ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়ছে কম্পিউটারে স্থবিরতা

  বিশেষ সংবাদদাতা 

Advertisement

 

* খানাপর্যায়ে মোবাইল ফোনে প্রায় শতভাগ প্রবেশাধিকার- স্মার্টফোন ৭৫.১%, ইন্টারনেট ৫৮.২%
* ব্যক্তিপর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহার বেড়েছে ৪.২ শতাংশ পয়েন্ট, কম্পিউটার ব্যবহার বেড়েছে মাত্র ০.২ পয়েন্ট

বাংলাদেশে ডিজিটাল সংযোগের সবচেয়ে বড় বাহন এখনো মোবাইল ফোন। দেশের প্রায় প্রতিটি খানায় অন্তত একটি মোবাইল ফোন রয়েছে। স্মার্টফোনও পৌঁছে গেছে প্রতি চারটির প্রায় তিনটি খানায়। ইন্টারনেট ব্যবহারও দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু এর বিপরীতে কম্পিউটার ব্যবহারের বিস্তার প্রায় স্থবির। ফলে বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের চরিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে- দেশে মানুষ ক্রমেই অনলাইনে যাচ্ছে, কিন্তু সেই প্রবেশের প্রধান দরজা হচ্ছে মোবাইল ফোন; কম্পিউটারভিত্তিক ডিজিটাল দক্ষতা ও উৎপাদনশীল ব্যবহার এখনো অনেক পিছিয়ে। 
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘আইসিটি প্রয়োগ ও ব্যবহার জরিপ ২০২৫-২৬’-এর এপ্রিল-জুন ২০২৬ চতুর্থ প্রান্তিকের ফলাফলে এ চিত্র উঠে এসেছে। জরিপে পাঁচ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী ব্যক্তিদের আইসিটি ব্যবহার এবং খানাপর্যায়ে বিভিন্ন আইসিটি সরঞ্জাম ও সেবার প্রবেশাধিকার পরিমাপ করা হয়েছে। সর্বশেষ প্রান্তিকে ৮৯.৬ শতাংশ ব্যক্তি মোবাইল ফোন ব্যবহার করেছেন। এক বছর আগে একই সময়ে এ হার ছিল ৮৮.২ শতাংশ। ব্যক্তিগতভাবে মোবাইল ফোনের মালিকানাও ৬৪.২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৫.৬ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বেড়ে হয়েছে ৫৯.২ শতাংশ, যা এক বছর আগে ছিল ৫৫ শতাংশ।  
কিন্তু কম্পিউটারের ক্ষেত্রে পরিবর্তন অত্যন্ত সামান্য। পাঁচ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে কম্পিউটার ব্যবহার ২০২৪-২৫-এর চতুর্থ প্রান্তিকের ১১.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬-এর একই সময়ে হয়েছে ১১.৮ শতাংশ; অর্থাৎ এক বছরে বৃদ্ধি মাত্র ০.২ শতাংশ পয়েন্ট। খানাপর্যায়েও কম্পিউটার থাকা পরিবারের হার ৯.২ শতাংশ থেকে সামান্য কমে ৯.১ শতাংশ হয়েছে।  
এ তথ্য বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে- দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বাড়ছে, কিন্তু সেই ব্যবহার কতটা শিক্ষা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা কার্যক্রম, উৎপাদনশীলতা ও উচ্চতর ডিজিটাল দক্ষতায় রূপান্তরিত হচ্ছে? 
