
জরুরি তেলের মজুত ফুরিয়ে আসছে, আর অনেক দেশের সরকারি বাজেটও চাপে পড়েছে। এ অবস্থায় বিশ্ব অর্থনীতি শিগগিরই তার সহ্যসীমার মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) জানায়, আইএমএফের সর্বশেষ বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ছয় মাসে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ধাক্কা বিশ্ব অর্থনীতি আশঙ্কার চেয়ে ভালোভাবে সামাল দিয়েছে। হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে তেল সরবরাহের বিকল্প পথ ব্যবহার এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুত বাজারে ছাড়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রভাব তেলের দামে সীমিত রাখা গেছে।
তবে জরুরি মজুত এখন অনেকটাই ফুরিয়ে এসেছে। বিভিন্ন দেশে ঋণের বোঝা ও বাজেট ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় ভবিষ্যতে দাম আবার বাড়লে ভোক্তাদের সুরক্ষা দেয়ার সামর্থ্য সরকারের কমে যেতে পারে।
আইএমএফ বলেছে, ‘সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানো এবং ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় নীতিগত পদক্ষেপ নেয়ার সামর্থ্য ফিরিয়ে আনা না হলে বিশ্ব অর্থনীতি শিগগিরই তার সহ্যসীমা পরীক্ষা করতে পারে।’ সংস্থাটি আরো বলেছে, জ্বালানি বাজারে মজুত কমছে। নতুন কোনো ভূরাজনৈতিক ধাক্কা এলে তার প্রভাব দ্রুত দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহে বিঘ্নের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
চলতি বছরের মার্চে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) বাজারে জরুরি মজুত থেকে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি পরিমাণ তেল ছাড়ার ঘোষণা দেয়। গত মাসে তেলমন্ত্রীদের বৈঠকের পর এ প্রক্রিয়া আরো দ্রুত করার প্রতিশ্রুতিও দেয় সংস্থাটি। তবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত ১৯৮২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে ঋণের বোঝা বাড়তে থাকায় সরকারগুলোকে ব্যয় সংকোচনের আহ্বান জানিয়েছেন আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ নিতে আর দেরি করা যায় না। আপনাদের হাতে উপায় আছে, এখন সেগুলো কাজে লাগানোর প্রজ্ঞা দেখাতে হবে।’
মঙ্গলবার ব্যাংককে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। সেখানে এ সপ্তাহে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক বৈঠক চলছে। এতে অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানদের অংশ নেয়ার কথা রয়েছে।
আইএমএফ চলতি বছর বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সামান্য বাড়িয়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশ করেছে। জুলাইয়ে পূর্বাভাস ছিল ৩ শতাংশ। ২০২৭ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস অপরিবর্তিত রেখে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ ধরা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি চলতি বছর ২ দশমিক ৩ শতাংশ থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। ২০২৭ সালের পূর্বাভাসও ২ দশমিক ২ থেকে বাড়িয়ে ২ দশমিক ৩ শতাংশ করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে চলতি বছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ০.৩ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়িয়ে ১ দশমিক ৩ শতাংশ করেছে আইএমএফ। তবে আগামী বছর তা কমে ১ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি। দীর্ঘ সময় তেলের দাম বেশি থাকা ও সুদের হার বাড়ার ফলে ভোগব্যয় ও বিনিয়োগে চাপ পড়বে।
তবে বিশ্ব অর্থনীতির পূর্বাভাসে ঝুঁকিগুলো খারাপ পরিস্থিতির দিকেই বেশি ঝুঁকে আছে বলে সতর্ক করেছে আইএমএফ। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা বা সংঘাত আরো ছড়িয়ে পড়লে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়তে পারে। জ্বালানি অবকাঠামোয় নতুন হামলা, সাইবার আক্রমণ কিংবা চরম আবহাওয়াও পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলতে পারে।
ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালানোর হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অথচ শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনার তেমন কোনো লক্ষণ নেই। তেলের দাম দীর্ঘ সময় উঁচুতে থাকায় মূল্যস্ফীতিও আগের ধারণার চেয়ে বেশি দিন স্থায়ী হতে পারে।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্বে মূল্যস্ফীতি হবে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৭ সালে তা কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। জুলাইয়ের পূর্বাভাসে আগামী বছরের মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশ ধরা হয়েছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ফীতি বাড়লে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া না দেখানোর পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। তবে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তুতি রাখতে বলেছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেন্দ্রিক বাজারে ধসের আশঙ্কাকেও বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছে আইএমএফ।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








