আ’লীগের প্রভাব খাটিয়ে বিআইএম কর্মকর্তা তরিকুল ইসলামের দাপট

 মোহাম্মদ জাফর ইকবাল

শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জাতীয় ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের (বিআইএম) কর্মকর্তা মো: তরিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে পদায়ন-পদোন্নতি ও আর্থিক অনিয়ম, জ্ঞাত আয়ের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিআইএমের নিজস্ব নথি ও একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত লিখিত আবেদনে এসব অভিযোগ উঠে আসে। প্রতিষ্ঠানের সুশাসন, সরকারি অর্থের সুরক্ষা ও জনস্বার্থ বিবেচনায় অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি সংশ্লিষ্টদের।
জানা গেছে, তরিকুল ইসলাম বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে মাগুরার সাবেক এমপি সাইফুজ্জামান শেখর, যশোরের সাবেক এমপি কাজী নাবিল আহমেদ ও খুলনার শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েলের সাথে বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা ও ঘনিষ্ঠতার পরিচয় ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের তৎকালীন মহাপরিচালকের ওপর প্রভাব বিস্তার করে নিয়মবহির্ভূতভাবে পরিচালকের দায়িত্বসহ প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার করেন। যার কারণে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো নিয়ে তদন্তে কেউ সাহস দেখায়নি।
অভিযোগে প্রকাশ, তরিকুল ইসলাম বিধি-বহির্ভূতভাবে একাধিক পরিচালক পদে ছিলেন। তিনি একই সাথে পরিচালক (প্রশিক্ষণ) চলতি দায়িত্ব এবং পরিচালক (প্রশাসন) অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং ০৫.০০.০০০০.১৭০.১১.০১৭.২১-৯৭, তারিখ : ১৮ এপ্রিল ২০২৩-এর নির্দেশনার সাথে এই পদায়ন সাংঘর্ষিক মর্মে অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, বিআইএমের আইন, প্রবিধানমালা ও পরিচালক পদে পদোন্নতির অনুমোদিত এসেসমেন্ট ক্রাইটেরিয়া অনুযায়ী যোগ্যপ্রার্থী থাকা সত্ত্বেও ২০১৭ হতে গত প্রায় ৯ বছর ধরে পরিচালক পদের পদোন্নতি আটকে রেখে চলতি/অতিরিক্ত দায়িত্বের মাধ্যমে তরিকুল ইসলাম পদ ধরে রেখেছেন। এ বিষয়ে অভিযোগ এনে বিআইএমের ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা ড. উত্তম কুমার দত্ত গেল বছরের ৫ মে বিআইএমের মহাপরিচালক বরাবর একটি আবেদন জমা দিয়েছেন। যেখানে ১৯টি দালিলিক সংযুক্তিসহ ডিপিসি আহ্বান না করা, এসেসমেন্ট ক্রাইটেরিয়া উপেক্ষা এবং শিল্প ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অমান্যের সুনির্দিষ্ট বিবরণ উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, তরিকুল ইসলাম জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ১৮ এপ্রিল ২০২৩ তারিখের প্রজ্ঞাপনে জারিকৃত ‘চলতি দায়িত্ব ও অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান নীতিমালা’ লঙ্ঘন করে তিন বছরের অধিক সময় ধরে একই সাথে পরিচালক (প্রশিক্ষণ) চলতি দায়িত্ব ও পরিচালক (প্রশাসন) অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। উক্ত নীতিমালার ধারা ৩ মতে শূন্য পদ সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধি অনুযায়ী সরাসরি নিয়োগ বা পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করাই নিয়ম এবং কেবল চারটি ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে- জ্যেষ্ঠতা নির্ণয়ে জটিলতা, নিয়োগবিধি প্রণয়নে বিলম্ব, পদোন্নতিযোগ্য কর্মচারী না থাকা, অথবা আদালতের স্থগিতাদেশ/নিষেধাজ্ঞা থাকলে সেটির সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখপূর্বক চলতি দায়িত্ব বিবেচনা করা যায়। জানা গেছে, এসেসমেন্ট ক্রাইটেরিয়ায় সর্বোচ্চ নম্বরধারীসহ পদোন্নতিযোগ্য প্রার্থী বিদ্যমান ছিলেন, ফলে অতিরিক্ত চলতি দায়িত্ব (পরিচালক) থাকার ক্ষেত্রে কোনো ব্যতিক্রমই প্রযোজ্য ছিল না। 