মোবাইল ফোনে প্রায় সর্বজনীন প্রবেশ 
জরিপের সবচেয়ে শক্তিশালী সূচকগুলোর একটি হলো মোবাইল ফোনের বিস্তার। এপ্রিল-জুন ২০২৬-এ ৯৯ শতাংশ খানায় অন্তত একটি মোবাইল ফোন ছিল। প্রথম তিন প্রান্তিকেও এ হার ছিল ৯৮.৯ শতাংশ; অর্থাৎ মোবাইল ফোন এখন বাংলাদেশের প্রায় সর্বজনীন যোগাযোগ অবকাঠামোর অংশে পরিণত হয়েছে। 
আরো তাৎপর্যপূর্ণ হলো, ‘যেকোনো মোবাইল বা ফিক্সড ফোন’ থাকা খানার হারও প্রায় ৯৯ শতাংশের কাছাকাছি। বিপরীতে ফিক্সড ফোনের ব্যবহার নেমে এসেছে মাত্র ০.৭ শতাংশে; অর্থাৎ বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর কেন্দ্রীয় চরিত্র সম্পূর্ণভাবে মোবাইলনির্ভর হয়ে পড়েছে। 
এ পরিবর্তনের অর্থ শুধু যোগাযোগের মাধ্যম বদলে যাওয়া নয়। মোবাইল ফোনের সাথে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন শিক্ষা, সরকারি সেবা, ই-কমার্স, সংবাদ, বিনোদন এবং ডিজিটাল কর্মসংস্থান ক্রমেই যুক্ত হচ্ছে।
কিন্তু মোবাইলের সর্বজনীন প্রবেশাধিকারকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি’ বলা যাবে না। কারণ একটি পরিবারের মোবাইল ফোন থাকা আর ওই পরিবারের সদস্যদের উচ্চগতির ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, ডিজিটাল দক্ষতা ও উৎপাদনশীল অনলাইন সেবা ব্যবহারের সক্ষমতা থাকা এক বিষয় নয়। 
স্মার্টফোন বাড়ছে, তবে গতি সীমিত 
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ৭২.৪ শতাংশ খানায় স্মার্টফোন ছিল। দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা বেড়ে ৭৩ শতাংশ, তৃতীয় প্রান্তিকে ৭৩.৪ শতাংশ এবং চতুর্থ প্রান্তিকে ৭৫.১ শতাংশে পৌঁছেছে; অর্থাৎ এক অর্থবছরের মধ্যেই স্মার্টফোন-অ্যাক্সেসে ২.৭ শতাংশ পয়েন্টের পার্থক্য তৈরি হয়েছে। তবে বছরওয়ারি তুলনায় বৃদ্ধির হার খুব বেশি নয়- ২০২৪-২৫-এর চতুর্থ প্রান্তিকে ৭৪.৮ শতাংশ খানায় স্মার্টফোন ছিল; এক বছর পরে তা হয়েছে ৭৫.১ শতাংশ। বৃদ্ধি মাত্র ০.৩ শতাংশ পয়েন্ট। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। মোবাইল ফোনের প্রবেশ প্রায় ৯৯ শতাংশ হলেও স্মার্টফোনের প্রবেশ ৭৫.১ শতাংশ; অর্থাৎ প্রায় এক-চতুর্থাংশ খানায় এখনো স্মার্টফোন নেই। ডিজিটাল অর্থনীতি, ভিডিও কনফারেন্স, অনলাইন শিক্ষা, ক্লাউডভিত্তিক সেবা, অ্যাপভিত্তিক সরকারি সেবা কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নতুন অর্থনীতিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। 
ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়ছে; কিন্তু খানাপর্যায়ে প্রবেশে উল্টো চিত্র 
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে ব্যক্তিপর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহারে। পাঁচ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর ইন্টারনেট ব্যবহার ২০২৪-২৫-এর চতুর্থ প্রান্তিকে ৫৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬-এর চতুর্থ প্রান্তিকে ৫৯.২ শতাংশ হয়েছে; অর্থাৎ এক বছরে বৃদ্ধি ৪.২ শতাংশ পয়েন্ট।  
এটি নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। একই সময়ে ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যবহার ৮৮.২ শতাংশ থেকে ৮৯.৬ শতাংশ হয়েছে। ব্যক্তিগত মোবাইল মালিকানাও ৬৪.২ শতাংশ থেকে ৬৫.৬ শতাংশে উঠেছে। 
