তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে ভূরাজনৈতিক সমীকরণ

নয়া দিগন্ত ডেস্ক 

Advertisement

বেইজিংয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফল বৈঠকের পর, ওয়াশিংটনের এই সফরটি বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং কূটনৈতিক দিক থেকে একটি বড় পরীক্ষা। সম্প্রতি ২৫টি বোয়িং বিমান কেনার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে  ধন্যবাদ জানিয়ে একটি চিঠি দিয়েছেন এবং তার সাথে সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক এজেন্ডা হতে পারে নির্বাচনের ঠিক আগে ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’। এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশী পণ্যে মার্কিন শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয় এবং মার্কিন কাঁচামাল দিয়ে তৈরী পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়ার কথা বলা হয়। এর বিনিময়ে বাংলাদেশকে ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন জ্বালানি এবং এক বছরে ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য (গম, সয়াবিন ও তুলা) কেনার বিশাল প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী এই সফরে চুক্তির এসব জটিল শর্ত শিথিল করা এবং রফতানিকারকদের সুবিধাগুলো আরো স্পষ্ট করার জন্য দরকষাকষি করতে পারেন। বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। অবকাঠামো খাতে চীনের ঋণ ও বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও, রফতানি আয়ের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার (২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭.৭৪ বিলিয়ন ডলার) কোনোভাবেই চীন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
ফেব্রুয়ারির মার্কিন চুক্তিতে একটি শর্ত রয়েছে যে, বাংলাদেশ যদি কোনো ‘নন-মার্কেট কান্ট্রি’ (যা মূলত চীনকে নির্দেশ করে)-এর সাথে বিশেষ বাণিজ্যসুবিধা স্বাক্ষর করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করতে পারে। প্রধানমন্ত্রীকে তাই ওয়াশিংটনকে আশ্বস্ত করার পাশাপাশি বেইজিংয়ের সাথে সম্পর্ক অটুট রাখার কঠিন কাজটি করতে হবে।
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে আরো পাঁচ বিলিয়ন ডলার মার্কিন বিনিয়োগ আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। কেবল তৈরী পোশাক বা বিমান কেনা নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর এবং ক্রিটিক্যাল মিনারেল সাপ্লাই চেইন নিয়ে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ‘প্যাক্স সিলিকা’ উদ্যোগে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া ইউএস এফডিএ টেস্টিং কার্যক্রম পুনরায় চালুর বিষয়েও আলোচনা হতে পারে, যা ওষুধ রফতানিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
যুক্তরাষ্ট্র সফর থেকে প্রধানমন্ত্রী রহমান যেসব মূল ক্ষেত্রে সুবিধা পেতে পারেন, সেগুলো হচ্ছে রাজনৈতিক অবস্থান ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের সান্নিধ্য, ওয়াশিংটনের কাছ থেকে সুস্পষ্ট স্বীকৃতি পাওয়াটা পূর্ববর্তী নেতাদের কাক্সিক্ষত উচ্চ-পর্যায়ের বৈধতারই প্রতিফলন ঘটাবে; এটি রহমানের জন্য এমন এক গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ সাফল্য বয়ে আনবে যা বেইজিংয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে তার সাম্প্রতিক উচ্চ-পর্যায়ের বৈঠকগুলোর প্রভাবের সাথে ভারসাম্য রক্ষা করতে সহায়তা করবে। এ ছাড়া এই সফরকে কাজে লাগিয়ে তিনি বাণিজ্য চুক্তির শর্তাবলি সহজ করার ভিত্তি তৈরি করতে পারেন- বিশেষ করে বিপুল পরিমাণ মার্কিন কৃষি ও জ্বালানি পণ্য ক্রয়ের বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্রে নমনীয়তা অর্জন এবং রফতানি সুবিধার বিষয়গুলো স্পষ্ট করার মাধ্যমে।
বাংলাদেশ তার প্রধান রফতানি গন্তব্য (যুক্তরাষ্ট্র) এবং প্রধান অবকাঠামো অংশীদার (চীন)-এর মধ্যে কোনো কঠিন পরিস্থিতির মুখে না পড়ে। জাতিসঙ্ঘের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির পাশাপাশি, রহমানের অর্থনৈতিক কর্মসূচির তালিকায় রয়েছে ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধি, ‘অ্যামচ্যাম’ এর মতো ব্যবসায়ী সংগঠন এবং ‘মেটা’-র মতো প্রযুক্তি জায়ান্টদের সাথে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ ও আলোচনা। ব্যবসায়ী মহল আগামী পাঁচ বছরে অতিরিক্ত পাঁচ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন বিনিয়োগের প্রত্যাশা করছে। একই সাথে বিভিন্ন পার্শ্ব-বৈঠক বা ফোরামকে কাজে লাগিয়ে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে সক্রিয় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানাচ্ছে বাংলাদেশ। জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ এবং জলবায়ু কার্যক্রম, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক বৈষম্য বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সংলাপে অংশগ্রহণ তাকে বিশ্বমঞ্চে তার সরকারের গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও উন্নয়ন-ভাবনা তুলে ধরার সুযোগ করে দিচ্ছে।
চীনের সাথে বাংলাদেশের সহযোগিতার বিষয়ে ওয়াশিংটনের আগ্রহ মূলত প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত। ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন যে, চীন-নির্মিত সরঞ্জামের বিকল্প হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে নিজস্ব ও মিত্রদেশগুলোর সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের প্রস্তাব দিতে আগ্রহী।
তবে জুনের মধ্যেই ঢাকা ও বেইজিং তাদের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি সংলাপ আয়োজনের বিষয়ে সম্মত হয়। ফলে চীনের সাথে সম্পর্ক যখন ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে, ঠিক সেই প্রেক্ষাপটেই তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বাংলাদেশের নেতারা দীর্ঘদিন ধরেই জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) অধিবেশন সফরের সুযোগ কাজে লাগিয়ে আসছেন।