নীতিমালার ধারা ৭ মতে চলতি দায়িত্ব সাময়িকভাবে সর্বোচ্চ ছয় মাসের জন্য প্রদানযোগ্য এবং ছয় মাসের অধিক প্রয়োজন হলে মেয়াদ অতিক্রমের আগেই আবশ্যিকভাবে সংশ্লিষ্ট পদোন্নতি কমিটি বা বোর্ডের অনুমোদন গ্রহণ করতে হয়। 
অথচ তরিকুল ইসলাম বছরের পর বছর পদোন্নতি কমিটি বা বোর্ডের অনুমোদন না নিয়েই আইন বহির্ভূতভাবে দায়িত্ব আঁকড়ে রেখেছিলেন। নীতিমালার ধারা ১০ মতে চলতি দায়িত্ব পদোন্নতি হিসেবে দাবিযোগ্য নয় এবং এর সুবাদে পদায়ন-পদোন্নতিতে কোনো অগ্রগণ্যতা বা অধিকার অর্জিত হয় না। 
অথচ দীর্ঘকাল পদ ধরে রেখে কার্যত পদোন্নতির সুবিধাই তিনি ভোগ করেছেন। ধারা ৫ ও ৬ মতে চলতি/অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদানে শুরুর তারিখ উল্লেখপূর্বক অফিস আদেশ জারি বাধ্যতামূলক। তার অনুকূলে জারিকৃত সমুদয় অফিস আদেশ, প্রতি ছয় মাস অতিক্রমকালে পদোন্নতি কমিটি/বোর্ডের অনুমোদনের রেকর্ড এবং নীতিমালার সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো সম্পূর্ণ লঙ্ঘিত হয়েছে। শিল্প ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মানতে হাইকোর্টের রিট পিটিশনের নির্দেশনাও রয়েছে বলে জানা গেছে। সেটিও তিনি অমান্য করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ দিকে তরিকুল ইসলামের চাকরিতে যোগদান এবং পরিচালকের দায়িত্ব প্রাপ্তির প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তার নিয়োগকালীন বিজ্ঞপ্তি, যোগ্যতার শর্ত, বাছাই কমিটির কার্যবিবরণীতে যথেষ্ট অমিল রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া তরিকুলের বিরুদ্ধে ঢাকা কেন্দ্রের আবাসিক কোয়ার্টার মেরামত কাজে আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। বিআইএমের নথি অনুযায়ী, ঢাকা কেন্দ্রের আবাসিক ভবন মেরামত সংক্রান্ত উক্ত কাজের অনুমোদিত ব্যয় প্রাক্কলন ৬,৪৯,৮৩,৯১৩ টাকা।  তিনি আবাসিক ভবন মেরামত কমিটি ও সম্পাদিত কাজ পরিদর্শন কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্বে ছিলেন। সংরক্ষিত পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে যে ৯টি ভবনের ৫৬টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ১৮টি ফ্ল্যাটে কিছু কাজ অসম্পন্ন, কিছু ফিটিংস সরবরাহ করা হয়নি এবং কিছু কাজের মান অসন্তোষজনক। তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এই মর্মে লিখিত পর্যবেক্ষণ রয়েছে যে, অতিরিক্ত কাজের অনুমোদন নথিতে ছিল না এবং বলবত কমিটির প্রতিবেদনটি দায়সারা প্রকৃতির। কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে অসম্পন্ন ও অসন্তোষজনক কাজের বিপরীতে বিল পরিশোধে তার দায় নিরূপণ প্রয়োজন বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়। একইভাবে চট্টগ্রাম ক্যাম্পাসের সংস্কার-মেরামত কাজেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে বিআইএমের কর্মকর্তারা একাধিকবার লিখিত অভিযোগ করলেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি।
পরিচালকের (প্রশাসন) দায়িত্ব পালনকালে তরিকুলের বিরুদ্ধে রাজস্ব বাজেট হতে সম্পাদিত ব্যয়সমূহে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিআইএমের ক্রয়কার্যে পছন্দের ঠিকাদারকে কার্যাদেশ প্রদান ও বিনিময়ে সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে তরিকুলের বিরুদ্ধে। একই সাথে বিআইএমের আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে জনবল সরবরাহ (১২ জন) সংক্রান্ত নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অর্থের বিনিময়ে যোগসাজশের মাধ্যমে পছন্দের কোম্পানিকে কার্যাদেশ পাইয়ে দেয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, জনবল মোতায়েনের নির্ধারিত সময় ছিল ০৩-০৫-২০২৬ হতে। অভিযোগ রয়েছে, প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ধরা পড়ার পর নিয়োগটি ভেস্তে যায় এবং নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও অদ্যাবধি জনবল মোতায়েন সম্পন্ন হয়নি।