কিন্তু খানাপর্যায়ের ইন্টারনেট প্রবেশাধিকার একই গতিতে বাড়েনি। ২০২৫-২৬-এর প্রথম প্রান্তিকে ৫৬.২ শতাংশ খানায় ইন্টারনেট ছিল। দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা ৫৭.২ শতাংশ, তৃতীয় প্রান্তিকে ৫৭.৪ শতাংশ এবং চতুর্থ প্রান্তিকে ৫৮.২ শতাংশ হয়েছে; অর্থাৎ একই অর্থবছরের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি থাকলেও বছরওয়ারি তুলনায় ২০২৪-২৫-এর চতুর্থ প্রান্তিকের ৫৯.৭ শতাংশ থেকে ২০২৫-২৬-এর চতুর্থ প্রান্তিকে তা ৫৮.২ শতাংশে নেমেছে।  
এখানেই জরিপটির একটি গভীর বার্তা রয়েছে। পরিবারে ইন্টারনেট সংযোগের হার কমলেও ব্যক্তিপর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহার বেড়েছে। এর সম্ভাব্য অর্থ হলো- একটি পরিবারের এক বা একাধিক ব্যক্তি মোবাইল ডাটা ব্যবহার করে ব্যক্তিগতভাবে অনলাইনে থাকছেন, কিন্তু পুরো পরিবারকে কেন্দ্র করে স্থায়ী বা শেয়ার করা ইন্টারনেট সংযোগের বিস্তার একই হারে ঘটছে না; অর্থাৎ বাংলাদেশের ইন্টারনেট বিপ্লব ক্রমেই ‘হাউজহোল্ড কানেক্টিভিটি’ থেকে ‘পারসোনাল মোবাইল কানেক্টিভিটি’-এর দিকে যাচ্ছে। 
কম্পিউটার ব্যবহারে বড় ঘাটতি 
ডিজিটাল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত কম্পিউটার ব্যবহারের পরিসংখ্যানেই। ২০২৫-২৬-এর চতুর্থ প্রান্তিকে পাঁচ বছর ও তদূর্ধ্ব ব্যক্তিদের মাত্র ১১.৮ শতাংশ কম্পিউটার ব্যবহার করেছেন। এক বছর আগে এ হার ছিল ১১.৬ শতাংশ। বৃদ্ধি মাত্র ০.২ শতাংশ পয়েন্ট। 
অন্য দিকে খানাপর্যায়ে কম্পিউটার থাকার হার ৯.২ শতাংশ থেকে কমে ৯.১ শতাংশ হয়েছে; অর্থাৎ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৫৯.২ শতাংশ হলেও কম্পিউটার ব্যবহারকারী ১১.৮ শতাংশ। দুই সূচকের মধ্যে ব্যবধান ৪৭.৪ শতাংশ পয়েন্ট। 
এটি শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের পার্থক্য নয়; অর্থনৈতিক সক্ষমতার সাথেও এর সম্পর্ক রয়েছে। স্মার্টফোন দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও দেখা, মেসেজিং, অনলাইন কেনাকাটা কিংবা মোবাইল ব্যাংকিং করা সম্ভব হলেও সফটওয়্যার উন্নয়ন, ডাটা অ্যানালিটিকস, গ্রাফিক ডিজাইন, প্রোগ্রামিং, দীর্ঘ নথি তৈরি, হিসাবরক্ষণ, গবেষণা, প্রকৌশল বা অনেক ধরনের ফ্রিল্যান্সিং কাজের জন্য কম্পিউটার এখনো অধিক কার্যকর। 
ফলে মোবাইলভিত্তিক ইন্টারনেট বিস্তারের সাথে কর্মসংস্থানভিত্তিক ডিজিটাল দক্ষতা একই গতিতে না বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।  
বিদ্যুৎ প্রায় সর্বজনীন, কিন্তু ডিজিটাল ডিভাইস রয়ে গেছে 
জরিপে ২০২৫-২৬-এর চতুর্থ প্রান্তিকে ৯৮.৬ শতাংশ খানায় বিদ্যুৎ সুবিধা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে ৬০.১ শতাংশ খানায় টেলিভিশন, ১৫.৩ শতাংশ খানায় রেডিও এবং ৯.১ শতাংশ খানায় কম্পিউটার ছিল। এখানে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত রূপান্তরের একটি দীর্ঘমেয়াদি ছবি পাওয়া যায়।
একসময় টেলিভিশন ও রেডিও ছিল তথ্যপ্রাপ্তির প্রধান মাধ্যম। এখন টেলিভিশন থাকা খানার হার ৬০.১ শতাংশ হলেও রেডিও মাত্র ১৫.৩ শতাংশ। বিপরীতে মোবাইল ফোনের প্রবেশ প্রায় শতভাগ; অর্থাৎ তথ্যপ্রযুক্তির অবকাঠামো পুরনো ‘ব্রডকাস্ট’ মডেল থেকে দ্রুত ব্যক্তিকেন্দ্রিক মোবাইল মডেলে চলে গেছে। 
