাংশের জন্য এ সুবিধা আয়ের ১.০৪ শতাংশের সমান, যেখানে ধনী পরিবারের ক্ষেত্রে তা মাত্র ০.১০ শতাংশ।
এ থেকে বোঝা যায়, সার ভর্তুকি দরিদ্র কৃষকের আয়ের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ হলেও মোট অর্থ বণ্টনের ক্ষেত্রে জমির মালিকানার বৈষম্য বড় ভূমিকা রাখছে।
কৃষি বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশ ভর্তুকিতে!
কৃষি খাতের ব্যয়ের ধরনেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশ ভর্তুকিতে ব্যয় হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। খাদ্য ও কৃষি খাতের মোট ব্যয়ের ৪১.৫ শতাংশ ভর্তুকিতে গেলেও জ্ঞান সম্প্রসারণে ব্যয় মাত্র ৮.৫ শতাংশ, অবকাঠামোতে ৫.৬ শতাংশ এবং গবেষণায় ৪.২ শতাংশ; অর্থাৎ কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি— গবেষণা, সম্প্রসারণ, মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সেচ অবকাঠামোর তুলনায় তাৎক্ষণিক ভর্তুকিতে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে। গবেষণায় প্রতি এক টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ভর্তুকিতে প্রায় ১০ টাকা ব্যয়ের তথ্য এ ভারসাম্যহীনতাকে আরো স্পষ্ট করে।
প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ কৃষক সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার করেন। ফলে ভর্তুকির একটি অংশ এমন সারের পেছনে ব্যয় হয়, যার অতিরিক্ত ব্যবহার সব সময় উৎপাদন বাড়ায় না; বরং মাটির গুণমান ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
এ অবস্থায় কৃষি ভর্তুকি পুরোপুরি তুলে দেয়ার পরিবর্তে কৃষকের প্রকৃত প্রয়োজন, জমির পরিমাণ, ফসলের ধরন ও মাটির পুষ্টির চাহিদানুযায়ী সহায়তা পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন রয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা : কর্মসূচি বিস্তৃত, দরিদ্রদের কাছে সীমিত
২০২৬ সালে সরকার ২৫টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ৯০টি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি পরিচালনা করছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ১.৪৪ লাখ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২.১ শতাংশের সমান। তবে সরকারি কর্মচারীদের পেনশন ও কৃষি ভর্তুকি মিলিয়ে এ ব্যয়ের প্রায় ৪৩ শতাংশ চলে যায়।
সরকারের নিজস্ব সংজ্ঞায় ‘দরিদ্রবান্ধব’ হিসেবে বিবেচিত ৪৮টি কর্মসূচিতে বরাদ্দের অংশ মাত্র ৩৯ শতাংশ। এর বড় অংশ আবার চারটি কর্মসূচিতে কেন্দ্রীভূত— ফ্যামিলি কার্ড, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও দুস্থ নারী ভাতা এবং প্রতিবন্ধী ভাতা।
২০১০ সালে সামাজিক সুরক্ষা সহায়তা পাওয়া পরিবারের হার ছিল ২৪.৬ শতাংশ। ২০২২ সালে তা বেড়ে ৩৭.৬ শতাংশে দাঁড়ায়। কিন্তু সহায়তার পরিধি বাড়লেও সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের প্রায় অর্ধেক এখনো বঞ্চিত। বিপরীতে সবচেয়ে ধনী পঞ্চমাংশের ৩১ শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের সরকারি হস্তান্তর পায়।
আরো উদ্বেগজনক হলো, দরিদ্রবান্ধব কর্মসূচিগুলো সবচেয়ে দরিদ্র পঞ্চমাংশের ৬৩ শতাংশ পরিবারকে বাদ দেয়, অথচ ধনী পঞ্চমাংশের ১৮ শতাংশ পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করে। গড় বার্ষিক সুবিধার পরিমাণও ধনী পঞ্চমাংশের ক্ষেত্রে ১০ হাজার ৪৭২ টাকা, যেখানে দরিদ্র পঞ্চমাংশের ক্ষেত্রে সাত হাজার ১৪০ টাকা। ফলে সামাজিক সুরক্ষার সামগ্রিক প্রভাব দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে সীমিত থেকে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বিদ্যমান কর্মসূচিগুলো দারিদ্র্যের হার মাত্র ৩.০৫ শতাংশ পয়েন্ট কমাতে সক্ষম হচ্ছে।
সংস্কারের পথ : ফ্যামিলি কার্ড, ডিএসআর ও সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার
সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা কাটাতে সরকার কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে। অর্থ বিভাগে একক নিবন্ধন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যার আওতায় সরকার থেকে ব্যক্তিপর্যায়ে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থায় তিন কোটি ৫০ লাখের বেশি সুবিধাভোগী যুক্ত হয়েছেন।
২০২৮ সালের জুনের মধ্যে ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি বা ডিএসআর চালুর লক্ষ্য রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হবে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার শনাক্ত করা, তাদের আর্থসামাজিক অবস্থা নিয়মিত হালনাগাদ করা এবং বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে তথ্যের সমন্বয় নিশ্চিত করা।
বিশ্বব্যাংকের সিমুলেশন অনুযায়ী, বিদ্যমান কর্মসূচির দুর্বল লক্ষ্য নির্ধারণের সমস্যা দূর না করেও ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হলে দারিদ্র্যের হার আরো ০.৯৫ শতাংশ পয়েন্ট কমতে পারে। এতে প্রায় ১৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারে। তবে ব্যয় বাড়বে জিডিপির ০.২৩ শতাংশের সমপরিমাণ। অন্য দিকে সুবিধাভোগী নির্বাচনের ত্রুটি ২৫ শতাংশ কমানো গেলে অতিরিক্ত ব্যয় ছাড়াই দারিদ্র্যের হার ১.২৫ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত কমানো সম্ভব হতে পারে।
সবচেয়ে বড় সুফল আসতে পারে সমন্বিত কর্মসূচি থেকে। ফ্যামিলি কার্ডের সাথে বয়স্ক ও বিধবা ভাতার লক্ষ্য নির্ধারণ উন্নত করা এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ওএমএস ও ভিজিএফকে সমন্বিত করে একটি লক্ষ্যভিত্তিক খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি গড়ে তোলা হলে দারিদ্র্যের হার ১.৭২ শতাংশ পয়েন্ট কমতে পারে। এতে প্রায় ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারে এবং জিনি সহগ ০.৫২ পয়েন্ট কমতে পারে। অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে জিডিপির মাত্র ০.২১ শতাংশের সমপরিমাণ।
এসব হিসাব পূর্বাভাস নয়; বরং নির্দিষ্ট অনুমান ও পরিস্থিতির ভিত্তিতে তৈরি উদাহরণমূলক সিমুলেশন। বাস্তবে ফল নির্ভর করবে সুবিধাভোগী শনাক্তকরণ, কর্মসূচি বাস্তবায়ন, অর্থ ছাড় ও সেবার মানের ওপর।
সংস্কারে ধারাবাহিকতা ও সতর্কতা জরুরি
বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, সামাজিক সুরক্ষা শক্তিশালী না করে ভর্তুকি কমানো হলে দরিদ্র পরিবারগুলো উচ্চমূল্যের অভিঘাত সামলাতে হিমশিম খাবে। এতে স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে দারিদ্র্য বাড়তে পারে।
ভর্তুকি যত দ্রুত কমানো হবে, সরকারের আর্থিক সাশ্রয় তত দ্রুত আসবে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ক্ষতিপূরণ দিতে যত দেরি হবে, জনকল্যাণের ক্ষতিও তত বাড়বে। তাই ফ্যামিলি কার্ড ও ডিএসআর বাস্তবায়নকে ভর্তুকি সংস্কারের সাথে সমান্তরালে এগিয়ে নিতে হবে। সমন্বিত খাদ্যসহায়তা কর্মসূচিতে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়সহ দুর্যোগের সময় দ্রুত সহায়তা বাড়ানোর ব্যবস্থাও রাখতে হবে।
সার ভর্তুকির ক্ষেত্রে হঠাৎ মূল্য বাড়ানোর পরিবর্তে কয়েকটি মৌসুম আগে ঘোষণা দিয়ে ধাপে ধাপে সমন্বয়, ইলেকট্রনিক ভাউচার, কৃষক কার্ড ও ডিজিটাল কৃষক নিবন্ধনের মাধ্যমে প্রকৃত চাষি— এমনকি বর্গাচাষিদেরও— শনাক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সাথে ভর্তুকি থেকে সাশ্রয় হওয়া অর্থ কৃষি গবেষণা, সম্প্রসারণ, মাটি পরীক্ষা ও সেচব্যবস্থায় বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য হলো, জ্বালানি ভর্তুকি, সার ভর্তুকি ও সামাজিক সুরক্ষা— তিনটি খাতই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তিনটিতেই লক্ষ্য নির্ধারণ, ব্যয়দক্ষতা ও আর্থিক টেকসইতার সমস্যা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বাড়া এবং সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার প্রেক্ষাপটে সংস্কার এখন আরো জরুরি হয়ে উঠেছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








