
বাংলাদেশের অর্থবাজারে স্বল্পমেয়াদি তারল্য ব্যবস্থাপনায় এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে সরাসরি তারল্য নেয়ার প্রবণতা কমার পাশাপাশি ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে ঋণ ও রেপো লেনদেন বাড়িয়েছে। বিশেষ করে জামানতভিত্তিক আন্তঃব্যাংক রেপো বাজারে লেনদেনের ব্যাপক সম্প্রসারণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেপোর সঙ্কোচন দেখাচ্ছে যে, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য প্রবাহ ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকনির্ভরতা কাটিয়ে বাজারনির্ভরতার দিকে ঝুঁকছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘গড়হবু গধৎশবঃ উুহধসরপং (অঁমঁংঃ ২০২৬)’ প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, আগস্ট মাসে কলমানি বাজারে মোট লেনদেন হয়েছে এক লাখ সাত হাজার ৫৮২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। অন্য দিকে আন্তঃব্যাংক রেপোতে লেনদেন হয়েছে এক লাখ ১৪ হাজার ৩৫৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা; অর্থাৎ এই দুই বাজারেই মোট লেনদেন ছাড়িয়েছে প্রায় দুই লাখ ২১ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা, যার মধ্যে আন্তঃব্যাংক রেপোর পরিমাণ কলমানির চেয়ে প্রায় ৬.৩ শতাংশ বেশি।
এক বছরের ব্যবধানে এই পরিবর্তনটি আরো বেশি তাৎপর্যপূর্ণ :
সাত দিনের আন্তঃব্যাংক রেপো : বৃদ্ধি পেয়েছে ২১৫২.৭৩ শতাংশ। রাতারাতি (ঙাবৎহরমযঃ) আন্তঃব্যাংক রেপো : বৃদ্ধি পেয়েছে ১২৮.৪০ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেপো : আগস্টে নেমে এসেছে ৭১ হাজার ৯৪৩ কোটি ২৪ লাখ টাকায় (জুলাইয়ের তুলনায় ১৯.৮৮ শতাংশ কম)।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর তাৎক্ষণিক নির্ভরতার হ্রাস
জুলাইয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেপোর লেনদেন যেখানে ছিল ৮৫ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা, আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় ৭১ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকায়; অর্থাৎ এক মাসে কমেছে প্রায় ১৭ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা। বিপরীতে, আন্তঃব্যাংক রেপো ৮৫ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে এক লাখ ১৪ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।
তবে এটিকে ব্যাংকিং খাতের তারল্যসঙ্কট সম্পূর্ণ কেটে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না; কারণ আগস্টেও বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ তারল্য সহায়তা হিসেবে ৯০ হাজার ৫২৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা সরবরাহ করেছে; অর্থাৎ সাধারণ আন্তঃব্যাংক বাজার সক্রিয় হলেও নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকের তারল্যের চাহিদা এখনো বেশ তীব্র।
৭ দিনের রেপোতে উল্লম্ফন : দীর্ঘমেয়াদি তারল্য নিশ্চিতের চেষ্টা?
আগস্টে সাত দিনের রেপো লেনদেন হয়েছে ৫৭ হাজার ৬০৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা, যা জুলাইয়ের তুলনায় ৫৩.০৩ শতাংশ বেশি। বর্তমান মোট আন্তঃব্যাংক রেপোর ৫০.৩৭ শতাংশই সাত দিনের মেয়াদের, আর রাতারাতি রেপোর অংশ ২৫.৪৭১ শতাংশ। সাধারণত দৈনিক ঘাটতি মেটাতে রাতারাতি তহবিলের ওপর নির্ভর করা হলেও সাত দিনের রেপো ব্যবহারের বৃদ্ধি ইঙ্গিত দেয় যে ব্যাংকগুলো তাদের নগদ ব্যবস্থাপনা ও মেয়াদের ভারসাম্য রক্ষার্থে কিছুটা সতর্ক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিচ্ছে। কলমানিতে রাতারাতি অর্থের আধিপত্য ও মুদ্রানীতির প্রভাব কলমানি বাজারের এক লাখ সাত হাজার ৫৮২ কোটি টাকার মধ্যে ৮০.৪৩ শতাংশই রাতারাতি লেনদেন, যার ভারিত গড় সুদের হার ছিল ৯.৩৪ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক গত ২ আগস্ট পলিসি রেপো হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯.৫০ শতাংশ করায় আন্তঃব্যাংক ওভারনাইট হারও কিছুটা নিচে নেমেছে। জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে ওভারনাইট কল রেট ৩০ বেসিস পয়েন্ট এবং বিগত বছরের তুলনায় ৬৪ বেসিস পয়েন্ট কমেছে।
তারল্য আছে, কিন্তু বেসরকারি ঋণের চাহিদা কোথায়?
সুদের হার কমা এবং আন্তঃব্যাংক বাজার সক্রিয় হওয়ার পরও অর্থনীতির মূল চ্যালেঞ্জ হলো- বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি এখনো দুর্বল।
জুনের ঋণের চিত্র অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪.৪৭ শতাংশ, যেখানে সরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৩০.৪৩ শতাংশ। কারণ ব্যবসায়ীরা ঋণ নেয়ার আগে ভবিষ্যৎ চাহিদা, আমদানি ব্যয়, জ্বালানি মূল্য এবং রাজনৈতিক-নীতিগত স্থিতিশীলতা বিবেচনা করছেন। ফলে ৯.৫০ শতাংশ পলিসি রেটোতেও বিনিয়োগ যথেষ্ট পরিমাণে উৎসাহিত হচ্ছে না।
ব্যাংকের অতিরিক্ত অর্থ ও বিশেষ তারল্যের দ্বৈত চিত্র
এসডিএফ : আগস্টে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটিতে ৯২ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা জমা রেখেছে, যা ব্যাংকিং খাতের উদ্বৃত্ত তারল্যের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ সহায়তা : অন্য দিকে বিশেষ তারল্য সহায়তা ও আইবিএলএফ -এর মাধ্যমে সরবরাহ করা ৯০ হাজার ৫২৬ কোটি টাকার মধ্যে ৮২.৫ শতাংশই গেছে ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য। এটি প্রচলিত ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনার ভিন্নতাকে স্পষ্ট করে।
ট্রেজারি বিলের পদের হার পতন ও মূল্যস্ফীতির চাপ
আগস্টে ট্রেজারি বিলের নিলামে ৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের ইল্ড উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে (প্রায় ৫৭ থেকে ৭১ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত)। এটি সরকারের জন্য স্বস্তিদায়ক হলেও, ৮.২৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি (বিশেষ করে ৯.৩২ শতাংশ অ-খাদ্য মূল্যস্ফীতি) এবং ২১ সেপ্টেম্বরের জ্বালানি তেলের দাম ১৭.৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাজারে নতুন মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করতে পারে।
অন্তর্বর্তীকালীন অর্থবাজারের বড় পরীক্ষা
আগস্টের অর্থবাজারের তথ্য একটি রূপান্তরকালীন পর্যায় নির্দেশ করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নমনীয় মুদ্রানীতির দিকে হাঁটলেও, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং খাতের অসম তারল্য বণ্টন সেই পথকে জটিল করে তুলছে।
পরিশেষে অর্থবাজারের সাফল্যের মাপকাঠি কেবল ব্যাংকগুলোর মধ্যে কত টাকা হাতবদল হলো তা নয়; বরং সেই অর্থ কতটা উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে রূপ নিলো- সেটিই হবে আগামী দিনে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রকৃত পরীক্ষা।