কিন্তু কম্পিউটারের ৯.১ শতাংশ প্রবেশাধিকার বলছে- উৎপাদনশীল, দক্ষতাভিত্তিক ও পেশাগত ডিজিটাল ব্যবহারের অবকাঠামো এখনো সীমিত। 
ডিজিটাল বৈষম্যের নতুন সংজ্ঞা 
বাংলাদেশে ডিজিটাল বৈষম্যকে এখন শুধু ‘ইন্টারনেট আছে কি নেই’ দিয়ে মাপলে বাস্তব চিত্র পাওয়া যাবে না।  বৈষম্য এখন অন্তত চার স্তরে দেখা দরকার- প্রথমত, সংযোগের বৈষম্য। কে ইন্টারনেট পাচ্ছেন, কে পাচ্ছেন না। দ্বিতীয়ত, ডিভাইসের বৈষম্য। কার হাতে সাধারণ মোবাইল, কার হাতে স্মার্টফোন আর কার কাছে কম্পিউটার। তৃতীয়ত, দক্ষতার বৈষম্য। কে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন আর কে অনলাইনে শিক্ষা, ব্যাংকিং, সরকারি সেবা, পেশাগত কাজ ও ব্যবসা করতে পারেন। চতুর্থত, ফলাফলের বৈষম্য। কে ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে আয়, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারছেন এবং কে কেবল বিনোদন বা যোগাযোগে সীমাবদ্ধ রয়েছেন।
বিবিএসের নতুন জরিপের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো- এটি জেলাপর্যায়ে এ ধরনের ব্যবধান চিহ্নিত করার ভিত্তি তৈরি করছে। 
৬৪ জেলায় তথ্য- নীতিনির্ধারণে বড় পরিবর্তনের সুযোগ 
এবারের জরিপের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো জেলাপর্যায়ে আইসিটি ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহ। বিবিএস জানিয়েছে, জরিপটি দেশের ৬৪ জেলায় পরিচালিত হচ্ছে। প্রতি প্রান্তিকে দুই হাজার ৫৬৮টি নির্বাচিত নমুনা এলাকায় ২৪টি করে মোট ৬১ হাজার ৬৩২টি খানায় তথ্য সংগ্রহ করা হয়। বছরে মোট নমুনা খানা দুই লাখ ৪৬ হাজার ৫২৮টি। মাঠপর্যায়ে ২১৪ জন প্রশিক্ষিত তথ্য সংগ্রহকারী ঈঅচও বা ঈড়সঢ়ঁঃবৎ অংংরংঃবফ চবৎংড়হধষ ওহঃবৎারবরিহম পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করেন।
বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, এ জরিপের মাধ্যমে জেলাপর্যায়ে আইসিটি সূচকের প্রাক্কলন তৈরি করা হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নকে ২২টি সূচকের তথ্য দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।  
এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ জাতীয়পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহার ৫৯.২ শতাংশ- এই একটি সংখ্যা দিয়ে দেশের বাস্তব ডিজিটাল বৈষম্য বোঝা সম্ভব নয়। কোনো জেলার শহরাঞ্চলে উচ্চ প্রবেশাধিকার এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিম্ন প্রবেশাধিকার একই জাতীয় গড়ের মধ্যে হারিয়ে যেতে পারে। 
জেলাভিত্তিক তথ্য সেই আড়াল সরানোর সুযোগ দেবে। 
পরিকল্পনায় শুধু ‘কানেক্টিভিটি’ নয়, ‘ক্যাপাবিলিটি’ও দরকার 
বাংলাদেশের ডিজিটাল নীতির প্রথম পর্যায়ের বড় লক্ষ্য ছিল সংযোগ তৈরি করা। এখন দ্বিতীয় পর্যায়ের লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই সংযোগকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সক্ষমতায় রূপান্তর করা। 