বিআইএমের অধীনে অনুষ্ঠিত মেঘনা পেট্রোলিয়ামের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র বিক্রয়ের অভিযোগ রয়েছে তরিকুলের বিরুদ্ধে। সূত্র মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের কর্মচারী নিয়োগের (১৪৭টি পদ) লিখিত পরীক্ষা ৪ জুলাই ২০২৫ তারিখে বিআইএমের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। তদন্তে দেখা যায়, লিখিত পরীক্ষায় অংশ না নেয়া সত্ত্বেও ৪ জন পরীক্ষার্থীকে উত্তীর্ণদের তালিকায় রাখা হয়েছিল। 
অভিযোগ উঠেছে, পরীক্ষা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান বিআইএমের পক্ষ থেকে মো: তরিকুল ইসলাম এবং বিআইএমের ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাফর আলী আগেই প্রশ্নপত্র বিক্রয়ের সাথে জড়িত ছিলেন এবং পরীক্ষায় অংশ না নেয়া চারজন প্রার্থীকে উত্তীর্ণদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার কাজটিও তাদের মাধ্যমেই সংঘটিত হয়েছে।
বিআইএমের ডিপ্লোমা (পিজিডি) কোর্সের কাজের সাথে সম্পৃক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আগস্ট ২০২৬ মাসের সম্মানী বিলে দেখা যায়, তরিকুল ইসলাম পরিচালক (প্রশিক্ষণ) চলতি দায়িত্ব হিসেবে প্রতি মাসেই ২২,২০০ টাকা সম্মানী গ্রহণ করেছেন। সেক্ষেত্রে এই হারে বার্ষিক প্রায় ২,৬৬,০০০ টাকারও বেশি এবং দায়িত্বকাল ৮ বছর হলে মোট অঙ্ক আনুমানিক ২১ লক্ষ টাকা ছাড়িয়ে যায়।  
তরিকুলের বিরুদ্ধে আরেকটি বড় অভিযোগ হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্তে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা-পত্র ধামাচাপা দেয়া ও ব্যবস্থা গ্রহণে ইচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয় থাকা। জানা গেছে, বিআইএমের ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা মোহাম্মদ নাজমী নেওয়াজের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের বেসরকারি খাত ও বিআইএম অধিশাখা ২৪ এপ্রিল ২০২৫ তারিখের পত্রে (স্মারক নং-৩৬.০০.০০০০.০৬৬.৯৯.০০৭.২১) অভিযোগপত্রের অনুলিপিসহ মহাপরিচালক, বিআইএমের মতামত চায়। কিন্তু তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন) তরিকুল ইসলাম বিগত সরকারের রাজনৈতিক প্রভাবের জোরে মন্ত্রণালয়ের উক্ত পত্রটি যথানিয়মে নথিতে অন্তর্ভুক্তই করেননি এবং এর ভিত্তিতে কোনোরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ বা মন্ত্রণালয়ে জবাব প্রেরণ করেননি। ফলে ১৬ মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত কমিটি গঠিত হয়নি। একাধিক কর্মকর্তা তাকে উক্ত অভিযুক্ত কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ সহযোগী হিসেবেও চিহ্নিত করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তরিকুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি তো এসব বিষয়ে কিছুই জানি না। এ ছাড়া অফিসিয়াল বিষয়ে আমি আপনাকে জানাবো কেন? আপনি কে?
অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করে, এমনকি মুঠোফোনে ম্যাসেজ পাঠিয়েও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের (বিআইএম) মহাপরিচালক মো: সলিম উল্লাহর (অতিরিক্ত সচিব) বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান তার কার্যালয়ে দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, অভিযোগগুলোর বিষয়ে সত্যতা থাকলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি অভিযোগগুলো কি সেটি প্রশ্ন আকারে দিতে বলেন। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে অভিযোগগুলো প্রশ্ন আকারে দেয়া হয়। কিন্তু একাধিকবার যোগাযোগ করেও উত্তর পাওয়া যায়নি।