সর্বশেষ জরিপের তথ্য বলছে, সংযোগের ভিত্তি অনেক বিস্তৃত হয়েছে। প্রায় ৯৯ শতাংশ খানায় মোবাইল ফোন আছে। প্রায় তিন-চতুর্থাংশ খানায় স্মার্টফোন আছে। পাঁচ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯০ শতাংশ মোবাইল ব্যবহার করছে। কিন্তু কম্পিউটার ব্যবহার মাত্র ১১.৮ শতাংশ। এই বৈপরীত্য দেখাচ্ছে- পরবর্তী বিনিয়োগের কেন্দ্র শুধু টাওয়ার, নেটওয়ার্ক বা সিমকার্ড হওয়া উচিত নয়; ডিভাইস, দক্ষতা, সাশ্রয়ী ইন্টারনেট, ডিজিটাল শিক্ষা, স্থানীয় ভাষার কনটেন্ট, সাইবার নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থানমুখী প্রশিক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। 
৫৯.২ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন- এটি একটি বড় পরিবর্তন। কিন্তু এই সংখ্যার ভেতরে ব্যবহারের ধরন জানা জরুরি। কতজন অনলাইন শিক্ষা নিচ্ছেন? কতজন চাকরি খুঁজছেন? কতজন ফ্রিল্যান্সিং করছেন? কতজন অনলাইন ব্যবসা পরিচালনা করছেন? কতজন সরকারি সেবা নিচ্ছেন? কতজন ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবহার করছেন? কতজন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ক্লাউডভিত্তিক পেশাগত সেবা ব্যবহার করছেন? 
এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকলে ‘ইন্টারনেট ব্যবহার বেড়েছে’- এ তথ্যকে অর্থনৈতিক রূপান্তরের পূর্ণ সূচক বলা যাবে না। 
ভবিষ্যৎ জরিপে ব্যবহারকারীর সংখ্যা থেকে ব্যবহারকারীর সক্ষমতা ও ব্যবহারের ফলাফলের দিকে আরো বেশি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। 
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- ডিজিটাল বাংলাদেশ কতটা ‘উৎপাদনশীল’? 
সর্বশেষ তথ্যের সারাংশে একটি বিষয় পরিষ্কার। বাংলাদেশে ডিজিটাল প্রবেশাধিকার এখন আর কেবল উচ্চবিত্ত বা শহুরে জনগোষ্ঠীর বিষয় নয়। মোবাইল ফোন প্রায় সর্বজনীন। ইন্টারনেট ব্যবহারও দ্রুত বাড়ছে। স্মার্টফোনের প্রবেশ তিন-চতুর্থাংশ খানায় পৌঁছেছে। কিন্তু একই সময়ে কম্পিউটার ব্যবহারের হার ১১.৮ শতাংশে আটকে আছে। 
এ থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তর মূলত মোবাইল-প্রথম মডেলে এগোচ্ছে। এটি এক দিকে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সাশ্রয়ী ও দ্রুত ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির পথ তৈরি করেছে; অন্য দিকে উচ্চ দক্ষতা ও উৎপাদনশীল ডিজিটাল অর্থনীতিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে। 
তাই আগামী দিনের নীতিতে শুধু ‘কতজন অনলাইনে’- এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন হতে হবে- কতজন দক্ষভাবে অনলাইনে, কী কাজে অনলাইনে এবং সেই ব্যবহার থেকে কী ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য তৈরি হচ্ছে। 
বিবিএসের ২০২৫-২৬ জরিপ সেই প্রশ্নের প্রথম বড় পরিসংখ্যানগত ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন এ তথ্যকে জেলা, আয়, লিঙ্গ, বয়স, শিক্ষা ও নগর-গ্রামভিত্তিক বিশ্লেষণের সাথে যুক্ত করে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল বৈষম্য মানচিত্র তৈরি করা। 
কারণ মোবাইল ফোনে প্রায় সবার প্রবেশাধিকার থাকা মানেই ডিজিটাল সক্ষমতায় সবার সমান অবস্থান নয়।
বাংলাদেশের পরবর্তী ডিজিটাল বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ তাই ‘সংযোগ’ নয় শুধু- সংযোগকে দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা ও আয়-সৃষ্টিতে রূপান্তর করা।